প্রজন্ম ডেস্ক:
২০২৪ সালে দিল্লি-ঘনিষ্ঠ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে চীনের প্রভাব আরও জোরদার হয়েছে। বিশ্লেষক ও রাজনীতিকদের মতে, নির্বাচনের পর সেই প্রভাব আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে একই সঙ্গে তারা বলছেন, এত বড় প্রতিবেশী হওয়ায় ভারতকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়।
নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রধান দুই দল ঐতিহাসিকভাবে ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার মতো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখেনি। হাসিনার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এখন নিষিদ্ধ। বর্তমানে শেখ হাসিনাও স্বেচ্ছা নির্বাসনে নয়াদিল্লিতে অবস্থান করছেন। বর্তমানে চীন ঢাকায় বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। সর্বশেষ ভারতের সীমান্তের কাছাকাছি একটি ড্রোন কারখানা স্থাপনে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বেইজিং। চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনকে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশি রাজনীতিক, কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠক করতে দেখা যাচ্ছে বলে দূতাবাসের ফেসবুক পোস্টে জানানো হয়েছে। এসব আলোচনায় কয়েক বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো প্রকল্পসহ দুই দেশের সহযোগিতার নানা বিষয় উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ শেখ হাসিনার অপরাধের সঙ্গে ভারতকে জড়িত হিসেবে দেখে। কোনো দেশ যদি একজন সন্ত্রাসীকে আশ্রয় দেয় এবং আমাদের দেশকে অস্থিতিশীল করতে দেয়, তাহলে সেই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়া বা ব্যবসা করা মানুষ মেনে নেবে না।’
তবে তারেক রহমান নিজে তুলনামূলক সংযত ভাষায় কথা বলেছেন। গত সপ্তাহে রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘আমরা সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে চেষ্টা করব, তবে অবশ্যই আমার জনগণ ও দেশের স্বার্থ রক্ষা করে।’
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের আরও অবনতি হয়েছে। বিশেষ করে ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে সম্পর্কের অবনতি হয়। এই খেলাটি দুই দেশেই আবেগের সঙ্গে অনুসরণ করা হয়। বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনার পর হিন্দু গোষ্ঠীর চাপের মুখে একজন খ্যাতনামা বাংলাদেশি বোলারকে আইপিএলের একটি দল থেকে বাদ দেওয়া হয়।
এর জবাবে মার্চ-মে মাসে অনুষ্ঠেয় আইপিএলের সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে ঢাকা। পাশাপাশি ফেব্রুয়ারি-মার্চে পুরুষদের ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় সরানোর অনুরোধ জানায়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত টুর্নামেন্ট থেকেই বাদ পড়ে।
দুই দেশই একে অপরের নাগরিকদের জন্য ভিসা সীমিত করেছে। হাসিনার পতনের পর থেকে ভারত ও বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের প্রকাশ্য বৈঠকও খুব কম দেখা গেছে। তবে গত ডিসেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকায় এসে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় ভারতের পক্ষ থেকে সমবেদনা জানান।
নির্বাচনের আগে বিএনপি ও তাদের ঘনিষ্ঠ প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামপন্থি জামায়াতে ইসলামী একে অপরের বিরুদ্ধে বিদেশি স্বার্থের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ তুলেছে। জামায়াতের দাবি, বিএনপি ভারতের খুব কাছাকাছি চলে গেছে। আর বিএনপি জামায়াতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরেছে।
সম্প্রতি এক সমাবেশে বিএনপি নেতা তারেক রহমান বলেন, ‘না দিল্লি, না পিন্ডি, বাংলাদেশ সবার আগে।’
এখানে তিনি নয়াদিল্লি এবং পাকিস্তানের সামরিক সদর দপ্তর রাওয়ালপিন্ডির কথা উল্লেখ করেন।
ভারতীয় কর্মকর্তারা বেসরকারিভাবে স্বীকার করেছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে থাকায় দিল্লিকে এখন যে দলই সরকার গঠন করুক, তাদের সঙ্গেই কাজ করতে হবে। তবে এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
চীন গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্য প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি, যার মধ্যে চীনা পণ্যের আমদানি মোট আমদানির প্রায় ৯৫ শতাংশ।
হাসিনা ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকে চীনা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে শত শত মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। হাসিনার আমলে আদানি গ্রুপসহ ভারতীয় বড় বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বাংলাদেশে কার্যক্রম বাড়িয়েছিল। তবে এরপর থেকে নতুন কোনো চুক্তি হয়নি।
নয়াদিল্লির থিঙ্ক ট্যাংক সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক প্রগ্রেসের সিনিয়র ফেলো কনস্টানটিনো জাভিয়ের বলেন, ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সংকটকে কাজে লাগিয়ে চীন প্রকাশ্য ও আড়াল, দুইভাবেই ধীরে ধীরে তার প্রভাব বাড়াচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা কমে যাওয়া এবং ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধের সুযোগও চীন কাজে লাগাতে পেরেছে। ফলে তারা আরও বিশ্বাসযোগ্য ও পূর্বানুমেয় অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে নিজেদের তুলে ধরছে।’
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের থমাস কিয়ান বলেন, ‘ঢাকা ও দিল্লি যদি সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে পরবর্তী বাংলাদেশ সরকার বেইজিংয়ের দিকে পুরোপুরি ঝুঁকে পড়ার প্রণোদনা আরও বাড়বে।’
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হওয়া মানেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লায়লুফার ইয়াসমিন বলেন, ‘চীন ও ভারত দুটোকেই বাংলাদেশের দরকার, বিষয়টি বাস্তবভাবে দেখতে হবে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত হলেও কোনো দলই ক্ষমতায় এসে ভারতকে উপেক্ষা করার মতো অবিবেচক হবে না।’
বাংলাদেশ তিন দিক থেকে ভারত দ্বারা বেষ্টিত এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। বাণিজ্য, ট্রানজিট ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে দেশটি ভারতের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে দীর্ঘ স্থলসীমান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য দিল্লিরও ঢাকার সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক প্রয়োজন। হাসিনা ভারতের বিরুদ্ধে সক্রিয় বিদ্রোহীদের দমনেও সহায়তা করেছিলেন।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com