প্রজন্ম ডেস্ক:
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে প্রভাবশালী দেশগুলো বাংলাদেশের কাছে জাহাজ, ভারী সরঞ্জাম ও নানা পণ্য বিক্রির চুক্তি করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), চীন, জাপান, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশে তাদের পণ্য বিক্রির জন্য অনেক সময় চাপও দিয়েছে। প্রভাবশালী এসব দেশের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে অনেক ক্ষেত্রে তাদের জাহাজ, ভারী সরঞ্জাম ও পণ্য কিনতে চুক্তিতে সই করতে বাধ্য হয়েছে সরকার। অথচ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর রুটিন কাজের বাইরে এসব বৈদেশিক কেনাকাটার চুক্তি সরকারের করার কথা নয় বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরকারের শেষবেলায় একের পর এক বড় অঙ্কের চুক্তি ও ব্যয়বহুল প্রকল্প অনুমোদনের হিড়িক দেখে দেশজুড়ে চলছে সমালোচনা ও বিতর্কের ঝড়। এসব চুক্তি রাজনৈতিক সরকারের করার কথা থাকলেও সেগুলো তড়িঘড়ি করে অন্তর্বর্তী সরকারই সম্পন্ন করে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকার কেন বাধ্য হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দেশের বিশেষজ্ঞরা। আর প্রভাবশালী দেশেগুলো কেনইবা এ সময়ে তাদের সরঞ্জাম ও পণ্য বিক্রির জন্য বাংলাদেশকে বড় বাজারে পরিণত করছে, তার জবাব মিলছে না। তবে সরকারের ভাষ্য, পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য যেন কাজ করা সহজ হয়, সে লক্ষ্যেই প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে চুক্তিতে রাজি হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। সরকারের এই যুক্তি আবার মানতে রাজি নয় দেশের অর্থনীতিবিদরা। তাদের দাবি, পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের হাত-পা আগাম বেঁধে চুক্তির শর্তগুলো চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাতে পরবর্তী সরকার ঠিকমতো কাজ করতে না পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকার গত আগস্টে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে ১৫ থেকে বাড়িয়ে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। এরপর ওয়াশিংটন এই উচ্চ শুল্ক কমানোর প্রস্তাব দিয়ে বেশ কিছু কঠিন শর্ত আরোপ করে বাণিজ্য চুক্তিতে বাধ্য করে ঢাকাকে। শর্তে বাধ্য হয়ে অন্তর্বর্তী সরকার সে দেশ থেকে ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দেয়। এর মধ্যে ৩৭ হাজার কোটি টাকায় ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয়সহ নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্টের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, তেল, সুতা, জ্বালানিসহ অন্য পণ্য আমদানিতে বাধ্য হয় বাংলাদেশ, যা চলমান রয়েছে।
এদিকে ট্রাম্প সরকার ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনতে বাংলাদেশকে বাধ্য করার পর নাখোশ হয়েছে ইউরোপীয় উড়োজাহাজ কোম্পানি ‘এয়ারবাস’। ঢাকায় নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূতরাও এখন বাংলাদেশকে ‘এয়ারবাস’ কিনতে চাপ দিচ্ছেন। সম্প্রতি জার্মান রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লোটজ জানিয়ে দেন, কোনো কারণে এই এয়ারবাস কেনা না হলে তা বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবে।
এ ক্ষেত্রে চীনও পিছিয়ে নেই। সম্প্রতি চীন থেকে ২৪ কোটি ১৯ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার দিয়ে চারটি নতুন জাহাজ কিনতে ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া ৬০৮ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশে ড্রোন কারখানা স্থাপনে চীন চুক্তি করেছে।
যুক্তরাজ্যের সঙ্গেও একই দিনে নৌ-সদর দপ্তরে জিটুজি ভিত্তিতে একটি ‘অফ দ্য শেলফ’ হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভে ভেসেল কেনার চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। এ ছাড়া মেয়াদের শেষ সময়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনাকাটার আলোচনা এবং কিছু ক্ষেত্রে চুক্তি করছে অন্তর্বর্তী সরকার।
জাপান সরকার প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রি ও প্রযুক্তি হস্তান্তর-সম্পর্কিত একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশের সঙ্গে। এই চুক্তি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়াকে আরও বেগবান করবে বলে আশা করা হয়। চুক্তিতে বলা হয়েছে, এতে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ও জাপানের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও গভীর হবে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি স্বাক্ষরের ফলে দুই দেশের মধ্যে সামরিক বিশেষজ্ঞ বিনিময় বাড়বে, যা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে উভয় দেশের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক ও সামরিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে বলে ধারণা করা হয়।
চট্টগ্রামের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল ৩০ বছরের জন্য ডেনমার্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালসকে এবং পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল ২২ বছরের জন্য সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মেডলগকে ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে দেওয়ার চুক্তি করেও সমালোচনার মুখে পড়ে অন্তর্বর্তী সরকার।
পাকিস্তানও তাদের জেএফ-১৭ থান্ডার নামের বহুমুখী যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়ে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা করেছে। এটি যৌথভাবে চীন ও পাকিস্তানের তৈরি। ২০১৯ ও ২০২৫ সালে ভারতের সঙ্গে সংঘাতের সময় এই বিমান ব্যবহার করে পাকিস্তান।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, শেষ সময়ে যে চুক্তিগুলো জরুরি নয়, সেগুলো সরকার না করলেও পারত। সরকারের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি। সরকার আলোচনা করে যেসব সংস্কার করেছে, কোনো কারণে নির্বাচিত সরকারের সেখান থেকে ফেরার সুযোগ থাকলেও দুই রাষ্ট্রের মধ্যে যেসব চুক্তিগুলো হচ্ছে, সেখান থেকে ফেরার পথ নেই। কারণ চুক্তিগুলো দুই রাষ্ট্রের মধ্যে হচ্ছে, ব্যক্তির মধ্যে নয়। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই কাজগুলো সম্পন্ন করতে পারত।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ জানান, তফসিল ঘোষণার পর এই সরকারের বিভিন্ন ইস্যুতে বৈদেশিক চুক্তি করা ঠিক না। তারা এই সময়ে দৈনন্দিন কাজগুলো করবে, এটাই রীতি। সেই রীতি এখানে পালন করা হয়নি।
এসব সমালোচনার জবাবে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বিষয়টিকে চলমান প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন দাবি করেন, আগামী দিনে যারা ক্ষমতায় আসবে, সেই নির্বাচিত সরকারকে বাড়তি চাপমুক্ত রাখতেই অন্তর্বর্তী সরকার এই চুক্তি সম্পন্ন করে যাচ্ছে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com