প্রজন্ম ডেস্ক:
এ এক নতুন বাংলাদেশের সূচনা। জনগণ দেখছে নতুন এক বাংলাদেশকে। এ যেন নতুন সরকারের নতুন দিগন্তের শুরু। জনগণের স্বপ্ন পূরণ যাত্রা বিএনপির হাত ধরেই শুরু হচ্ছে। দেশের মাটিতে পা রেখেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’। সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর তার প্ল্যান বাস্তবায়নে প্রতিনিয়তই নিচ্ছেন যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এত সাহসী পদক্ষেপ এর আগে বাংলাদেশে কোনো সরকারপ্রধান নিতে পারেননি। শুধু তা-ই নয়; বিশ্বেও তার কিছু পদক্ষেপ নজিরবিহীন। শপথ গ্রহণের প্রথম দিনই তিনি বিএনপির কোনো সংসদ সদস্য শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট নেবেন না–এমন ঘোষণা দিয়ে তাক লাগিয়ে দেন। এরপর জাতি দেখছে একের পর এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ।
প্রায় দুই দশক আগে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা ছেড়েছিল বিএনপি। সেই সময়ে ওয়ান-ইলেভেন সরকার একদিন বিনা ওয়ারেন্টে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় তারেক রহমানকে। কারাগারে নির্যাতনের পর এক প্রকার পঙ্গু অবস্থায় দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর চিকিৎসার জন্য সপরিবারে লন্ডনে চলে যান তিনি। সেখানে ১৭ বছর ৩ মাস বসবাস করেছেন। যাকে পঙ্গু করার চেষ্টা করা হয়েছিল, সেই তারেক রহমানের কাঁধেই আজ বাংলাদেশ। তার হাতেই রচিত হচ্ছে বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রার নতুন অধ্যায়।
আগে প্রধানমন্ত্রীর মুভমেন্ট মানেই ছিল জনগণের সীমাহীন দুর্ভোগ। সবাইকে যানজটে বসে থাকতে হতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সামনে-পেছনে থাকত বিশাল প্রটোকল বাহিনী। পথে পথে বিশেষ নিরাপত্তা। সড়কের দুই পাশে অবস্থান নিতেন পুলিশের সদস্যরা। তাদের মুহুর্মুহু নির্দেশনা দিতেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। বিরামহীন বাঁশির ফুঁর শব্দে আতঙ্কিত হয়ে পড়তেন পথচারীরা। এমনকি প্রধানমন্ত্রী যাওয়ার ১৫ মিনিট আগে সবকিছু স্থির করে দেওয়া হতো। প্রধানমন্ত্রী না যাওয়া পর্যন্ত কেউ কোনো দিকেই যাতায়াত করতে পারতেন না। কিন্তু এবার ভিন্ন এক চিত্র দেখা যাচ্ছে। সাধারণ মানুষদের দুর্ভোগে যেন পড়তে না হয়, সে জন্য চিরচেনা প্রথা ভেঙেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিনি ভিভিআইপি বা রাজকীয় প্রটোকল পরিহার করেই সাধারণ নাগরিকের মতো অফিস করছেন। মানছেন ট্রাফিক সিগনাল। গাড়িবহরে যানবাহনের সংখ্যা ১৬-১৭টি থেকে কমিয়ে মাত্র চারটি করেছেন। দেশের মানুষের যাতে কষ্ট না হয় সে জন্য প্রতিনিয়তই নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন তিনি।
তারেক রহমান সরকারি গাড়িতে নয়, চলছেন নিজের ‘টয়োটা’ গাড়িতে। দেখা গেছে, অফিসে যাওয়ার পথে ট্রাফিক সিগনালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সেলফি তোলেন অনেকে। এ সময় হাত নাড়িয়ে শুভেচ্ছা জানাতে দেখা যায় তারেক রহমানকে। জনগণ প্রধানমন্ত্রীকে এভাবে দেখে উচ্ছ্বসিত। অথচ আগে কোনো প্রধানমন্ত্রী যাওয়ার সময় তার সঙ্গে সেলফি তোলা তো দূরের কথা, কোন গাড়িতে প্রধানমন্ত্রী থাকতেন তাও আঁচ করা যেত না।
সচিবালয়ে সঠিক সময়ে অফিসে আসছেন প্রধানমন্ত্রী। তার কারণে রাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তারাও যথাসময়ে অফিসে হাজির হচ্ছেন। রমজানে ব্যয়বহুল ইফতার এড়ানো, অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর বাতিল, বিদেশ সফরে যাওয়া-আসার সময় বিমানবন্দরে উপস্থিতি সংখ্যা সীমিত করা, বিলাসবহুল গাড়ি কেনাও বন্ধ করেছেন তারেক রহমান। তাকে দেখে মন্ত্রীরাও প্রটোকল কমিয়ে এনেছেন। বিদ্যুৎ বিলাসিতা পরিহার, পরিবারের সদস্যদের জন্য স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ) পরিহার, ট্রাফিক আইন মেনে রাস্তায় চলাচল করে সবাইকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আহ্বান এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখানো প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। সাদামাটা জীবনযাপনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
এ ছাড়া প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও ব্যয়সংকোচনে বিশেষ জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রশাসনের কাজে গতি আনতে ছুটির দিন শনিবারও অফিস করছেন তিনি। সাধারণত মন্ত্রিসভার বৈঠক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে হয়, সেখানে মন্ত্রিরা যান। কিন্তু চিরচেনা সেই প্রথা ভেঙে এখন থেকে অধিকাংশ মন্ত্রিসভার বৈঠক সচিবালয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারেক রহমান। ভিআইপি মুভমেন্টের কারণে যানজট সৃষ্টি হয়ে জনদুর্ভোগ যাতে না হয়, সে জন্য তিনি এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমাতে একাধিক মন্ত্রণালয় একীভূত করেছেন।
জুলাই সনদের বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এবং গণতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকারের পদ ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তার এই সিদ্ধান্ত দেশের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এ ছাড়া বিজয়ের পর পরই জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম চরমোনাই পীরের বাসায় গিয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে তিনি রাজনৈতিক শিষ্টাচারের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এ রকম ঘটনা আগে কখনো দেখা যায়নি। দেশের রাজনীতির ধারা পরিবর্তনের জন্য এটা ইতিবাচক বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
কেউ কেউ বলছেন, এটি রাজনৈতিক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। বিগত দিনের মতো ধ্বংসের রাজনীতি আগামীতে যাতে না হয়, তারেক রহমান নিজ হাতে তার বীজ বপণ করলেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের ইফতারে অংশ নিয়ে ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন, যা রাজনীতির আকাশে সুবাতাসের বার্তাও।
এদিকে নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার গঠনের অল্পদিনেই আজ ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট প্রকল্পের সূচনা হতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল-জলাশয় পুনর্খনন ও ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের এক মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে, যা শুরু হতে যাচ্ছে ১৬ মার্চ দিনাজপুরের কাহারোল থেকে।
বিএনপির ঐতিহ্য হলো প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্ব সম্পর্ক। এরই অংশ হিসেবে শপথ অনুষ্ঠানে সার্কভুক্ত দেশগুলোর সব রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এমনকি ভারতের পক্ষ থেকে সব অভিমান ও ক্ষোভ ভুলে স্পিকার এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীও অংশ নিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর শপথ অনুষ্ঠান ও ইফতার মাহফিলে সার্কভুক্ত দেশগুলোর প্রতিনিধিদের উপস্থিতি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদারের বার্তাই বহন করে। এ ছাড়া রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের ক্ষেত্রেও মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রশাসনে পদায়নের কথা বলা হচ্ছে। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দায়িত্ব পালন করা যোগ্য কর্মকর্তাদেরও প্রশাসনে রাখা হয়েছে, যা ধারাবাহিকতা ও দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
জাকাতের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান। এ জন্য গতকাল জাকাত বোর্ড পুনর্গঠন করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এক ইফতার অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দরিদ্র পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে প্রতিবছর পর্যায়ক্রমে পাঁচ লাখ পরিবারকে যদি এক লাখ করে টাকা জাকাত দেওয়া হয়, তাহলে আমার বিশ্বাস এসব পরিবারের মধ্যে বেশির ভাগ পরিবারকে পরের বছর আর জাকাত নাও দিতে হতে পারে। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে জাকাত দেওয়া হলে ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে দারিদ্র্য বিমোচনে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব।’
যা বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা
নতুন সরকারের ব্যতিক্রমী এসব পদক্ষেপ নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। তাদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে দেশের রাজনীতি ও প্রশাসনে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উদারতা ও ত্যাগের মনোভাব নিয়ে রাজনীতির ধারা পরিবর্তন করতে চাইছেন। তিনি জনগণের জন্য নতুন রাজনীতির সূচনা করেছেন। বিশ্বে যারা সফল রাষ্ট্রনায়ক হয়েছেন, তারা কখনো নিজের স্বার্থের জন্য রাজনীতি করেননি। ইতিহাসে তারা সফল হয়েছেন। তিনি (প্রধানমন্ত্রী) দেশের মানুষের স্বার্থের জন্য রাজনীতি করছেন। জাতির জন্য ভবিষ্যতে অনন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তার এসব পদক্ষেপের সফলতা কামনা করছি।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘আমাদের দেশে ক্ষমতার দাপটে কেউ কোনো কিছু মানতে চায় না। কিন্তু বিশ্বের সভ্য কোনো দেশে এগুলো নেই। এত প্রটোকল থাকে না। আমাদের দেশের প্রচলিত সেই নিয়ম ভাঙতে চাইছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী। আমি মনে করি, ট্রাফিক আইন মেনে চলা মানেই দেশের আইন মেনে চলা। ক্ষমতার দাপট নয়, ইতিবাচক ধারার রাজনীতি চালু করতে চাইছেন।’
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com