প্রজন্ম ডেস্ক:
কয়েক দিন পরই শুরু হচ্ছে সেচ মৌসুম; সঙ্গে পবিত্র রমজান। গ্রীষ্মে তাপমাত্রা বাড়বে। তখন বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হবে। কিন্তু চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জ্বালানির সংস্থান করা দুরূহ হয় পড়বে তখন। জ্বালানি সংকট যেমন রয়েছে, পুরনো দেনা পরিশোধের দায়ও তেমন থাকছে। এবারও গ্রীষ্মে এবং রমজানে গ্যাস-বিদ্যুতের বড় সংকটের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চাহিদার অতিরিক্ত সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও জ্বালানি সংকটের কারণে গ্রীষ্মে লোডশেডিং বাড়বে। লোডশেডিং কমাতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ বাড়ালে গ্যাসের সংকটও বাড়বে। ফলে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়বে; ব্যাহত হবে কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম।
গত ডিসেম্বরে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা সাড়ে ৭ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে এসেছিল। তাপমাত্রা এখন বাড়ছে, বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে। সাধারণ ছুটির দিনে চাহিদা কিছুটা কম থাকে। কিন্তু গত শুক্রবার চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় ১১ হাজার ১৫০ মেগাওয়াটে। পরদিন শনিবার চাহিদা ১১ হাজার ৫৫০ মেগাওয়াটে দাঁড়ায়। ওই দুদিন বিদ্যুতের লোডশেডিং ছিল যথাক্রমে ২৬৪ ও ৩১৬ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) প্রক্ষেপণ অনুযায়ী চলতি মাসে বিদ্যুতের চাহিদা ১২ হাজার মেগাওয়াট, ফেব্রুয়ারিতে সাড়ে ১৩ হাজার মেগাওয়াট, মার্চে সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াট এবং এপ্রিল-মে মাসে সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াট হতে পারে।
গত বছর গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। এ চাহিদা পূরণ হয়নি। ফলে কিছুটা লোডশেডিং করতে হয়েছে।
এবার চাহিদা আরও বাড়বে। কিন্তু জ¦ালানি সংকটের কারণে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। যদিও বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুতের উৎপাদন নিশ্চিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে; নানা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন বাড়লেও এবারের গ্রীষ্মে প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াটের লোডশেডিং হতে পারে। সেই সঙ্গে বাসাবাড়ি ও কারখানায় বাড়বে গ্যাস সংকট।
সম্প্রতি রমজান, সেচ ও গ্রীষ্ম উপলক্ষে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। তিনি বলেন, গত বছর বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক ছিল, এবারও যেন তা-ই থাকে।
বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎসক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু এ বছর সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার মেগাওয়াট। আর এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট। জ্বালানির অভাবে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না।
পিডিবিসূত্র জানিয়েছে, লোডশেডিং সামাল দিতে দৈনিক অন্তত ১৩০-১৪০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দরকার। পায়রা, রামপাল, মাতারবাড়ী, বড়পুকুরিয়া, এস আলম প্রভৃতি বড় কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকেও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে।
গ্যাস-অনুসন্ধানে অবহেলার কারণে প্রতি বছর গড়ে ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের উৎপাদন কমছে। উচ্চমূল্যের আমদানিকৃত এলএনজিসহ বর্তমানে দৈনিক সরবরাহ ২৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। এর মধ্যে দেশি গ্যাস ১৭৬ কোটি ঘনফুট। গত বছর এ সময়ে দেশি গ্যাসের উৎপাদন ছিল ১৮১ কোটি ঘনফুট।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুতের জন্য চাহিদামতো গ্যাস সরবরাহ করতে গেলে বাসাবাড়ি, শিল্প, সার কারখানা ও অন্যান্য খাতে গ্যাসের টান পড়বে। সেজন্য যতটা সম্ভব বিদ্যুতের গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো হবে। তবে চাহিদামতো গ্যাস সরবরাহ কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। কারণ, রাতারাতি দেশি গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো যাবে না। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে ইচ্ছেমতো এলএনজি আমদানিও বাড়ানো যাবে না। অর্থও একটা বড় বিষয়।
সরবরাহ কিছুটা বাড়াতে বৈশি^ক খোলাবাজার থেকে গত বছরের চেয়ে বেশি এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। গ্রীষ্মে পাঁচটি সার কারখানার মধ্যে অন্তত একটি সাময়িক বন্ধ রাখার চিন্তাও করা হচ্ছে; কিন্তু এতে কৃষিতে সংকট দেখা দেবে। এসব উদ্যোগ নিলেও গড়ে সর্বোচ্চ ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করার সুযোগ রয়েছে। তারপরও সংকট থাকবেই।
এ বছর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনে আসার কথা রয়েছে। সেটি হলে এবং ছোট কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে এলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে আশা করছেন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা।
আদানির সঙ্গে অসম চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের যে টানাপড়েন চলছে, তা প্রকট হলে লোডশেডিং আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর অধীনে সম্পাদিত চুক্তিসমূহ পর্যালোচনা জাতীয় কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আদানির সঙ্গে চুক্তির পেছনে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। হুইসেল ব্লোয়ারদের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের নির্দিষ্ট তারিখ, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের নথিপত্র সংগ্রহ করেছে কমিটি।
পর্যালোচনা কমিটির সদস্য অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন, ‘আদানির সঙ্গে চুক্তিতে সাংঘাতিক অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে। এ কথা আদানিকে জানিয়ে দিয়ে তাদের উত্তর চাওয়া উচিত। দ্রুত সিঙ্গাপুর থেকে চুক্তিসংক্রান্ত সালিশি মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। বিলম্ব করলে মামলা দুর্বল হয়ে যাবে। প্রাথমিকভাবে লন্ডনের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এত ভালো তথ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দুর্নীতি মামলায় বিরল।’
বাংলাদেশে সর্বোচ্চ প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আদানি। পাওনা আদায়ে তারা বাংলাদেশ সরকারকে নানাভাবে চাপ দিচ্ছে। পুরনো বকেয়া আদায়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে একাধিকবার বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে আদানি। অন্যদিকে অসম চুক্তি বাতিলেরও জোর দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির শক্ত প্রমাণ পেয়েছে পর্যালোচনা কমিটি। বেসরকারি খাতের কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণেও মিলেছে দুর্নীতির তথ্য।
পর্যালোচনা কমিটির সদস্যরা মনে করেন, আদানির মতো বড় ও অসম চুক্তি চ্যালেঞ্জ করলে বা বাতিল করলে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিলে দেশে বড় ধরনের লোডশেডিং হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
কমিটির সদস্যরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে সুফল পেতে এবং ‘অভিশপ্ত’ চুক্তিগুলো থেকে মুক্তি পেতে হলে জনগণকে সাময়িক কষ্ট সহ্য করার মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে। নতুবা উচ্চমূল্যের বিদ্যুতের চাপে দেশের শিল্পায়ন ও সামগ্রিক অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া বেড়ে ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এসব কেন্দ্রের মালিকরাও বকেয়া পরিশোধে তাগাদা দিচ্ছে সরকারকে। বকেয়া পরিশোধ না করলে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে না বলে তাদের অনেকে পিডিবিকে জানিয়ে দিয়েছে।
পুরনো বকেয়া পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা সম্প্রতি অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের কাছে বোরো মৌসুমের জন্য অতিরিক্ত জ্বালানি কিনতে অর্থ সহায়তা চেয়েছেন। লোডশেডিং সামলাতে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী হওয়া এবং আরও কিছু কৌশল অবলম্বনের পরিকল্পনা করছে বিদ্যুৎ বিভাগ; যেমন সেচ পাম্পের ব্যবহার ভোরে দিকে করা এবং কৃষকদের অলটারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং পদ্ধতিতে ধান চাষে উৎসাহিত করা।
পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, সেচ পাম্পের ব্যবহার যদি সন্ধ্যার পিক আওয়ার থেকে সরিয়ে মধ্যরাত বা ভোরে নেওয়া যায় তাহলে সন্ধ্যার বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট কমানো সম্ভব। বিকল্প পদ্ধতিতে ধান চাষ করলে পানির ব্যবহার কমবে বলে সেচের বিদ্যুৎচাহিদাও কমবে।
গত ৪ জানুয়ারি এক সভায় পিক আওয়ারে সেচ পাম্প ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ, অফ-পিক আওয়ারে সেচে কৃষকদের উৎসাহ দান এবং সন্ধ্যার সময় সিএনজি স্টেশন বন্ধ রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত সরকার প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছে। কিন্তু জ্বালানির সংস্থানে নজর দেয়নি। দেশি গ্যাস অনুসন্ধানে অবহেলা করে আমদানিতে ঝুঁকেছিল। আমদানিপ্রবণতার কারণে উৎপাদনব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে বকেয়ার পরিমাণও।
অর্থসংকটে কয়লা, ফার্নেস অয়েল ও গ্যাস আমদানি ব্যাহত হওয়ায় ২০২৪ সালে গরম মৌসুমের বিভিন্ন সময়ে পায়রা, রামপাল, এস আলমসহ অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন বন্ধ ছিল। ফলে লোডশেডিং বেড়ে গিয়েছিল।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন কারখানার মালিক পালিয়ে যাওয়ায় অনেক কারখানা বন্ধ থাকায় গত বছর চাহিদা কিছুটা কমে গিয়েছিল। গরমও তুলনামূলকভাবে কম ছিল, তাই বিদ্যুৎ পরিস্থিতি অনেকটা স্বস্তিদায়ক ছিল। ইতিমধ্যে বন্ধ কারখানার অনেকগুলো চালু হলেও এবার তাপমাত্রা বাড়তে পারে। ফলে লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com