প্রজন্ম ডেস্ক:
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচার-প্রচারণা চলছে বেশ জোরেশোরে। তবে অতীতে অনুষ্ঠিত ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চিত্র এবং এবারের চিত্রে বেশ পার্থক্য আছে। কারণ দেশ স্বাধীনের পর এবারই প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ব্যানার-পোস্টার ছাড়া।
মূলত পরিবেশ দূষণরোধে নির্বাচন কমিশন ব্যানার-পোস্টার ছাপানোর বিষয়ে এবার বিধিনিষেধ দিয়েছে। আর এই বিধিনিষেধের কারণেই এবার নির্বাচনি বাণিজ্যে বেশ মন্দাভাব চলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে অন্যবার ব্যানার-পোস্টার ছাপানোর ব্যবসা বেশ রমরমা থাকলেও এবার প্রিন্টিং ও প্রেস ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত। কারণ প্রেসগুলোতে কাজ নেই বললে চলে। নির্বাচন ঘিরে শতকোটি টাকার শুধু পোস্টার ছাপানোর ব্যবসাই হয়, তা এবার একরকম বন্ধই বলা যায়। শুধু যে ছাপাখানার ব্যবসা থমকে আছে তা নয়, এবার কাগজ-কালি ব্যবসায়ী, ব্যানার-বিলবোর্ড বানানোর ব্যবসায়ী এমনকি রংতুলিতে ছবি আঁকার শিল্পীদেরও ব্যবসায় চরম মন্দা চলছে।
নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণায় মাইক ব্যবসায়ীরাও ভালো ব্যবসা করেন। নির্বাচন কমিশন এবার প্রচারে মাইক ব্যবহারের সংখ্যাও নির্ধারণ করে দিয়েছে বলে তাদের ব্যবসাতেও এবার টান পড়েছে। এককথায় নির্বাচনকেন্দ্রিক যত ধরনের ব্যবসা রয়েছে তার প্রায় সবই এবার চলছে ঢিমেতালে। তবে শহর-বন্দর-গ্রাম— সব স্থানের চায়ের স্টলে জমছে নির্বাচনি আড্ডা বা নির্বাচনি বিতর্ক। কাজেই শুধু চা দোকানদারদের ব্যবসাই এবারও জমজমাট বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে শহরের চায়ের দোকানের চেয়ে গ্রামের দোকানগুলোতে নির্বাচনি চা বেশি বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে এবারের নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর নির্বাচনি ব্যয়ের পরিমাণ কত হবে, ব্যক্তিগত খরচ, রাজনৈতিক দলের খরচ, অর্থ ব্যয়ের ধরন ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিভিন্ন বিধান ঠিক করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
এতে বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থীর নির্বাচনি ব্যয় তাকে মনোনয়ন দেওয়া রাজনৈতিক দলের দেওয়া ব্যয়সহ ভোটারপ্রতি ১০ টাকা হারে ব্যয় করতে পারবে। এ ছাড়া আড়াই লাখ বা তার চেয়ে কম ভোটারের আসনে প্রার্থীর ব্যয় ২৫ লাখ টাকা আর আড়াই লাখের বেশি ভোটারের আসনের প্রার্থীরা ভোটার সংখ্যা অনুপাতে ব্যয়সীমা রয়েছে। নির্ধারিত ব্যয়ের বেশি করার সুযোগ নেই। এই বিধানের ফলে নির্বাচনি মাঠে টাকার ফ্লো কমেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এর ফলে ভোটের মাঠে অবৈধ টাকার ছাড়াছড়ি হয়তো রোধ করা যাবে, ভোট উৎসবে কিছুটা ভাটা পড়বে।
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘অর্থনীতির অবস্থা ভালো না। দেশে এখন বিনিয়োগ নেই, মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী, জ্বালানির দাম কমছে না ও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি চলছে। এসব কারণে এমনিতেই এক ধরনের স্থবিরতা চলছে। এককথায় বললে সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি চাপে আছে। এ রকম ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। জাতীয় নির্বাচনের সময় প্রচার-প্রচারণার জন্য টাকা খরচ হয়। বাজারে নগদ টাকার প্রবাহ বেড়ে যায়। এতে হয়তো অর্থনীতি কিছুটা চাঙ্গা হবে। তবে এর বিপরীত দিকও আছে— নির্বাচনকে ঘিরে বাজারে বেশি নগদ টাকার ফ্লো তা বাড়লে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যতটা দেখতে পাচ্ছি— এবারের জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থীদের খরচের ব্যাপারেও নির্বাচন কমিশন বেশ কড়া নির্দেশনা দিয়েছে। প্রার্থীরা নির্বাচনে কত টাকা ব্যয় করতে পারবেন সেটিও নির্ধারণ করে দিয়েছে। একই সঙ্গে ব্যানার-পোস্টার ছাপানোর ওপরও বিধিনিষেধ দিয়েছে। এ কারণে অতীতের মতো প্রিন্টিং ব্যবসা হয়তো তেমন একটা জমবে না বা জমেনি। একই সঙ্গে প্রিন্টিং ব্যবসার সহযোগী যেসব ব্যবসা রয়েছে সেগুলোও এবার জমবে না। তাই এবার এসব খাতের ব্যবসায়ীরা অতীতের ১২টি জাতীয় নির্বাচনের মতো রমরমা বাণিজ্য করতে পারবেন না। তাই নির্বাচনকে ঘিরে হয়তো অর্থনীতি কিছুটা গতি পাবে কিন্তু সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি বা ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা হবে বলে মনে হয় না।’
হতাশ প্রেস ব্যবসায়ীরা : খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর অধিকাংশ ছাপাখানা ফকিরেরপুল ও পুরান ঢাকার বাংলাবাজার এলাকায়। ফকিরেরপুলেই বেশি পোস্টার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল ছাপার কাজ হয়। কিন্তু নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণার ভরপুর সময়েও এসব এলাকার ছাপাখানা ঘুরে সব নিস্তব্ধ দেখা গেছে। অলস সময় কাটছে শ্রমিকদের, ব্যবসায়ীদেরও মুখভার।
ফকিরাপুলের ছাপাখানা পাড়ার অন্যতম একটি হচ্ছে ঝর্ণা প্রিন্টিং প্রেস। এ প্রেসে অন্তত ১০টি শিট মেশিন রয়েছে। দিনের অধিকাংশ সময়ই বন্ধ থাকে মেশিনগুলো। কারণ কাজ নেই হাতে। ১২-১৩ জন শ্রমিকের সময় কাটছে গল্প-আড্ডায়।
প্রেসের মেশিন অপারেটর রাকিব হাসান বলেন, ‘বসে আছি, কাজ নেই। ভোটের কাজ আসার অপেক্ষায় ছিলাম আমরা অনেক দিন ধরে। কিন্তু এবার ভালো কাজ পাইনি। ভেবেছিলাম প্রচার-প্রচারণা শুরু হলে হয়তো কাজ পাব। হ্যাঁ, হ্যান্ডবিল ও লিফলেট ছাপানোর কিছু কাজ আমরা পেয়েছি, কিন্তু ভোটের সময় মূল কাজ হচ্ছে ব্যানার-পোস্টার ছাপানো। এবার কড়াকড়ির কারণে এসব কাজ আসেনি, ফলে আমরা দিনের অধিকাংশ সময় মেশিন বন্ধ রেখে বসে থাকি। আমরা যারা প্রেসে কাজ করি তারা অতীতে ভোটের সময় বাড়তি আয় করতাম বেশ অনেক। কারণ রাত-দিন কাজ চলত, ওভারটাইম করে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হতো, এবার কিন্তু তেমনটি নেই। তাই আমরা হতাশ।’
ফকিরাপুল ছাপাখানার গলির সামনে এগোলেও প্রায় সব প্রেসেই মেশিন বন্ধ দেখা যায়। যে দুয়েকটি প্রেসের মেশিন চলছে, সেখানে দেখা যায়, হয়তো কোনো কোচিং সেন্টারের প্রচারপত্র অথবা গাইড বই ছাপার কাজ চলছে। কোথাও পোস্টার, ব্যানার, লিফলেট ও হ্যান্ডবিল ছাপার কাজ চোখে পড়েনি।
‘ছাপাখানা পাড়া’ বলে পরিচিত গলির শেষপ্রান্তে চোখে পড়ে ১১টি শিট মেশিনের বেশ বড় একটি প্রেস। প্রবেশপথে বসে আছেন মালিক রেজওয়ান খান। দাদার হাতে গড়া চৌধুরী প্রেস অ্যান্ড বাইন্ডিংয়ের দেখভাল করছেন তিনি। প্রায় ৩৬ বছরের মুদ্রণ ব্যবসায়ী তারা।
রেজওয়ান খান বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন নিয়ম করায় এবার কোনো প্রার্থী পোস্টার ছাপাতে পারবে না। নির্বাচনে নাকি পোস্টার নিষেধ। নির্বাচন যে আসছে, এটি প্রেসপাড়ায় কেউ জানেই না! ভোটের কোনো কাজই নেই। অল্প-বিস্তর হ্যান্ডবিল ও লিফলেটের কাজ পেয়েছি। এ দিয়ে তো আর প্রেস চলে না। তবে সামনে বই মেলা থাকায় আমরা বেশ কিছু বইয়ের কাজ পেয়েছি, সেগুলোর কাজই এখন চলছে। কিন্তু অতীতে ভোটকে কেন্দ্র করে আমাদের যে বাণিজ্য হয় সেটিতো আর এবার হলো না।’
এ ছাড়া নয়াপল্টনে প্রায় চার যুগ ধরে প্রিন্টিংয়ের ব্যবসা করছেন আমিনুল শেখ। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, প্রিন্টার্স ব্যবসায় শুধু ছাপাখানার মালিক নন, কাগজ, রং ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরাও এখন বেকায়দায়। যারা প্রিন্টিং ব্যবসায় জড়িত এদের এখন কী হবে? অনেক ব্যবসায়ীর ঋণ রয়েছে, কোটি কোটি টাকা মূল্যের মেশিন রয়েছে— এগুলোর কী হবে?
রাজধানীর বিজয়নগরের আশিক প্রিন্টার্সের সুপারভাইজার জহিরুল ইসলাম জনি বলেন, ‘নির্বাচনে প্রার্থীরা পোস্টার ব্যবহার করতে পারবে না এমন সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী। এ ব্যবসা মূলত পোস্টারকেন্দ্রিক, পোস্টার ছাপানোর অর্ডার না পেলে এ ব্যবসায় তেমন লাভ নেই। তা ছাড়া ডিজিটাল যুগে এখন ওয়াজ-মাহফিল কিংবা যেকোনো প্রচার-প্রচারণায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহৃত হচ্ছে। ইদানীং ভিজিটিং কার্ড ছাপাও কমে গেছে, সবই নেট দুনিয়ার কারণে। এমন অবস্থায় নির্বাচনি পোস্টার ছাপানো বন্ধের নির্দেশনা পুরো সেক্টরকে ক্ষতির মুখে ফেলছে।’
ব্যানার-রংতুলি শিল্পীরাও হতাশ : জাতীয় সংসদ নির্বাচন এলে ব্যানার তৈরি ও রংতুলি শিল্পীদেরও ব্যবসা বেশ জমে যায়। এবার তাদের ব্যবসাতেও মন্দা। জাতীয় নির্বাচন এলেই এসব শিল্পের দোকানে পা ফেলার জায়গা থাকত না। ব্যানার দরকার হলেই প্রার্থীর লোকেরা চলে আসত এসব দোকানে। দোকানের সামনে কাপড় টাঙানো থাকত, ভেতরে রংতুলি আর রঙের গন্ধে ভরা থাকত ব্যস্ত সময়। কিন্তু সেই দৃশ্য এখন আর নেই। নির্বাচনি প্রচার চলছে, অথচ দোকানে সেই চেনা ভিড় নেই— নেই ব্যানারের কাপড়, সেøাগানের শব্দ। দোকানের ভেতর কর্মীরা ঠিকই আছেন, কিন্তু সামনে ছাপার কাপড় নয়, রয়েছে মাটির কলসি। রংতুলির আলতো টানে কলসির গায়ে ফুটে উঠছে আল্পনা। সামনে রাখা গায়ে হলুদের সাজসজ্জার অর্ডার।
রাজধানীর ফকিরেরপুলে এমনই একটি দোকান রয়েছে কবীর মাহমুদের। তিনি বলেন, ‘আমি ২০ বছর ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। জাতীয় নির্বাচন এলে আমাদের দম ফেলার সময় থাকে না। কারণ অনেক প্রার্থী তাদের ব্যানার-পোস্টারের ডিজাইন আমাদের কাছ থেকে করে নিত, রংতুলির আঁকা ছবিও অনেকে ব্যবহার করতেন। এবার ব্যানার-পোস্টার নিষিদ্ধ থাকায় তাদের আর দেখা নেই। ফলে আমাদের এবার ব্যবসা একেবারে নেই বললেই চলে। শুধু দৈনন্দিন কিছু কাজ করছি আমরা।’
কি বলছেন প্রেস মালিকরা : নির্বাচনের মৌসুমে শুধু ঢাকার ছাপাখানাগুলোতেই একশ কোটি টাকার ওপরে ব্যবসা হয় উল্লেখ করে বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণায় পোস্টার ব্যবহার তো সেই পাকিস্তান আমল থেকেই। এ জন্য এই কেন্দ্রিক বড় ব্যবসা গড়ে উঠেছে। শিট মেশিনে যারা কাজ করেন, তারা মূলত পোস্টার-লিফলেট ছাপার কাজই বেশি করেন। তারা এবার বড় ধরনের ধাক্কা খাবেন, লোকসানে পড়বেন। নির্বাচনি পোস্টার নিষিদ্ধ হওয়ায় এই ব্যবসায় পুরোপুরি ধস নেমেছে এবার।
তোফায়েল খান আরও বলেন, ‘নির্বাচনে শুধু ঢাকার প্রেসগুলোতেই শতকোটি টাকারও বেশি ব্যবসা হয়। যদি শুধু লিফলেট-হ্যান্ডবিল ছাপা হয়, তা হলে সেটির বাজার ১০ কোটিরও কম হবে। শুধু ছাপার হিসাব নয়, এগুলো পরিবহন ও সরবরাহের কাজেও শ্রমিকরা আর্থিকভাবে লাভবান হন। সেই পথও এবার বন্ধ হয়ে গেল।’
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com