প্রজন্ম ডেস্ক:
বায়ুদূষণ, সবুজ এলাকা কমে যাওয়া, জলাভূমি ভরাট এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে রাজধানী ঢাকার ভয়াবহ পরিবেশ সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আন্তর্জাতিকভাবে প্রায়ই বিশ্বের সর্বোচ্চ দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকা মহানগর শীর্ষে উঠে আসে। ফলে হুমকির মুখে পড়ছে নগরবাসীর স্বাস্থ্য। গবেষকরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ঢাকা একসময় বসবাসের অযোগ্য শহরে পরিণত হবে। তাদের মতে, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ, সবুজায়ন, জলাধার সংরক্ষণ এবং সঠিক নগর পরিকল্পনা ছাড়া রাজধানীকে বসবাসযোগ্য রাখা সম্ভব নয়।
ঢাকার চলমান পরিবেশ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। গত শনিবার ‘রাজধানী ঢাকার টেকসই উন্নয়নে বিকেন্দ্রীকরণ ও পরিবেশ সুরক্ষা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় পরিবেশ উপদেষ্টা বলেছেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের মুখে ঢাকার সমস্যা বাড়ছে। রাজধানীর জনসংখ্যা আর যেন না বাড়ে, সেটি নিয়ে কাজ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের মুখে ঢাকার সমস্যা বেড়ে যাচ্ছে। বাইরের জেলা, উপজেলায় কর্মের সংস্থান না থাকায় মানুষ ঢাকামুখী হচ্ছেন। এ জন্য অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ করতেই হবে। ঢাকার বাইরে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। জনসংখ্যা যেভাবে কমাতে চাচ্ছি সেভাবে হয়তো কমাতে পারব না। তবে এখানের জনসংখ্যা আর যেন না বাড়ে, সেটি নিয়ে কাজ করতে হবে।’
ঢাকার পরিবেশ বিপর্যয়
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে ১৯৮০ সালে ঢাকার সবুজ আচ্ছাদন ছিল ২১.৬ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১১.৬ শতাংশে। অর্থাৎ চার দশকে অর্ধেক সবুজ হারিয়েছে ঢাকা। গাছপালা বিলুপ্ত হয়ে গেছে প্রায় ৫০ শতাংশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, একটি শহরে মাথাপিছু কমপক্ষে ৯ বর্গমিটার সবুজ জায়গা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকার বেশির ভাগ এলাকায় এ মান অর্জন করা সম্ভব হয়নি। সূত্রাপুর, কলাবাগান, বংশাল, মিরপুর ও রামপুরার মতো এলাকাগুলো এখন প্রায় শতভাগ কংক্রিটে মোড়ানো। কোথাও খোলা জায়গা নেই, নেই পর্যাপ্ত গাছপালা।
সবুজ হারানোর সরাসরি প্রভাব পড়েছে তাপমাত্রায়। ১৯৮০ সালের পর থেকে ঢাকার গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এখন গড়ে তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রির নিচে নামছে না। কিছু এলাকায় তো পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।
শ্যামপুর, হাজারীবাগ, রামপুরা, দারুস সালাম ও তেজগাঁওকে ‘তাপের হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব অঞ্চলে প্রায়ই তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রির ওপরে থাকে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা তীব্র গরমে অস্বাস্থ্যকর ও কষ্টকর জীবনযাপন করছেন।
গবেষকদের মতে, যদি সবুজ কমতে থাকে এ হারে, তাহলে ২০৩৫ সালের মধ্যেই ঢাকার ৭০ শতাংশ মানুষ তাপ-দূষণজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ)-২০২৫-এর গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্সে বিশ্বের বসবাসযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকা তিন ধাপ পিছিয়ে ১৭১তম অবস্থানে রয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব মনে করেন, ‘বাংলাদেশের নগর জনসংখ্যার ৩২ শতাংশ রাজধানীতে থাকলেও সবুজের ঘাটতি ও অতিরিক্ত উষ্ণতা জীবনযাপনকে হুমকির মুখে ফেলেছে। অতিকেন্দ্রিকতার কারণে ঢাকায় বন্যা, জলাবদ্ধতা, বর্জ্যসংকট ও জনস্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ছে।’
জলাধার বিলুপ্ত: নগর হচ্ছে জলশূন্য
ঢাকার জলাধারের অবস্থাও ভয়াবহ। গত ৪৪ বছরে রাজধানীর প্রায় ৬০ শতাংশ জলাধার বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমানে শহরের মাত্র ৪.৮ শতাংশ এলাকা জলাধার হিসেবে টিকে আছে। অথচ আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী একটি শহরে কমপক্ষে ১০ শতাংশ জলাধার থাকা বাধ্যতামূলক।
গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার ৫০টি থানার মধ্যে মাত্র ৬টিতে জলাধারের মান বজায় আছে, যা খুবই উদ্বেগজনক। জলাধারগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা বাড়ছে। সূত্রাপুর, মিরপুর, গেন্ডারিয়া ও কাফরুল- এসব এলাকা এখন প্রায় জলশূন্য।
বায়ুদূষণের শীর্ষে ঢাকা
বায়ুদূষণ আজ ঢাকার সবচেয়ে বড় সংকট। প্রতিদিন নির্মাণকাজের ধুলা, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, শিল্প-কারখানার ধোঁয়া, ইটভাটার ধোঁয়া এবং উন্মুক্তভাবে ফেলে রাখা নির্মাণসামগ্রী থেকে ধূলিকণা বাতাসে মিশছে। এ ছাড়া ল্যান্ডফিল থেকে নিঃসৃত মিথেন গ্যাস ও সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির ধুলাবালি বায়ুর মানকে ভয়াবহভাবে নষ্ট করছে। ফিটনেসবিহীন গাড়ির কালো ধোঁয়া শহরের বাতাসকে আরও অস্বাস্থ্যকর করে তুলছে। ফলে রাজধানীবাসীর ফুসফুসে প্রতিদিন বিষ ঢুকছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বায়ুদূষণই এখন ঢাকার মানুষের মৃত্যু ও শ্বাসযন্ত্রের রোগের অন্যতম প্রধান কারণ। হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, ফুসফুসের ক্যানসারসহ নানা রোগ বাড়ছে।
অপরিকল্পিত নগরায়ণের অভিশাপ
ঢাকার পরিবেশ সংকটের আরেকটি বড় কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ণ। মাঠ, পার্ক ও খোলা জায়গা ক্রমাগত দখল হচ্ছে। রাস্তা সম্প্রসারণ বা বহুতল ভবন নির্মাণের নামে প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক খোলা স্থান।
অপরিকল্পিতভাবে বাড়তে থাকা জনসংখ্যা এ সংকটকে আরও তীব্র করছে। অবকাঠামো ও সেবার ওপর চাপ বাড়ছে। যেখানে রাস্তা, ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা সীমিত, সেখানে প্রতিদিন নতুন নতুন ভবন ও বাণিজ্যিক স্থাপনা তৈরি হচ্ছে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘টেকসই ঢাকা তৈরি করতে হলে পুরো বাংলাদেশকেই টেকসই করতে হবে। কর্মসংস্থানের বিকল্প উৎস না থাকায় ঢাকার ওপর চাপ বাড়ছে এবং কমার সম্ভাবনাও নেই। তাই সব উন্নয়ন কার্যক্রম একটি সংস্থার আওতায় এনে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।’
স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মানের অবনতি
পরিবেশসংকটের প্রভাব পড়ছে সরাসরি জনস্বাস্থ্যে। বায়ুদূষণের কারণে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি ও হৃদরোগ বেড়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হিটস্ট্রোক ও পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়ছে। গবেষণা বলছে, ঢাকার মানুষ গড়ে দিনে অন্তত ৮-১০ ঘণ্টা দূষিত বাতাসে শ্বাস নিচ্ছেন। দীর্ঘ মেয়াদে এটা ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করবে।
বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য: বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া বিকল্প নেই
নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ঢাকার উন্নয়নকে মহানগরের বাইরে নিয়ে যেতে হবে। এর জন্য দেশের প্রান্তিক এলাকাগুলোর অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য যথাযথ উন্নয়ন পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন করতে হবে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com