প্রজন্ম ডেস্ক:
উপসাগরে এবার যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের নেপথ্য থেকে আমেরিকার বৈশি^ক দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়া ও চীনের সহায়তা পাচ্ছে ইরান। এ লড়াইয়ে একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ খরচ হচ্ছে; অন্যদিকে এটি একটি নতুন ধরনের ‘যুদ্ধ কাঠামো’ উন্মোচন করেছে যেখানে কোনো সম্মুখ সমরাঙ্গন নেই; যা ট্যাংক বা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে নয়, বরং রাডার বিম, স্যাটেলাইট ফিড এবং এনক্রিপ্ট করা স্থানাঙ্কের মাধ্যমে লড়া হচ্ছে।
এদিকে, ইরানের সামরিক কৌশলের নেপথ্যে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের ‘অদৃশ্য হাত’ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি। উত্তর ইরাকের এরবিলে পশ্চিমা বাহিনীর একটি ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার পর তিনি এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ইরান ও তাদের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর ড্রোনচালকরা ক্রমেই ‘রুশ রণকৌশল’ গ্রহণ করছে।
যুক্তরাজ্যের নর্থউড সামরিক কমান্ড সেন্টার পরিদর্শনকালে যুক্তরাজ্যের চিফ অব জয়েন্ট অপারেশনস লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিক পেরি প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলিকে বলেন, রাশিয়া এখন ইরান ও তাদের অনুগত গোষ্ঠীগুলোকে ড্রোন মোতায়েন ও ব্যবহারের বিষয়ে কৌশলগত পরামর্শ দিচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। পেরি বলেন, ইরানি ড্রোনচালকরা এখন ড্রোনগুলো অনেক নিচু দিয়ে ওড়াচ্ছে, যা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর এবং এগুলো ঠেকানো বেশ ‘কঠিন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জন হিলি সাংবাদিকদের বলেন, পুতিনের অদৃশ্য হাত যে ইরানের কৌশলের পেছনে কাজ করছে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ, বর্তমানে তেলের আকাশচুম্বী দাম থেকে একমাত্র পুতিনই লাভবান হচ্ছেন। এর ফলে ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য তার তহবিলে অর্থের জোগান বাড়ছে।
গত বছর জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে তাদের নিশানায় আঘাতের সক্ষমতা অনেক বেশি নিখুঁত হয়ে উঠেছে। আর পেছনে মুখ্য ভূমিকা ইরানের দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র রাশিয়া ও চীনের।
রাশিয়া ইরানকে অত্যন্ত সংবেদনশীল গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্টে’র কাছে করা যুক্তরাষ্ট্রের তিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার এমন দাবি শুধু একটি কৌশলগত জোটের চিত্রই তুলে ধরে না, বরং এটি একটি নতুন ধরনের যুদ্ধের কাঠামো উন্মোচন করে।
বর্তমানে পারস্য উপসাগরে আসল যুদ্ধটি চলছে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক স্পেকট্রামে বা তড়িৎচৌম্বকীয় বর্ণালিতে। ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলো ধেয়ে আসা অনেক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করেছে ঠিকই, তবে বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র দেশগুলোর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ফাঁকি দিয়ে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি ঘটিয়েছে।
যদিও রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এক ফোনালাপে তেহরানের সঙ্গে এমন কোনো গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের কথা অস্বীকার করেছেন, তবে তাতে সমীকরণের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।
ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য রাশিয়া ইরানের কাছ থেকে ড্রোন ও গোলাবারুদ পেয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে রাশিয়ার অবস্থান লক্ষ্য করে নির্ভুল গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সাহায্য করছে।
সিআইএর সাবেক কর্মকর্তা ব্রুস রিডেল একবার বলেছিলেন, আধুনিক যুদ্ধে বুলেটের চেয়ে স্থানাঙ্ক বা কো-অর্ডিনেট অনেক বেশি মূল্যবান। শত্রু কোথায় আছে তা যে জানে, জয় তারই হয়। পারস্য উপসাগরে এখন সেই তত্ত্বই বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।
রাশিয়ার গোয়েন্দা তথ্যের কারণে ইরান এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি রণতরী ও বিমানের অবস্থান এমন নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে পারছে, যা তাদের একার পক্ষে সম্ভব ছিল না। ইরানের নিজস্ব সামরিক স্যাটেলাইট ব্যবস্থা সীমিত, যা খোলা সমুদ্রে দ্রুত চলমান নৌযানের অবস্থান ধরতে যথেষ্ট নয়। তবে রাশিয়ার উন্নত নজরদারি নেটওয়ার্ক এবং ‘খৈয়াম’ (ক্যানোপাস-ভি) স্যাটেলাইট তেহরানকে সার্বক্ষণিক অপটিক্যাল এবং রাডার ইমেজ সরবরাহ করছে। এটি শুধু ইরানের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে না, বরং এটি তাদের ‘প্রিসিশন-স্ট্রাইক’ বা নিখুঁত নিশানায় হামলার মূল স্নায়ুতন্ত্র হিসেবে কাজ করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পেন্টাগনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক বেশ কিছু ইরানি হামলা এমন সব স্থাপনায় হয়েছে, যা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের অপারেশনের সঙ্গে যুক্ত এবং যেগুলোর স্থানাঙ্ক কোনো প্রকাশ্য মানচিত্রে নেই।
বেইজিংয়ের ভূমিকা: অনেকটা নীরব হলেও উপসাগরীয় যুদ্ধে চীনের অবস্থান কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। চীনারা বছরের পর বছর ধরে ইরানের ইলেকট্রনিক যুদ্ধের দৃশ্যপট বদলে দিয়েছে। তারা উন্নত রাডার সিস্টেম রপ্তানি করেছে এবং ইরানি সামরিক নেভিগেশন ব্যবস্থাকে জিপিএস থেকে সরিয়ে চীনের এনক্রিপ্ট করা ‘বেইডো-৩’ নেটওয়ার্কে নিয়ে এসেছে। ইরান ২০২৫ সালের জুন মাসেই তাদের পুরো ব্যবস্থাকে বেইডোতে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে।
ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমোস ইয়াদলিনের মতে, প্রতিটি সেকেন্ড এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ইরান যদি শত্রু শনাক্ত করতে কয়েক মিনিট সময়ও কমিয়ে আনতে পারে, তবে তা আকাশের আকাশযুদ্ধের ভারসাম্য বদলে দেয়।
চীনের সরবরাহ করা ‘ওয়াইএলসি-৮বি’ অ্যান্টি-স্টিলথ রাডার এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে; যা যুক্তরাষ্ট্রের স্টিলথ বিমানের রাডার-শোষক আবরণের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। মার্কিন বি-২১ রাইডার এবং এফ-৩৫সি বিমানগুলো মূলত রাডারের কাছে অদৃশ্য থাকার জন্য তৈরি। কিন্তু এ চীনা রাডারের সামনে তারা অনেক বেশি দৃশ্যমান।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান চীন থেকে ৫০টি সিএম-৩০২ সুপারসনিক অ্যান্টি-শিপ মিসাইল কেনার কাছাকাছি পৌঁছেছে। ৩ মাখ গতিসম্পন্ন এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে বলা হয় ‘ক্যারিয়ার কিলার’ বা রণতরী ধ্বংসকারী। বর্তমানে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এবং ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এ ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর নাগালেই অবস্থান করছে।
আইআরজিসির মুখপাত্র আলি মোহাম্মদ নাঈনি দাবি করেছেন, ইরান এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১০টি উন্নত রাডার সিস্টেম ধ্বংস করেছে। এ দাবি যদি আংশিকও সত্য হয়, তবে এটি ব্যাখ্যা করে যে, কীভাবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েল ও পারস্য উপসাগরের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পেরেছে।
ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের জয় না পাওয়ার ৭ কারণ : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ নিয়ে এক জটিল সন্ধিক্ষণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক বিশ্লেষণ বলছে, ট্রাম্প এ যুদ্ধে বিজয় ঘোষণা করতে পারছেন না; মনে হচ্ছে তিনি ক্রমে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন। এ যুদ্ধ থেকে পিছু হটার কৌশলগত ও অর্থনৈতিক পরিণাম হবে যুদ্ধে টিকে থাকার চেয়েও ভয়াবহ। ট্রাম্প অবশ্য এখনো লিন্ডন জনসন বা জর্জ ডব্লিউ বুশের মতো চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েননি, যারা পরাজিত হতে যাওয়া যুদ্ধকেও দীর্ঘায়িত করেছিলেন। তবে বিপদের সংকেত এখন চারদিকে স্পষ্ট।
সিএনএন বলছে, সম্ভাব্য সাতটি কারণে ইরান যুদ্ধে জয় পাবে না ট্রাম্প। গত দুই সপ্তাহের যুদ্ধে ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হারানোর উদাহরণ হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে ‘হরমুজ প্রণালি’ সংকট।
তেলের বিশ্ববাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথটি বন্ধ করে দিয়ে ইরান বুঝিয়ে দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও সবকিছু শুধু শক্তি প্রয়োগ বা প্রশাসনের কঠোর ভাষা দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়।
যুদ্ধের শুরুতে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর মনে করা হয়েছিল যে, শাসনের পরিবর্তন আসবে। কিন্তু তার ছেলে মোজতবার উত্তরাধিকারী হিসেবে ক্ষমতায় বসা ট্রাম্পের সফলতার দাবিকে ধোঁয়াশাচ্ছন্ন করে দিয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা একে ‘সামরিক সাফল্য কিন্তু কৌশলগত ব্যর্থতা’ হিসেবে বর্ণনা করছেন।
ইসরায়েলের যুদ্ধ থামানোর অনীহাও তার পরাজয়ের পেছনে ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের অন্দরেই যুদ্ধ নিয়ে মতভেদ তৈরি হয়েছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে লক্ষ্য পূরণ না হওয়াও বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ট্রাম্প ইরানিদের ‘মুক্তির’ স্বপ্ন দেখিয়ে বিদ্রোহের ডাক দিলেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো গণঅভ্যুত্থান দেখা যায়নি।
তেলের দাম বৃদ্ধি এবং যুদ্ধের ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের পকেটে টান দিচ্ছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোটারদের কাছে ইরানের পারমাণবিক বোমার আশঙ্কার চেয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় ও তেলের দাম অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com