প্রজন্ম ডেস্ক:
ভয়াবহ গ্যাস সংকটের কারণে ঢাকার অধিকাংশ বাসিন্দার দিনের বড় একটা অংশ এখন ব্যয় হচ্ছে রান্না করা কিংবা খাবার সংগ্রহের জন্য। বিকল্প নানা উপায়ে চুলা জ্বালানোর পাশাপাশি রেস্তোরাঁ থেকে খাবার কিনতে গিয়ে তাদের ব্যয়ও বেড়ে গেছে। আবাসিক গ্রাহকদের এমন চরম দুর্ভোগের পাশাপাশি বড় বিপাকে পড়েছেন রেস্তোরাঁ মালিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, সিএনজি স্টেশন এবং এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশনের মালিকরা। অনেকের ব্যবসা বন্ধের উপক্রম হয়ে পড়েছে। সংকট নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও, তা এখনো কাজে আসেনি।
খাতসংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এ পরিস্থিতি থেকে সহসা উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তারা বলছেন, শীতকালে বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত কিছু গ্যাস অন্য খাতে সরবরাহ করে কোনোমতে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করা হলেও, আসন্ন গ্রীষ্মে সংকট আরও তীব্র হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে চাহিদামতো গ্যাসের জোগান নিশ্চিত করা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকার বাসিন্দা আফরোজা লাইলি জানান, তার বাসায় দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাসের চাপ কম। কখনো কখনো একেবারেই গ্যাস থাকে না। বিকল্প হিসেবে এলপিজি ব্যবহার করতেন, কিন্তু সাম্প্রতিককালে এর দাম আকাশছোঁয়া। বাড়তি দাম দিয়েও সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘বাধ্য হয়ে এক সপ্তাহ আগে বিদ্যুৎচালিত চুলা কিনেছি। এখন গ্যাসের নির্ধারিত বিলের পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিলও দিতে হচ্ছে। এতে খরচ অনেক বেড়ে গেছে।’
রাজধানীর অনেক বাসিন্দাই দীর্ঘদিন ধরে তিতাসের সরবরাহ করা প্রাকৃতিক গ্যাসের পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে এলপিজি ব্যবহার করে আসছেন। আবার দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাসাবাড়িতে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় অনেক বাসায় রান্নার জন্য এলপিজি সিলিন্ডারই একমাত্র ভরসা। কিন্তু সরকার নির্ধারিত দামের প্রায় দ্বিগুণ বা তার চেয়েও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে এটি। এমনকি বাড়তি দাম দিয়েও অনেকে সিলিন্ডার পাচ্ছেন না।
মোহাম্মদপুরের বসিলা এলাকার বাসিন্দা সোহানুর রহমান বলেন, ‘এলপিজি তো এখন সোনার হরিণের মতো। ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো দাম নিচ্ছেন। আবার বাড়তি দামেও ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে অনেক সময় রেস্তোরাঁ থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে। এটি যেমন অস্বাস্থ্যকর, তেমনি মাসিক ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।’
প্রায় আট বছর ধরে কলাবাগান এলাকায় বসবাস করেন কর্মজীবী নারী মেহেরিন রহমান। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি সংকট এতটাই বেড়েছে যে, খুব ভোরে অথবা গভীর রাতে কয়েক ঘণ্টার জন্য গ্যাস থাকে, চাপও কম। বেশিরভাগ দিনই রেস্তোরাঁ থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে।’
মগবাজারের গৃহিণী আসমা আক্তার বলেন, ‘আগে সারা দিনের রান্না করতে ২-৩ ঘণ্টা লাগত। এখন ৮-১০ ঘণ্টাতেও রান্না শেষ হয় না। কারণ, চুলা টিমটিম করে জ্বলে। দিনের বেশিরভাগ সময় গ্যাসই থাকে না। কখনো কখনো আধাসিদ্ধ ভাত-তরকারি খেতে হয়। রান্না করতে গিয়ে বাসার অন্যান্য কাজও করতে সমস্যা হচ্ছে।’
এদিকে গ্যাস সংকটের পাশাপাশি এলপিজি নিয়ে চরম নৈরাজ্যের কারণে রেস্তোরাঁ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও চরম বিপাকে পড়েছেন। মিরপুর-১ এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শাহীন আলম বলেন, ‘এলপিজির যে দাম, তাতে সারা দিন চা-কফি বিক্রি করে এখন আর পোষায় না। বাড়তি দাম নিলে কাস্টমাররা প্রতিবাদ করেন।’
রাজধানীর বনশ্রী, ভাসানটেক, বাসাবো, হাজারীবাগ, আজিমপুর, গাবতলী, খিলগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় এবং ঢাকার আশপাশের অঞ্চলেও গ্যাস সংকট নিয়ে একইরকম চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, গ্যাসের সরবরাহ আগের মতোই আছে। শীতে স্বাভাবিকভাবেই গ্যাসের চাপ কমে যায়, যার ফলে এ সমস্যা তৈরি হয়েছে। শীতের পর পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস অনুসন্ধানে অবহেলার কারণে পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও অনুসন্ধানে গতি নেই। এটা খুবই দুঃখজনক। গ্যাস সংকটের এ পুরনো সমস্যা রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য অনুসন্ধান কার্যক্রমে ব্যাপক জোর দিতে হবে।’
এলপিজির অস্থির পরিস্থিতি নিয়ে জ্বালানি উপদেষ্টা বলেন, ‘বর্তমানে প্রায় ৯৮ শতাংশ এলপিজি বেসরকারি খাত আমদানি করে। সরকার নিজ উদ্যোগে আমদানির বিষয়টি বিবেচনা করছে। গ্যাস সংকট সমাধানে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানের আমদানি সক্ষমতা বাড়ানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আরও কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করবে।’
এলপিজির ৮০ শতাংশ ব্যবহার হয় রান্নার কাজে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ১২ কেজির সিলিন্ডার। এর নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা। কিন্তু বাজারে এখন আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এ দাম দিয়েও অনেক ভোক্তা সিলিন্ডার পাচ্ছেন না।
রান্নার পাশাপাশি গাড়িতে অটোগ্যাস হিসেবেও এলপিজির ব্যবহার হয়। সংকটের কারণে দেশের প্রায় সব এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন এলপিজি অটোগ্যাস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সিরাজুল মাওলা। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেড় লাখের বেশি এলপিজিচালিত গাড়ির ওপর। গাড়ির মালিক ও চালকরা জ্বালানি না পেয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে ঘুরেও গ্যাস পাচ্ছেন না। সিরাজুল মাওলা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশনের মালিকরা চরম ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে রয়েছেন। দীর্ঘদিন স্টেশন বন্ধ থাকায় কর্মচারীদের বেতন, ব্যাংক ঋণের কিস্তি এবং দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় বহন করা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকট এখন আরও তীব্র হয়েছে। বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফারহান বলেন, এমনিতেই আমরা খুব কম গ্যাস পাই। সাম্প্রতিককালে সরবরাহ আরও কমেছে। কম চাপের কারণে একটি গাড়িতে গ্যাস নিতে পাঁচ মিনিটের বদলে আধা ঘণ্টা লাগছে। স্টেশনের খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
সরকারি হিসাবে দেশে গ্যাসের যে সংযোগ রয়েছে, তাতে প্রতিদিন ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দরকার। বাস্তবে চাহিদা প্রায় ৫০০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ২৬০ থেকে ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে ৯০ থেকে ৯৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা মিটছে চড়া মূল্যে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) দিয়ে।
দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ সংস্কারে অবহেলার কারণে পুরনো কূপ থেকে প্রতি বছর গড়ে ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের উৎপাদন কমছে। নতুন গ্যাসের সন্ধানও মিলছে না। অন্যদিকে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিদিন গড়ে ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি এলএনজি আমদানির সুযোগ নেই। এ ছাড়া এর দামও অনেক বেশি। ফলে গ্যাস সংকট দিন দিন বাড়ছে। শীতের কারণে সংকট আরও তীব্র হয়েছে। তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় পাইপলাইনে গ্যাসের সঙ্গে কনডেনসেটের মতো তরল পদার্থ চলে আসে। এতে পাইপলাইনের ভেতর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে চাপ কমে যায়।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রমতে, আপাতত সরবরাহ বাড়ানোর কোনো উপায় তাদের হাতে নেই। বঙ্গোপসাগরে গ্যাসের বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও সেখানে অনুসন্ধান কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। অভ্যন্তরীণ কূপ খনন ও সংস্কারের পরিকল্পনা থাকলেও নতুন গ্যাস পেতে অন্তত এক থেকে দেড় বছর সময় লাগবে। নতুন করে এলএনজি আমদানির পরিকল্পনাও সময়সাপেক্ষ এবং বিপুল অর্থের প্রয়োজন।
এলপিজি সংকট না কাটলে রেস্তোরাঁ বন্ধের হুঁশিয়ারি:
এলপিজি সংকটসহ আরও কিছু সমস্যা নিয়ে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি। সম্মেলনে জানানো হয়, বিগত সরকারের আমলে কৃত্রিমভাবে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকটের কথা বলে রেস্তোরাঁ খাতে এলপিজি সংযোগ বন্ধ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও আমলার যোগসাজশে আমদানি করা এলপিজির ব্যবসা বেসরকারি সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এ সিন্ডিকেট এখন পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। এ ছাড়া সিলিন্ডার বিক্রির কিছু সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে, যারা বাড়তি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করছে। ফলে অতিরিক্ত দামে এলপিজি কিনে রান্না করতে গিয়ে রেস্তোরাঁগুলোর ব্যয় বেড়ে গেছে। এতে খাবারের দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকরা।
এ পরিস্থিতিতে এলপিজি সংকটসহ খাতের অন্যান্য সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে সব রেস্তোরাঁ বন্ধের মতো কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে সমিতি।
সংগঠনটির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার এলপিজি সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ট্রেড ইউনিয়নের নামে হয়রানি, খাদ্য মূল্যস্ফীতি, ওয়ান স্টপ সার্ভিসের অভাব এবং নিয়মবহির্ভূত স্ট্রিট ফুডের বিস্তারে দেশের রেস্তোরাঁ খাত সংকটে পড়েছে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com