প্রজন্ম ডেস্ক:
জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ে বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া বিপুলসংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদের এখনো কোনো হদিস নেই। লুণ্ঠিত অস্ত্র-গোলাবারুদের মধ্যে বেশ কিছু উদ্ধার হলেও এখনো উল্লেখযোগ্য অংশ রয়ে গেছে অপরাধীদের হাতে। পাশাপাশি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র এবং পেশাদার অপরাধীদের অপতৎপরতাও বেড়েছে বলে মনে করেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। ফলে রাজনীতির মাঠে আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা বাড়াচ্ছে এসব অস্ত্র-গোলাবারুদ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে ব্যাপক হারে শুরু হয়েছে প্রচার। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটে যাচ্ছেন প্রার্থীরা। সভা-সমাবেশে যোগ দিচ্ছেন ‘হেভিওয়েট’ নেতারা। কিন্তু লুট হওয়া অস্ত্র-গোলাবারুদ বা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সে রকম সাফল্য বা তৎপরতা দেখছেন না তারা।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে গত মঙ্গলবার কুমিল্লায় এক মতবিনিময় সভায় লুট হওয়া অস্ত্র সম্পূর্ণ উদ্ধার না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ।
তিনি বলেন, ‘হারানো ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ব্যাপারে বিশেষ অভিযান চলমান রাখতে হবে। আমাদের চার শতাধিক পিস্তল এখনো হারানো অবস্থায় রয়েছে। এটা আমাদের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ।’
এরই মধ্যে কেরানীগঞ্জে বিএনপি নেতা হাসান মোল্লা দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৪ জানুয়ারি মারা গেছেন। গত ২২ জানুয়ারি তিনি গুলিবিদ্ধ হন। গত ৭ জানুয়ারি রাজধানীর কারওয়ান বাজারসংলগ্ন তেজতুরী বাজারের একটি গলিতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান ওরফে মুছাব্বির নিহত হন। এই ঘটনায় আবু সুফিয়ান মাসুদ নামে আরেকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মক আহত হন। এর আগে ৩ জানুয়ারি যশোর শহরের শংকরপুরে আলমগীর হোসেন নামে বিএনপির এক স্থানীয় নেতাকে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে এভাবেই আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার করে হতাহত করার বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে।
এ প্রসঙ্গে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় জননিরাপত্তার জন্য শঙ্কা বা ঝুঁকি রয়ে যাচ্ছে। এই অস্ত্রগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব অস্ত্র দিয়ে ভয়ভীতি সৃষ্টি করে বিভিন্ন জায়গায় ভয়ানক চাঁদাবাজি করা হচ্ছে। কিন্তু কেউ ভয়ে মুখ খোলার সাহস পাচ্ছে না। নির্বাচনের পরও এসব আগ্নেয়াস্ত্রের বেশ ঝুঁকি থাকবে।’
ড. ওমর ফারুক আরও বলেন, ‘লুট হওয়া এসব অস্ত্র-গোলাবারুদের বহুমুখী প্রভাব রয়েছে, যার মধ্যে ব্যক্তিগত নিরাপত্তাঝুঁকি এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর বাইরেও অবৈধ অস্ত্র অবাধে বাংলাদেশে ঢুকছে। ফলে নিরাপদ বাংলাদেশের যে চিন্তা আমরা করেছিলাম, তার কতটুকু পাব তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।’
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও স্থাপনায় হামলা চালায় বিক্ষুব্ধরা। এ সময়ে পুলিশের ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়। লুট হওয়া এসব অস্ত্রের মধ্যে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার হাজার আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু এখনো ১ হাজার ৩৩১টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব মারণাস্ত্র কার হাতে বা কোথায় কীভাবে আছে, তার কোনো হদিস নেই। এখনো উদ্ধার না হওয়া লুণ্ঠিত এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ১১৩টি চায়নিজ রাইফেল, ৩১টি চায়নিজ সাব-মেশিনগান (এসএমজি), ২০০টির বেশি চায়নিজ পিস্তল, চার শতাধিক (৯x১৯ মি.মি.) পিস্তল, ৩৯২টি ১২ বোরের শটগান, এলএমজিসহ আরও কিছু অস্ত্র। এ ছাড়া ওই সময়ে লুট করা হয় বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্রের ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮টি গুলি। এর মধ্যে এখনো অন্তত আড়াই লাখ গুলির হদিস মেলেনি।
এ প্রসঙ্গে সাবেক আইজিপি এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ‘৫ আগস্টের পর পুরো দেশ এক বিশেষ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ বাহিনী সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়। সেখানে পুলিশের ঘুরে দাঁড়াতে সেনাবাহিনী নানাভাবে সহায়তা করেছে বা করে যাচ্ছে। যদিও লুট হওয়া বা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সেভাবে উল্লেখযোগ্য সাফল্য নেই। ফলে এসব অস্ত্র-গোলাবারুদ অবশ্যই হুমকি হিসেবে রয়ে গেছে।’
আব্দুল কাইয়ুম আরও বলেন, ‘পুলিশ বাহিনীর দীর্ঘদিনের তৃণমূল পর্যায়ের যে যোগাযোগ ও সামাজিক নেটওয়ার্ক ছিল, সবই প্রায় ভেঙে গেছে। যারা এসব অস্ত্র কাছে রেখেছে, তারা নিশ্চয়ই সেগুলো গোপনে রেখেছে এবং রাখবে। এই অবস্থায় গোয়েন্দাদের আরও বেশি তৎপর থাকতে হবে। স্থানীয় নাগরিকদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়তে হবে। পাশাপাশি নির্বাচন যাতে কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য নাগরিকদেরও সজাগ থাকতে হবে।’
এসব আগ্নেয়াস্ত্র রাজনীতির মাঠে ব্যবহার করা হতে পারে বলে মনে করেন অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক। তিনি বলেন, ‘লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র বা অবৈধ অস্ত্র–এগুলো সমাজে চরম ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করছে। নাগরিকের নিরাপত্তার জন্য এসব অস্ত্র মারাত্মক হুমকি। সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে পুরোপুরি সফলতা দেখাতে পারেনি। পাশাপাশি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় রয়ে গেছে। এসব অস্ত্র যারা নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছে, নিশ্চয়ই তাদের কোনো অসৎ উদ্দেশ্য আছে। বিশেষ করে এসব আগ্নেয়াস্ত্র রাজনীতির মাঠে ব্যবহার করা হতে পারে। ফলে নাগরিকের নিরাপত্তা-সুরক্ষার স্বার্থে যেকোনোভাবে লুট হওয়া এবং অবৈধ অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা জরুরি।’
তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, ২০১৬ সালে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র কেনাবেচা নিয়ন্ত্রণে তৎকালীন সরকার একটি পরিপত্র জারি করেছিল। এর ফলে তখন থেকেই বৈধ অস্ত্রের ব্যবসা অনেকাংশেই কমতে থাকে। পক্ষান্তরে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসা বা পেশাদার অপরাধীদের তৎপরতা বেড়ে যায় বলে মনে করেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।
তারা মনে করেন, জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলার নড়বড়ে অবস্থার সুযোগেও একশ্রেণির পেশাদার অপরাধী অস্ত্রের মজুত বাড়িয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন থানা বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লুট হওয়া বিপুল অস্ত্র-গোলাবারুদও চলে গেছে দুর্ধর্ষ অপরাধীদের হাতে। এসব পরিস্থিতি প্রতিনিয়ই বাড়াচ্ছে অজানা শঙ্কা। তার মাঝে গত ১৫ ডিসেম্বর রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও জাতীয় সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের অনুকূলে আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স ও রিটেইনার নিয়োগ নীতিমালা জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই নীতিমালার অনুকূলে অনেকেই অস্ত্রের লাইসেন্স বা অস্ত্র নিয়েছেন বলে জানা যায়। অন্যদিকে জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে আগামী ৩১ জানুয়ারির মধ্যে বৈধ অস্ত্রগুলোও থানায় জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের বিষয়ে সবচেয়ে বেশি নজর দেওয়া হচ্ছে। তার মধ্যে অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অস্ত্র না থাকলে শুধু গোলাবারুদ দিয়ে কোনো কাজ হবে না। পুলিশ এ বিষয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারির পাশাপাশি নিয়মিত অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।’
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com