প্রজন্ম ডেস্ক:
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতিতে। বিশেষভাবে শিল্প খাতে ধস নামবে। উৎপাদন খরচ বাড়বে, কাঁচামালের সংকট দেখা দেবে, সময়মতো পণ্য রপ্তানি করা সম্ভব হবে না। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব জ্বালানি তেলের বড় উৎস। যুদ্ধ শুরু হওয়ায় আমাদের দেশের বাজারেও তেলের সরবরাহ ব্যাহত হবে। অনেক ধরনের জিনিসপত্রের দাম বাড়বে। এক কথায় মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে। রেমিট্যান্স প্রবাহেও অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে।
অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, এমনিতেই দেশের অর্থনীতি বেহাল। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ ধাক্কা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে। দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতি বিভিন্ন ধরনের সংকট মোকাবিলা করছে। বিশেষভাবে বিনিয়োগে খরা চলছে। শিল্প খাতও ভালো নেই। উৎপাদন খরচ আগের চেয়ে বেড়েছে। এতে শিল্প উদ্যোক্তারা বিপাকে আছেন। জ্বালানি খরচ অনেক বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় আমাদের দেশের অর্থনীতি বেশ চাপে পড়বে। জ্বালানিসংকটে দাম বাড়বে। স্বাভাবিক আমদানি-রপ্তানি হবে না। বাজারে পণ্য সরবরাহ কমবে। ফলে জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়বে। নতুন সরকারের জন্যও এ যুদ্ধ বড় ধরনের চাপ।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, আমদানিনির্ভর ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়বে, রিজার্ভ আগের মতো আসবে না, মূল্যস্ফীতি বাড়বে ও শিল্প উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটবে। বহুমুখী চাপে পড়তে পারে বাংলাদেশ।
ব্যবসায়ীদের মতে, সময়োচিত কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রস্তুতিই হতে পারে এই সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার প্রধান হাতিয়ার। বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি তেলের বাজার আন্তনির্ভরশীলতার কারণে বেশ কিছু নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, এলপিজি ও এলএনজির সরবরাহ হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। যুদ্ধের কারণে সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হতে পারে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি বাড়বে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে। তেলের দামে অস্বাভাবিক ঊল্লম্ফন হলে সরকারকে ভর্তুকি বাড়াতে হবে। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্য, ভোজ্যতেল, সার ও অন্যান্য আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বাড়বে। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং সামাজিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
নীট পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, তৈরি পেশাক খাতের বেশির ভাগ কাঁচামাল মধ্যপ্রাচ্য হয়ে আমদানি হয়। আবার রপ্তানি করা পণ্যেরও যাতায়াত এই পথে। যুদ্ধের ফলে আমদানি-রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আমাদের শিল্প খাতে বিপর্যয় নেমে আসবে।
যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়বে। বাংলাদেশে পেট্রল, ডিজেল, অকটেন ও এলপিজির দাম বাড়তে পারে। পরিবহন খরচ বাড়লে সব পণ্যের দাম বাড়বে। এ ছাড়াও লক্ষাধিক বাংলাদেশি কর্মী মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কাজ করেন। তাদের কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হতে পারে। নতুন ভিসা ও কর্মক্ষেত্র সংকট সৃষ্টির শঙ্কা রয়েছে। দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যেতে পারে। এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করবে।
এদিকে আন্তর্জাতিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে দেশে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় শিপিং খরচ ও বিমা প্রিমিয়াম বাড়বে। কাঁচামাল আমদানিতে দেরি হলে শিল্প উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। চাল, গম, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সালাউদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সব ব্যবসা বাণিজ্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে হয়ে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার অর্থ হলো বাংলাদেশের নতুন একটি সংকটে পড়া। এতে দেশের জ্বালানি তেলে সংকট তৈরি হবে। ফলে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন্স) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘ইতিহাস থেকে আমরা এটাই জানতে পারি যে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে আমাদের তেলের সাপ্লাই চেইনে প্রভাব পড়ে। মধ্যপ্রাচ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক নৌ বাণিজ্য হওয়ার ফলে আমাদের তেল আসা বন্ধ হয়ে যাবে। কোনো জাহাজ ওই রুটে চলাচল করবে না। তবে আমাদের দেশে ৪০ দিনের তেলের মজুত রয়েছে। এর মধ্যে যদি যুদ্ধ শেষ হয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যায় তাহলে আমাদের তেমন সংকট হবে না। যদি যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হয় তবে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হবে।’
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে বড় যুদ্ধ হলে বাংলাদেশে প্রভাব পড়বে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি, রেমিট্যান্স ঝুঁকি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হবে। দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে। দেশে অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হবে। বাজারে সব কিছুর দাম বেড়ে যাবে। মধ্যপ্রাচ্য আমাদের থেকে অনেক দূরে হলেও আমাদের দেশ মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নানাভাবে নির্ভরশীল। আমাদের দেশের ঘরে ঘরে প্রবাসী। তাদের পরিবারে সংকট সৃষ্টি হবে। সব মিলিয়ে আমরা একটি বড় চাপে পড়তে যাচ্ছি।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, কয়েক মাস ধরে পরিচকল্পনা করার পর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়েছে। পাল্টা জবাবে ইসরায়েলি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ইরানও আবার নতুন দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করেছে। এছাড়া তাদের শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা ইসরায়েলি ও মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় তেল ও বাণিজ্যিক কোম্পানি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। এভাবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশ জ্বালানি তেলের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে দেশে আমদানি ব্যয় ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাবে, যা সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়াবে। এ ছাড়া সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়লে রেমিট্যান্স কমে যেতে পারে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ ব্যাহত হলে রপ্তানি ও আমদানি কার্যক্রমেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com