প্রজন্ম ডেস্ক:
‘আমি আর আইতাম না, আমারে মাইরা লাইবো। আমার দম যায়গা, খারাই থাকতে পারি না।’ জোরে নিশ্বাস নিতে নিতে এমনভাবেই আকুতির স্বরে কথাগুলো বলছিলেন ৭০ বছরের হোসনেয়ারা বেগম। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে টিসিবির পণ্য নিতে নাখালপাড়া থেকে ছুটে আসেন এই বৃদ্ধা। লাইনে দাঁড়িয়েও ধাক্কাধাক্কির কারণে ছিটকে যান। অবশেষে পণ্য নিতে না পেরে নিরুপায় হয়ে রাস্তার ধারে বসে পড়েন। পরে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির দৃষ্টিতে পড়লে তাকে একাধিক পণ্যের একটি ব্যাগ এনে দেওয়া হয়।
শুধু হোসনেয়ারা বেগমই নন, এমন কঠিন পরিস্থিতির শিকার হন পণ্য নিতে আসা প্রায় সবাই। বিশেষ করে বয়স্ক ও মহিলাদের যেন শেষ নেই ভোগান্তির। মাত্র ১৫০-২০০ টাকা কমে পাওয়া জিনিসপত্র নিতে যেন তাদের মাথার ঘাম গড়িয়ে পড়ে পা পর্যন্ত। এ ছাড়া সকালে এসে দুপুর পর্যন্তও দাঁড়িয়ে থাকতে হয় তাদের। টিসিবির এই পণ্যবাহী ট্রাক যেন এক যুদ্ধক্ষেত্র। তবুও জীবনের তাগিদে দীর্ঘ থাকে ওই ট্রাক সেলের লাইন। করুণ দৃষ্টি পড়ে থাকে সামনে থাকা ব্যাগের মধ্যে।
সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য ভর্তুকি মূল্যে গুটিকয়েক আইটেম পণ্য সারা দেশে ট্রাকের মাধ্যমে বিক্রি করে থাকে সরকার। দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতির বাজারে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) এই ভর্তুকি মূল্যের পণ্যগুলো দেশের প্রায় ১ কোটি নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য বড় একটি স্বস্তির জায়গা। বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসকে সামনে রেখে সারা দেশে সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করেছে।
এবার ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১২ মার্চ পর্যন্ত ২০ দিন (শুক্রবার ও ছুটির দিন ছাড়া) রোজার এ বিক্রয় কার্যক্রম চালু থাকবে। টিসিবি জানিয়েছে, দৈনিক ট্রাকপ্রতি ৪০০ জন নিম্নআয়ের মানুষের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে টিসিবির পণ্য বিক্রির কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। ট্রাকসেলের মাধ্যমে প্রায় ৩৫ লাখ উপকারভোগীর কাছে প্রায় ২৩ হাজার টন পণ্য বিক্রি করা হবে। এ কার্যক্রমের আওতায় সারা দেশে বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে ভোজ্য তেল, চিনি, ছোলা, ডাল ও খেজুর পাওয়া যাবে। রোজার দুটি বাড়তি পণ্য ছোলা প্রতি কেজি ৬০ টাকা ও খেজুর ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হবে। এ ছাড়া ভোজ্য তেল প্রতি লিটার ১১৫ টাকা, চিনি ৮০ টাকা ও মসুর ডাল ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হবে।
অন্যদিকে ভ্রাম্যমাণ ট্রাক থেকে একজন ভোক্তা সর্বোচ্চ দুই লিটার তেল, এক কেজি চিনি, দুই কেজি ডাল, এক কেজি ছোলা ও বরাদ্দ সাপেক্ষে এক-দুই কেজি খেজুর কিনতে পারবেন। ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের এসব পণ্য যে কেউ কিনতে পারবেন। এর পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ডধারীদের জন্য নিয়মিত বিক্রি কার্যক্রম যথারীতি চলবে। কার্ডধারী পরিবারের কাছে প্রতি মাসে ভর্তুকি মূল্যে বিক্রি করা ভোজ্য তেল, চিনি ও মসুর ডালের পরিমাণ ও মূল্য অপরিবর্তিত থাকবে।
প্রতিদিন ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় ৫০টি, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় ২০টি ও ৭টি মেট্রোপলিটন এলাকায় ১৫টি করে ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে এসব পণ্য বিক্রি করা হবে। অবশিষ্ট ৫৫ জেলায় ৫টি করে সর্বমোট ৪৫০টি ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের মাধ্যমে এসব পণ্য বিক্রি করবে টিসিবি।
রমজান উপলক্ষে মঙ্গলবার সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় কারওয়ান বাজারে এই পণ্য বিক্রির কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। শুরুর দিনই পণ্য বিতরণের সময় অনেক বেশি ভিড় দেখা গেছে। সকাল ৯টা থেকেই পণ্যের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় সাধারণ মানুষজনকে। তবে বিক্রি শুরু হয় প্রায় দুপুরের দিকে। মগবাজার থেকে আসা আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘সকাল ৯টায় এসে দাঁড়িয়েছি। আর সাড়ে ১২টায় মাল হাতে পেয়েছি। সরকারি জিনিস টাকা দিয়ে নিচ্ছি, তারপরে এমন ভোগান্তির যেন কোনো জবাব নেই।’
কাজিপাড়ার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পণ্যগুলো বাজারের মতোই মান ভালো। এখান থেকে নেওয়ায় প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কমে পেয়েছি। তবে লাইনে দাঁড়িয়ে এই পণ্য নিতে অনেক কষ্ট হয়, আর আসব না।’
দুই সন্তান নিয়ে পণ্য নিতে আসা নাজমা জানান, ‘সবই ঠিক আছে। কিন্তু সিরিয়াল অনুযায়ী দিলে স্বস্তি পেতাম। এমনভাবে যুদ্ধ করে নেওয়া যায় না, সুস্থভাবে দেওয়া দরকার। তা ছাড়া টোকেন সিস্টেম করে দিলে ভোগান্তিটা কম হতো।’
পণ্য বিক্রিকালে একই চিত্র দেখা গেছে ফকিরাপুল ও সচিবালয়সহ রাজধানীর অন্যান্য ট্রাকসেল কেন্দ্রেও।তবে পণ্য বিক্রেতারা বলছেন ভিন্ন কথা। তারা বলছেন, মানুষজনকে কোনোভাবেই লাইন মেইনটেইন করানো যায় না। কেউই নিয়ম মানতে চান না। তাই একটু বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।
টিসিবির কর্মচারী আক্তার হোসেন বলেন, টোকেন দিয়েই তাদের মেইনটেইন করতে পারি না। তারপরেও সুষ্ঠুভাবে কীভাবে দেওয়া যায় সেই চেষ্টা করে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।’
বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে টিসিবির মুখপাত্র শাহাদত হোসেন বলেন, আসলে এমন পরিস্থিতি মেইনটেইন করতে প্রথমত টোকেন সিস্টেম করা হয় যেন রিপিট কাস্টমার না আসে এবং তারা টোকেন পেয়ে যেন স্বস্তিতে থাকেন। এ ছাড়া এই কার্যক্রমটা মনিটরিং করতে টিসিবিসহ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন ও সিটি করপোরেশন থেকেও তদারকি টিম বের করা হবে।
অন্যদিকে বিক্রি কার্যক্রমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পুলিশ সদস্যদেরও থাকার কথা জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা। তবে বাস্তবিক অর্থে তদারকির এমন চিত্র কোথাও দেখা যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে। যা সর্বদা ভোগান্তিতে ঠেলে দেয় খেটে খাওয়া মানুষদের।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com