প্রজন্ম ডেস্ক:
মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে চলমান যুদ্ধ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের ১৫টি দেশে এর আঁচ লেগেছে। এতে ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কাও ক্রমেই বাড়ছে। আজ বুধবার এই যুদ্ধ পঞ্চম দিনে গড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে গত শনিবার ইরানে হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার পর থেকেই পাল্টাপাল্টি আক্রমণ অব্যাহত আছে। উপসাগরীয় দেশগুলোয় থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও ইসরায়েলে টানা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে চলেছে ইরান। অন্তত ১৭টি মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনায় হামলা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসে ড্রোন হামলা হয়েছে। এরপরই সৌদিতে যুক্তরাষ্ট্রের মিশনগুলোতে সব কনস্যুলার সেবা বাতিল করা হয়েছে।
ইসরায়েলের চ্যানেল-১২-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের একাংশ ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলীয় শহর পেতাহ তিকভায় আঘাত হেনেছে। ওমানের সালালাহ বন্দর লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে জর্ডান এবং অধিকৃত পশ্চিমতীরের জেরুজালেম-সংলগ্ন এলাকায় ইরানের চারটি ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে জর্ডান।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানায়, ইরানে হামলার জবাবে তারা ১৫টি দেশের ভূখণ্ড অথবা স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। বাহরাইনের শেখ ইসা এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। তারা ওই বিমানঘাঁটিটিতে বড় আকারে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে বিমানঘাঁটির প্রধান নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র ও সদর দপ্তর ভবন ধ্বংস হয়েছে। হামলার সময় জ্বালানি ট্যাংকগুলোয় আগুন ধরে যায় বলেও উল্লেখ করেছে তারা। এ বিষয়ে বাহরাইনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
চলমান সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যের ১৪টি দেশ থেকে নিজ নাগরিকদের সরে যেতে বলেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর।
অন্যদিকে, তেহরানে ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল ভবনে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ হতে কিছুটা সময় লাগলেও তা বছরের পর বছর চলবে না। ফক্স নিউজের ‘হ্যানিটি’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আমি বলেছিলাম এটি দ্রুত ও চূড়ান্ত হতে পারে। এতে কিছুটা সময় লাগতে পারে; কিন্তু এটি কোনো অন্তহীন যুদ্ধ নয়।
নেতানিয়াহু এই যুদ্ধকে মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে ইসরায়েল ও সৌদি আরবের মধ্যে, দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি মোক্ষম সুযোগ হিসেবে দেখছেন। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির স্থায়ী পথ তৈরি হচ্ছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি তাই মনে করি।’
তবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। আইআরজিসি বলেছে, ওই দুই দেশের জন্য আরও অধিক জাহান্নামের দরজা উন্মুক্ত হবে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে আইআরজিসির মুখপাত্র আলি মোহাম্মদ নাইনি বলেছেন, শত্রুদের জন্য সামনে আরও ভয়াবহ এবং ক্রমাগত শাস্তিমূলক হামলা অপেক্ষা করছে।
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ইরানে হামলায় ক্ষয়ক্ষতির একটি তালিকা দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ইরানের অন্তত ১৫৩টি শহরে হামলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল আঘাত এনেছে ৫০৪ স্থানে। হামলার সংখ্যা ১ হাজার ৩০৯টি। হামলায় ইরানে নিহত হয়েছে ৭৮৭ জন। এর মধ্যে ইরানের কেরমান প্রদেশের একটি সামরিক ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ১৩ জন ইরানি সেনা নিহত হয়েছেন।
যুদ্ধ তীব্র হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের ১৪টি দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিলম্বে সরে যেতে বলেছে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর। গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এই নির্দেশনা দেয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা-সংক্রান্ত হালনাগাদ নির্দেশনায় পররাষ্ট্র দপ্তর বিভিন্ন দেশ ও এলাকার তালিকা দিয়ে বলেছে, এসব জায়গায় গুরুতর নিরাপত্তাঝুঁকি আছে। তালিকায় উল্লিখিত দেশ ও এলাকাগুলো হলো বাহরাইন, মিসর, ইরান, ইরাক, ইসরায়েল, পশ্চিম তীর ও গাজা (ফিলিস্তিন), জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, ওমান, কাতার, সৌদি আরব, সিরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইয়েমেন। গুরুতর নিরাপত্তাঝুঁকি থাকায় সহজে পাওয়া যায় এমন বাণিজ্যিক পরিবহন ব্যবহার করে মার্কিন নাগরিকদের এখনই এসব দেশ ত্যাগ করার জন্য বলা হচ্ছে। ইসরায়েল থেকে বের হতে মিসরের সিনাই উপদ্বীপের পথ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন দেশটিতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি।
গতকাল ভোরে রিয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে দুটি ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়, এর ফলে ভবনটিতে সামান্য আগুন ধরে যায় এবং আংশিক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সংঘাতের কারণে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
রিয়াদে দূতাবাসে ড্রোন হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র শিগগিরই বড় ধরনের পাল্টা পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সংবাদমাধ্যম নিউজনেশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘এই হামলার জবাবে ওয়াশিংটন কী করতে যাচ্ছে, ত আপনারা খুব দ্রুতই দেখতে পাবেন।’
ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মাঝারি ও মাঝারির থেকে কিছুটা উন্নত মানের যেসব সামরিক রসদ মজুদ আছে, শুধু তা দিয়েই চিরকাল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আমাদের কাছে এই অস্ত্রের প্রায় অসীম মজুদ আছে। যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্রে সমৃদ্ধ এবং বড় বিজয় নিশ্চিত করতে প্রস্তুত আছে।’
তেহরানে ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল ভবনে বিমান হামলা চালানোর কথা বলেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। গতকাল এক বিবৃতিতে বলা হয়, ইসরায়েলি বিমানবাহিনী তেহরানের কেন্দ্রস্থলে ইরানি সন্ত্রাসী শাসকগোষ্ঠীর নেতাদের কমপাউন্ডের স্থাপনাগুলোয় হামলা চালিয়ে সেগুলো ধ্বংস করেছে। এতে আরও বলা হয়েছে, কমপাউন্ডে হামলার সময় প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের ভবনের ওপর বিপুল গোলাবারুদ ফেলা হয়েছে। সৌদি আরবে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের মিশনগুলোতে সব কনস্যুলার সেবা বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জেদ্দা, রিয়াদ, দাহরামসহ বিভিন্ন মিশনে নিরাপদ অবস্থানে থাকার নির্দেশনা কার্যকর রয়েছে। দূতাবাসে হামলার বিষয়টি উল্লেখ করে বিবৃতিতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দূতাবাস এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সব নাগরিককে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা পরিকল্পনা অনুযায়ী চলার পরামর্শ দিয়েছে দূতাবাস।
ইরানের ওপর এই আক্রমণ ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির এক বড় ধরনের বদলকে নির্দেশ করে। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারের সময় তিনি বিদেশের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে যে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’নীতি ঘোষণা করেছিলেন, এই যুদ্ধ তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ধ্বংস করে দেওয়ার দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড। একই সঙ্গে ইরানের প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করার দাবি করেছে তারা। এক্স পোস্টে সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ধারাবাহিক অভিযানে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং সামরিক বিমানঘাঁটি ধ্বংস হয়েছে।
ইরানে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া চলছে : নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের এ প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হবে না বলে জানিয়েছেন দেশটির বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্য আলি মোয়ালেমি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরানের এই বিশেষজ্ঞ পরিষদই নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবে। আলি মোয়ালেমি বলেন, বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্যরা শপথ নিয়েছেন যে, নতুন নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক ও দলীয় গোষ্ঠীর প্রতি ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়টি প্রভাব ফেলবে না।
তিনি আরও বলেন, বিশেষজ্ঞ পরিষদ অতীতের মতো করেই শহীদ বিপ্লবী নেতার (আয়াতুল্লাহ খামেনি) মতো একজন ব্যক্তিত্বকে নির্বাচন করবে। গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। তার উত্তরসূরি বেছে নেওয়ার কাজটি করবে বিশেষজ্ঞ পরিষদ।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com