মিলাদ জয়নুল:
বিয়ানীবাজারের শিক্ষাব্যবস্থা এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। শিক্ষায় অভিগম্যতা এবং সাক্ষরতার হার বৃদ্ধিতে ঈর্ষণীয় সাফল্য এলেও শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এখানকার শিক্ষার্থীদের নাজুক অবস্থান কার্যত ইঙ্গিত দেয়—বিয়ানীবাজারের শিক্ষার মান তলানিতে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিয়ানীবাজারের শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা হচ্ছে শিখন ঘাটতি। স্থানীয় শিক্ষকদের একটি বড় অংশ আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি এবং নতুন কারিকুলাম সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত নন। অনেক শিক্ষকই পুরোনো মুখস্থনির্ভর পদ্ধতিতে অভ্যস্ত। তাছাড়া প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় মেধাবী ও যোগ্য প্রার্থীরা এই পেশায় আসতে আগ্রহ দেখান না। অথচ শিক্ষক হচ্ছেন শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণ। এদিকে একের পর এক অভিজ্ঞ শিক্ষক অবসরে যাচ্ছেন, কিন্তু শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে, শিক্ষার মানও ক্রমেই নিম্নগামী হয়ে পড়ছে।
চারখাই বাগবাড়ী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুস সালাম বলেন, জেলা কোটায় শিক্ষক নিয়োগ না দিলে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। একজন শিক্ষক প্রতিদিন ৩০-৩৬ কিলোমিটার দূরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে পাঠদান করা কষ্টসাধ্য। তাছাড়া শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধাও অপ্রতুল। শূন্যপদের কারণে মানসম্মত পাঠদান সম্ভব হচ্ছে না।
জানা গেছে, আগে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য হলে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ দিয়ে স্কুলের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানো হতো। কিন্তু বর্তমানে সেই প্রক্রিয়া পরিবর্তন করে এই পদগুলোতে সরাসরি এনটিআরসি এর মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হবে। ফলে উপজেলার অধিকাংশ বিদ্যালয়ে এ পদগুলো এখন খালি পড়ে আছে। এ অবস্থায় প্রশাসনিক নেতৃত্বহীনতায় অনেক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
খলিল চৌধুরী আদর্শ বিদ্যা নিকেতনের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালিক জানান, বিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল থেকে অস্থায়ী মাস্টাররোলে শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে কোনোভাবে ক্লাস চালানো হলেও তা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। যদি দ্রুত শিক্ষক সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তবে বিয়ানীবাজারের মাধ্যমিক শিক্ষার ভিত্তি আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
মাধ্যমিকের সাথে পাল্লা দিয়ে দ্রুত অবনতি হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষারও। উপজেলার প্রাথমিকের প্রায় ৬৫ শতাংশ (কথিত) শিক্ষার্থী রিডিং পারে না-এমন অভিযোগ আছে। আন্তরিক ও যোগ্যতা সম্পন্ন মেধাবী শিক্ষকের অভাবে প্রাথমিকে রুগ্ন দশা কাটার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছেনা। বিয়ানীবাজারের শহর ও গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ডিজিটাল বৈষম্য প্রকট। প্রাথমিক শিক্ষাকে শিশুর শিক্ষার পথে যাত্রার গোড়াও বলা যায় একে। অথচ সেই গোড়াতেই দেখা যাচ্ছে চরম সংকট। উপজেলায় প্রধান শিক্ষক ও সহকারি শিক্ষক মিলিয়ে প্রায় শতাধিক পদ ফাঁকা ।
উপজেলার বিপুলসংখ্যক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম ভীষণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়াও টয়লেট ও বিশুদ্ধ পানির অভাব শিক্ষার পরিবেশ আরও প্রতিকূল করে তোলেছে। অনেক বিদ্যালয়ে চার্ট, লাইব্রেরি, আইসিটি উপকরণ ও ডিজিটাল শিক্ষণ সুবিধা নেই। ফলে শিশুরা কেবল বইনির্ভর শিক্ষায় সীমাবদ্ধ থেকে সৃজনশীলতা ও কৌতূহল হারাচ্ছে। প্রাথমিকের মূল্যায়ন ব্যবস্থাও এখনও পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও মুখস্থনির্ভর, যা শিশুর সৃজনশীলতা বিকাশে বাধা দেয়।
বিয়ানীবাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক জিয়া উদ্দিন আহম্মদ বলেন, প্রধান শিক্ষকের পদ শুধু প্রশাসনিক নয়, শিক্ষা কার্যক্রমের মানোন্নয়নেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা শ্রেণি পাঠদান পর্যবেক্ষণ, তত্ত্বাবধান এবং মডেল শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। তাঁদের অনুপস্থিতি সরাসরি শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি বাড়িয়ে তুলছে, যা এমনিতেই উদ্বেগের কারণ।
শিক্ষাবিদ ও কলামিষ্ট আতাউর রহমান বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষকদের উপস্থিতি ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত ও কঠোর জবাবদিহিতা ও মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com