প্রজন্ম ডেস্ক:
পিলার থেকে খুলে পড়ে যাচ্ছে বিয়ারিং প্যাড। গত বছর বড় অঘটন না ঘটলেও এবার গেছে একজনের প্রাণ। ত্রুটি চিহ্নিত করে সারাতে না পারলে এমন ঘটনা বারবার ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। রাজধানীর বুক চিরে গড়ে ওঠা ৩৩ হাজার কোটি টাকার স্বপ্নের মেট্রো লাইনের নিচের অংশ এভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
গতকাল একজনের মৃত্যুর পর দেশের বৃহৎ এ প্রকল্পের নির্মাণকাজ নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে আসছে। নকশার ত্রুটি, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার নাকি রক্ষণাবেক্ষণ গাফিলতিতে এমন ঘটনা ঘটছে তা নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। বিয়ারিং প্যাড স্থাপনের সময় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ল্যাব টেস্টে মান উত্তীর্ণ হয়নি। তাছাড়া ফার্মগেট থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত নকশা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।
তবে এসব প্রশ্ন ছাপিয়ে মেট্রোরেল নির্মাণে ত্রুটি সামনে আসছে। নির্মাণকাজ সঠিক থাকলে বিয়ারিং প্যাড এভাবে পড়ে যাওয়ার কথা নয় বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক সামছুল হক এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, বিয়ারিং প্যাড যদি মানহীন হয়ে থাকে, তাহলে দীর্ঘস্থায়ী হবে না। এটা পড়ে যাওয়ার কথা নয়। মানহীন হলে ঘন ঘন রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। এতে খরচ বাড়বে, কিন্তু কোনোভাবেই পড়ে যাবে না। যেহেতু বারবার পড়ে যাচ্ছে, তার মানে এটা আমরা যথাযথভাবে বানাতে পারিনি। তার অর্থই হচ্ছে নির্মাণত্রুটি রয়েছে।
ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফারুক আহমেদ গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, কেন বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ল, তা তদন্ত করা হবে। কার দায়-দায়িত্বে অবহেলা আছে, তাও বের করা হবে। নকশায় ত্রুটি থাকার বিষয়টিও নাকচ করছি না। সবকিছুই তদন্ত করে বের করা হবে।
অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, মেট্রোরেলের জন্য অনেক টাকা খরচ করে জাপানি পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিয়ারিং প্যাডটি বসানো হয়েছে মেট্রোর নিরাপদ চলাচল ও স্থাপনার স্থায়িত্ব ধরে রাখতে। মেট্রোরেলের চলাচলে কম্পনজনিত ভার তৈরি হয়, এটা কোনো প্রকৌশলীর অজানা নয়।
তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় কনসালট্যান্ট দায় এড়াতে পারে না। আগের এমডিসহ যারা নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তারাও দায় এড়াতে পারেন না। যারা দায়ী তাদের খুঁজে বের করতে হবে এবং তাদের দায়ী করতে হবে। শুধু একজন মারা গেছেন, তাকে ক্ষতিপূরণ দিয়েই যদি সরকার দায় শেষ করে, তবে এমন ঘটনা বারবার ঘটতে থাকবে।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত বছর ১৮ সেপ্টেম্বর ৪৩০ নম্বর পিলার থেকে বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়েছিল। তখন আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ১১ ঘণ্টা মেট্রোরেল বন্ধ ছিল। গতকাল রবিবার একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে ৪৩৩ নম্বর পিলারে। পিলারটি ফার্মগেট স্টেশনের ঠিক পশ্চিম পাশে। এতে আবুল কালাম আজাদ নামের একজন পথচারীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় মেট্রোযাত্রী ও নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
প্রকৌশলীরা বলছেন, মেট্রোরেলের মতো বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে ছয় থেকে সাতটি স্তরে কাজ থাকে। এর মধ্যে কনসেপ্ট, প্ল্যানিং, ডিজাইন ও কনস্ট্রাকশন ম্যানেজমেন্টে সবাই গুরুত্ব দেয়। কিন্তু নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর এসেট ম্যানেজমেন্টে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। যদিও বড় প্রকল্পগুলোর জন্য এসেট ম্যানেজমেন্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, কোনো প্রকল্পে কারিগরি বা নির্মাণত্রুটি থাকলে এসেট ম্যানেজমেন্টে এসে তা ধরা পড়বেই।
তারা আরও জানান, কারিগরি ত্রুটি ধরার জন্য নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান অপারেশনস অ্যান্ড মেনইটেন্যান্স ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন তৈরি করে দেয়। সে আলোকে প্রতিদিন, প্রতি সপ্তাহ, প্রতি মাসে এবং প্রতি বছর ধাপে ধাপে এসেট ম্যানেজমেন্টের কাজ করা হয়ে থাকে। এগুলো সঠিকভাবে হলে ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা পড়ার কথা। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি এসেট ম্যানেজমেন্টে দুর্বলতা রয়েছে বলে মনে করছেন প্রকৌশলীরা।
ডিএমটিসিএল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পিলার ও ভায়াডাক্টের সংযোগস্থলে বিয়ারিং প্যাডগুলো বসানোর জন্য বেজ রয়েছে। এটি নাট-বল্টু কিংবা অন্য কিছু দিয়ে আটকানো থাকে না, পিলার ও ভায়াডাক্টের মতো ভারী বস্তুর চাপে এটি টিকে থাকে। বিয়ারিং প্যাড অনেকটা কুশনের মতো কাজ করে। এটি যানবাহনের চাপ পিলারের ওপর সমানভাবে ছড়িয়ে দেয়, ফলে ঝাঁকুনি কম হয় এবং কাঠামো দীর্ঘস্থায়ী থাকে। মান খারাপ হলেও এটা পড়ে যাওয়ার কথা নয়।
একেকটি স্প্যানের ওজন কয়েকশ টন হবে। পিলার ও ভায়াডাক্টের মতো দুই ভারী বস্তুর চাপের মধ্যেও কীভাবে বিয়ারিং প্যাড নিচে পড়ে গেল, তার কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না মেট্রোর প্রকৌশলীরা।
আপত্তি ছিল বুয়েটের : ২০২২ সালে মেট্রোরেলের মানহীন বিয়ারিং প্যাড নিয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের এক সভায় আলোচনা হয়। বিয়ারিং প্যাড-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রকল্পের অগ্রগতি ব্যাহত হয়েছে এবং বরাদ্দের একটি অংশ অব্যবহৃত ছিল বলে ওই বৈঠকে জানানো হয়। শুরু থেকেই বুয়েট নিম্নমানের বিয়ারিং প্যাড নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। এ কারণে এসব বিয়ারিং প্যাড পরিবর্তন করা হয়েছিল বলেও ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, এ ঘটনার তদন্তে সেতু সচিবের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঘটনাটি কি নাশকতা, না নির্মাণত্রুটির কারণে হয়েছে, সেটা খুঁজে বের করা হবে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com