প্রজন্ম ডেস্ক:
আর মাত্র দুই দিনের মধ্যেই সরকার গঠন করবে বিএনপি। একই সঙ্গে নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটি জটিল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জে পড়তে যাচ্ছে। দেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের সমন্বয় করে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক পথে এগিয়ে যেতে হবে বিএনপিকে। নির্ধারিত সময়ে এলডিসি থেকে উত্তরণে সঠিক পথের নিশানাও জাতিকে জানাতে হবে। এলডিসি উত্তরণের পর ব্যবসায়ীরা যেন কোনো চ্যালেঞ্জে না পড়েন, সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। প্রায় আট বছর ধরে ঝুলে থাকা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে বৃহৎ শক্তিদের আস্থায় নিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। বড় শক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, ভারত, রাশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্ব।
এদিকে এ বছরই শেষ হচ্ছে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ। ১৯৯৬ সালে চুক্তিটি স্বাক্ষরের সময় বিএনপি বেশ উচ্চকণ্ঠে এর বিরোধিতা করেছিল। অন্যদিকে এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির চাপে রয়েছে বাংলাদেশ, যা নতুন বিএনপি সরকারকেই মোকাবিলা করতে হবে।
আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষায় সব শক্তিধর দেশ অর্থাৎ ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমান বন্ধুত্ব বজায় রেখে পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করতে হবে বিএনপিকে। দলটিকে পুরোনো সম্পর্কের জায়গা থেকে ভারতের সঙ্গে আস্থা ও অবিশ্বাসের একটি নতুন সমীকরণ তৈরি করতে হবে, যেখানে ভারসাম্য বজায় রাখাই থাকবে মূল লক্ষ্য। অতীতের দিকে তাকালে দেখা যাবে, অতীতে ভারতের সঙ্গে বিএনপি সরকারের সম্পর্ক মসৃণ ছিল না। ভারতের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্ক এখনো সমঝোতাপূর্ণ নয়। তবে নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও বিএনপি ইস্যুতে ভারতের অবস্থান বেশ কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে। ভারত চাইছে অতীতের বিরোধ এবং শেখ হাসিনা ইস্যুটি পাশ কাটিয়ে আগামীর সম্পর্ক তৈরি হোক। এ জন্য ত্রয়োদশ নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হওয়ায় দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টেলিফোন করে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ও অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছেন। খালেদা জিয়ার জানাজায় দেশটির পক্ষ থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফর ছিল সেই সম্পর্কোন্নয়নেরই গ্রিন সিগনাল।
এদিকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বিএনপির ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। তবে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণ নিয়ে ভারতসহ আঞ্চলিক দেশগুলোর অবস্থান যথেষ্ট উদ্বেগহীন নয়। এ পরিস্থিতিতে বিএনপি ও দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে কূটনৈতিক সমীকরণে অবশ্যই বড় পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি অনেকাংশে নির্ভর করে গণতন্ত্রের চর্চা ও মানবাধিকার ইস্যুতে।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের বিষয়টি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে। তাই বিএনপিকে পররাষ্ট্রনীতিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সুকৌশলী অবস্থান নিতে হবে, যা দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সহায়ক হয়।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, নতুন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিজয়ী বিএনপিকে বাংলাদেশি কূটনৈতিক সমীকরণে অবশ্যই বড় পরিবর্তন আনতে হবে। তিনি বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে আমাদের অনেক ইস্যু আছে। গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির নবায়নসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, পুশইনসহ নানা বিষয়ে বিএনপিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে বোঝাপড়া করতে হবে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত নতুন বাণিজ্যচুক্তি বাস্তবায়ন, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক অব্যাহত রাখা এবং এই দুটি দেশের মধ্যে পরস্পরের বিরোধের ফাঁদে না পড়ে নিজ দেশের স্বার্থ রক্ষা করা, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে ভারসাম্য রক্ষা করা, উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে কৌশল নির্ধারণসহ বিএনপির জন্য রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ।’
তিনি বলেন, ভারত-চীন-যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশের স্বার্থ রক্ষা করার জটিল কূটনৈতিক কৌশল প্রণয়ন করতে হবে বিএনপিকে। দলটিকে আগের কূটনৈতিক নীতিতে চললে হবে না, পরিবর্তন আনতে হবে। এ ছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সহমতের চর্চা গড়ে তোলার সক্ষমতা দেখাতে হবে। উন্নয়নের সঙ্গে কূটনীতিতে সমন্বয় করতে হবে এবং নতুন কূটনীতিতে পেশাদারত্ব আনতে হবে। কারও বিশেষ পছন্দের ভিত্তিতে কূটনীতি পরিচালিত হলে চলবে না।
দিল্লির মনোহর পারিকর ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিসের রিসার্চ ফেলো শ্রুতি পাট্টানায়েক জানান, বাংলাদেশে নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়া বিএনপির জন্য ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কোন্নয়ন একটি কঠিন কাজ হবে। কারণ জামায়াত ও বিএনপি এই সম্পর্কের পক্ষে থাকলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন দল এনসিপি সব সময় এর বিরোধিতা করবে এবং ভারতবিদ্বেষী অবস্থান নেবে। তবে প্রথম ধাক্কায় বিএনপিকে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির নবায়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ চুক্তির মেয়াদ এ বছরই শেষ হবে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার যখন এই চুক্তি করে, তখন বিএনপি অসম চুক্তি বলে এর বিরোধিতা করেছিল এবং বলেছিল তারা ক্ষমতায় গেলে চুক্তি বাতিল করবে। এখন বিএনপি চুক্তির নবায়ন করবে নাকি পরিবর্তন করে নতুন চুক্তি করবে, সেটি এখনই বলা যাচ্ছে না। আবার গঙ্গা চুক্তির হুবহু নবায়ন করতেই ভারতের আপত্তি রয়েছে। কেননা ভারত জানিয়েছে, এই চুক্তি আগে নবায়ন হবে না। কিছু পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে নবায়ন হবে। গত ১৬ মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভারত বাদে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তানসহ অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটি ম্যানেজ করেই দ্বিপক্ষীয় ইস্যুগুলোতে ভারত আলোচনা চালিয়ে যাবে বিএনপির সঙ্গে।
তবে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তানসহ অন্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভারতের নিরাপত্তায় যেন প্রভাব না পড়ে, সেটি নিশ্চিত হতে চাইবে ভারত সরকার। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর নিরাপত্তার ব্যাপারে ভারত কোনো সমঝোতা করবে না। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বিএনপিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com