প্রজন্ম ডেস্ক:
অনেক ইস্যুর ভিড়ে শুরুতে কিছুটা নিষ্প্রাণ থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন জমে উঠেছে মনোনয়নপত্র বিতরণের শেষ দিনে। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবারের ডাকসু নির্বাচন। সবসময় সরকারি দল ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে মূল লড়াই হলেও এবারের চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আছে অন্তবর্তী সরকার। যাদের কাগজে-কলমে কোনো ছাত্র সংগঠন নেই।
এমনকি কার্যত তাদের কোনো প্রতিপক্ষ দলও নেই। এমন বাস্তবতায় এবারের ডাকসু নির্বাচনে একক প্যানেল জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন না খোদ প্রার্থী এবং ডাকসুর সাবেক নেতারা। তারা মনে করেন, এবারের নির্বাচনে দল থেকে বেশি কাজ করবে ব্যক্তি ইমেজ এবং জুলাই বিপ্লবের ভূমিকা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল সোমবার। বিভিন্ন পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মোট ৫৬৫ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে শেষ দিন সোমবার মনোনয়নপত্র নিয়েছেন ৪৪২ জন। তফসিল অনুযায়ী ডাকসু নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে আগামী ৯ সেপ্টেম্বর। মনোনয়নপত্র গ্রহণের শেষ দিন ১৯ আগস্ট। পরদিন ২০ আগস্ট মনোনয়নপত্র বাছাই ও ২১ আগস্ট প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হবে। তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের দিন ২৫ আগস্ট। প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে ২৬ আগস্ট।
বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত সংগঠনগুলোর মধ্যে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরসহ জুলাই বিপ্লবে সামনের সারির পরিচিত মুখ গতকাল মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। ছাত্রদল ছাড়া অনেকেই নিজস্ব প্যানেল ঘোষণা করেছে।
ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের প্যানেলে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন আবিদুল ইসলাম খান। তিনি ঢাবি শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০১৫-১৬ সেশনের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, সংগঠনের নির্দেশনা অনুযায়ী ফরম সংগ্রহ করেছি। সংগঠন থেকে প্যানেল ঘোষণা করলেই আমি আমার পরিকল্পনার কথা জানাব। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে যা যা দরকার, ছাত্রদলের প্যানেল নির্বাচিত হলে তাই তাই করব-যোগ করেন তিনি।
ছাত্রদল সূত্র জানিয়েছে, ভিপি পদে প্রার্থী হতে পারেন আবিদুল ইসলাম খান। জিএস পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন কবি জসীম উদ্দীন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক এবং উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী শেখ তানভীর বারি হামীম। অন্যদিকে এজিএস পদে আলোচনায় রয়েছেন বিজয় একাত্তর হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক তানভীর আল হাদী মায়েদ।
এদিকে একদল শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করছে বলে অভিযোগ করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। সোমবার সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করে সংগঠনটির ঢাবি শাখা। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ডাকসু নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি। ছাত্রদলের জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে একদল শিক্ষার্থী ডাকসু নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করছে।
পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির। ২৮ সদস্যের এ প্যানেলে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে নির্বাচন করবেন সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি সাদিক কায়েম। সাধারণ সম্পাদক পদে লড়বেন শিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এসএম ফরহাদ। সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে লড়বেন মহিউদ্দিন খান। তিনি শিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক। ঘোষিত প্যানেলে ১৩টি সদস্য পদেও প্রার্থী দিয়েছে শিবির। তবে তাদের নাম সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করা হয়নি।
ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর সমন্বিত জোট গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের নেতাকর্মীরা। তবে তারা প্যানেলের নাম ঘোষণা করেননি। জোটের পক্ষ থেকে ভিপি পদে মনোনয়ন নিয়েছেন শামসুন্নাহার হল ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি। আর জিএস পদে ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবি সভাপতি মেঘমল্লার বসু।
ইমি আগের সংসদে শামসুন্নাহার হলের ভিপি ছিলেন। নির্বাচন নিয়ে তিনি বলেন, আমি আগেরবারের মতো এবারও স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সম্প্রতি যখন দেখলাম একাত্তবিরোধী পদক্ষেপ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে; তখন তা রুখে দিতে আমরা ঐক্যবদ্ধ প্যানেল গড়েছি। যারা ২০২৪ ও ১৯৭১ সালের প্রশ্নে প্রমাণিত যোদ্ধা তাদের নিয়েই আমরা প্যানেল দিয়েছি। অনেকে বলার চেষ্টা করছেন এটি বামদের প্যানেল। আসলে তা নয়। আমরা নির্দলীয় প্যানেল। তিনি বলেন, আশা করি শিক্ষার্থীরা এবার ব্যালটের মাধ্যমে গুপ্ত রাজনীতির জবাব দেবে। নির্বাচন নিয়ে কিছুটা আশঙ্কা কাজ করলেও আমরা জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী।
ডাকসু নির্বাচনে প্যানেল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ। তাতে ভিপি হিসেবে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লা এবং জিএস হিসেবে সাবিনা ইয়াসমিনকে মনোনীত করা হয়েছে। ‘ডাকসু ফর চেঞ্জ’ শীর্ষক এ প্যানেল থেকে এজিএস পদে লড়বেন ছাত্র অধিকারের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্য সচিব রাকিবুল ইসলাম।
ডাকসু নির্বাচন হচ্ছে এটিই আনন্দের খবর বলে উল্লখ করেন বিন ইয়ামিন মোল্লা। তিনি বলেন, ডাকসু নির্বাচনই হলো গণতন্ত্রের আসল সৌন্দর্য। ছাত্র অধিকার পরিষদ পূর্ণাঙ্গ প্যানেল দিয়েছে। নারীদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে আমরা জিএস পদে এক নারীকে প্রার্থী করেছি। এবারের নির্বাচনে পূর্ণ প্যানেলের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। ছাত্র অধিকার পরিষদ সবসময় শিক্ষার্থীদের পাশে ছিল। তাদের সমস্যা নিয়ে ধারাবাহিক কাজ করেছে ছাত্র অধিকার পরিষদ। কোটা আন্দোলন থেকে শুরু করে সবশেষ জুলাই আন্দোলন সবখানে আমাদের নেতাকর্মীদের সরব উপস্থিতি ছিল। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে আমার নামে এক ডজন মামলা হয়েছে। তিনি বলেন, ডাকসু নির্বাচন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসহ অনেকের অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতা আছে। নির্বাচন বানচাল করতে কাজ করছে একটি মহল। দিনশেষে আমরা চাই একটি কার্যকর ও সুন্দর ডাকসু।
নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্যানেল ঘোষণা করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা। মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের শেষ দিনে ফরম সংগ্রহ শেষে মঙ্গলবার (আজ) প্যানেল ঘোষণার কথা তিনি। জানা গেছে, প্যানেলে ভিপি পদে উমামা ফাতেমা, জিএস পদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাবেক সভাপতি আল সাদী ভূঁইয়া, এজিএস পদে সাংবাদিক সমিতির বর্তমান সভাপতি মহিউদ্দিন মুজাহিদ মাহী থাকবেন। উমামা ফাতেমা বলেন, আমরা শিক্ষার্থীবান্ধব একটি ডাকসু প্যানেল ঘোষণা করব।
এ ছাড়া ডাকসু নির্বাচনে গবেষণা ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে ছাত্রলীগের হামলায় আহত সানজিদা আহমেদ তন্বী। তার সম্মানার্থে এ পদে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের (বাগছাস) কেউ মনোনয়ন ফরম কিনবেন না বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ডাকসুর সবশেষ ভিপি গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ডাকসুর নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনে খুব একটা প্রভাব ফেলবে না বলে আমার মনে হয়। সবসময় দেখা গেছে, ডাকসুতে সরকারবিরোধী পক্ষের ছাত্র সংগঠন জয়ী হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভোটের মাধ্যমে সরকারের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করেন। এবার সরকারের কার্যত কোনো দল নেই। যদিও সরকারের প্রিয় দল হিসেবে পরিচিতি এনসিপি। তাদের ছাত্র সংগঠন আছে বাগছাস। এ দলের নেতারাও জুলাই অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে ছিলেন। অর্থাৎ এবার সবাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে। তাই আমার মনে হচ্ছে, এবারের ডাকসু নির্বাচনে একক প্যানেল জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এবারের নির্বাচনে দল থেকে বেশি কাজ করবে ব্যক্তি ইমেজ এবং জুলাই বিপ্লবের ভূমিকা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. স ম আলী রেজা বলেন, যদিও ডাকসু নির্বাচন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তবু এটি জাতীয় নির্বাচনে একেবারে প্রভাব ফেলবে না, এটি বলা যাবে না। ডাকসুর সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনের কিছুটা সম্পর্ক আছে। কেননা যারা এখানে ভালো ফল করবে, তাদের দলগুলো নিশ্চয়ই ভালো অবস্থানে থাকবে।
১৯৭৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ অনুসারে, প্রতি বছর ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। ডাকসু মনোনীত পাঁচ শিক্ষার্থী প্রতিনিধি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিনেটের সদস্য হন। শতবর্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এখন পর্যন্ত ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে ৩৭ বার। এর মধ্যে ২৯ বারই হয়েছে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের ৫০ বছরে। স্বাধীন দেশে ৫৩ বছরে মাত্র আটবার ভোট দেখেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com