মিলাদ জয়নুল:
উঁচু-নিচু লাল মাটির টিলা, নিচু জলাশয় আর ঘন ঝোপজঙ্গলে ঘেরা এক নৈসর্গিক জনপদ ছিল পঞ্চখন্ড অধুনা বিয়ানীবাজার। সুরমা আর কুশিয়ারা নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা সেই প্রান্তিক জনপদ এখন আর আগের মতো নেই। উপজেলার সংস্কৃতির জায়গাটুকু দখল করে নিয়েছে স্থানীয় তরুণদের দূরন্তপনা। তাদের উদ্দেশ্যহীন গন্তব্যে সংস্কৃতিচর্চা প্রায় বিলুপ্তির পথে।
বিয়ানীবাজারে নগরায়ণের এই দাপটে ভূপ্রাকৃতিক ইতিহাসের পাতায় আশ্রয় নিয়েছে লাল মাটির টিলা। হারিয়ে গেছে পর্যাপ্ত খেলার জায়গা, জলাশয় ও উন্মুক্ত প্রান্তর। ভালো মানের ইনডোর স্টেডিয়াম গড়ে উঠলেও এই বিশাল জনপদে সাংস্কৃতিক চর্চার জন্য তৈরি হয়নি কোনো স্থায়ী কেন্দ্র। ফলে বদলে গেছে বিয়ানীবাজারের আবহমান সংস্কৃতি। সাহিত্য আড্ডার জায়গা না থাকায় সার্বিকভাবে এখানকার সংস্কৃতিচর্চা ভয়াবহভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, স্বাধীনতার পর, বিশেষ করে ৮০'র দশকে সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক এলাকা হিসেবে বিয়ানীবাজার নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র ছিল। নাটক, সংগীত, সাহিত্যচর্চা, আবৃত্তি, চিত্রকলা ও পথনাটকের মতো আয়োজন একসময় নিয়মিত অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু সেই সাংস্কৃতিক আন্দোলন এখন দৃশ্যমানভাবেই স্তিমিত। এর পেছনে শুধু নগরায়ণ নয়, প্রযুক্তির প্রভাব, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও মানুষের সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনও সমভাবে দায়ী।
সংস্কৃতি সংগঠক মীর হোসেন আল মোহাম্মদী খোকন বলেন, নব্বইয়ের দশকে এখানকার তরুণদের হাত ধরে সংস্কৃতিচর্চার যে জোয়ার এসেছিল, তাতে অনেক নাটকের ও গানের দল গড়ে উঠেছিল। সেগুলো এখন প্রায় বিলিনের পথে।
এর কারণ হিসেবে বিয়ানীবাজার সাংস্কৃতিক কমান্ডের সভাপতি আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, শুধু নগরায়ণ বা পৃষ্ঠপোষকতার অভাব নয়, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বৈশ্বিক বিনোদন হাতের মুঠোয় চলে আসাও একটি বড় কারণ। আগে বিকালে খেলাধুলা বা সাংস্কৃতিক সংগঠনে সময় দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। এখন ঘরে বসেই মানুষ সিনেমা, নাটক বা গান উপভোগ করছে।
বিয়ানীবাজারের নাট্যকর্মী ও স্থানীয় প্রেসক্লাব সভাপতি সজীব ভট্রাচার্য সংস্কৃতিচর্চা সংকুচিত হওয়ার কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করে বলেন, মোবাইল ফোন ও সামাজিক মাধ্যমের সহজলভ্যতা মানুষকে ঘরে বন্দি করে ফেলেছে, ফলে সরাসরি সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণ কমেছে। পড়াশোনা, কোচিং ও ক্যারিয়ারের চাপে তরুণরা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। পরিবারগুলোও এখন কেবল একাডেমিক সাফল্যকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। মহড়া কক্ষের অভাব, নিয়মিত চর্চার জায়গার সংকট এবং আর্থিক দুর্বলতার কারণে অনেক সংগঠন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। তাছাড়া নিরাপত্তা ও অনুমতির নানা জটিলতার কারণে আগের মতো উন্মুক্ত মঞ্চ বা পথনাটকের আয়োজন এখন আর সহজ নয়।
কলামিষ্ট ও সংস্কৃতি সংগঠক আতাউর রহমান বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে যারা নিজেদের গাঁটের পয়সা খরচ করে সংস্কৃতিচর্চা বেগবান রেখেছিলেন, রাষ্ট্র তাদের বা সংগঠনগুলোর জন্য সেভাবে কিছুই করেনি। বর্তমান আর্থসামাজিক বাস্তবতায় সংস্কৃতির জন্য সেই উদ্যমী মানুষগুলো আর আগের মতো ত্যাগ স্বীকার করতে পারছে না। নতুন প্রজন্মও সেভাবে সম্পৃক্ত হচ্ছে না।
বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক দ্বারকেশ চন্দ্র নাথ বলেন, এই অবস্থা থেকে উত্তরণে রাষ্ট্রকে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। সচেতন উদ্যোগ, তরুণদের সম্পৃক্ততা এবং স্থানীয় সংগঠনগুলোর পুনর্জাগরণের মাধ্যমেই কেবল এই সাংস্কৃতিক চর্চাকে আবারও প্রাণবন্ত করে তোলা সম্ভব। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া কোনোভাবেই একটি এলাকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখা সম্ভব নয়।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com