প্রজন্ম ডেস্ক:
প্রযুক্তিগত অগ্রসরতা ও কার্যকর তথ্যপ্রবাহের জগতে গলার কাঁটা হয়ে উঠেছে ভুয়া ফটোকার্ড, যা সরাসরি আঘাত হানছে ব্যক্তি, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও রাষ্ট্রের ওপর। এই ভুয়া ফটোকার্ডের ছোবল থেকে রেহাই পাচ্ছেন না খোদ প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারি-বিরোধী দলের নেতারাও। সাধারণ মানুষকেও অহরহ ভুগতে হচ্ছে ফটোকার্ড যন্ত্রণায়। ভুয়া ফটোকার্ড তৈরির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়েও বাধছে বিপত্তি। যদিও এসব ফটোকার্ড খুব অল্প সময়ের মধ্যে সবখানে ছড়িয়ে দিচ্ছে বিভ্রান্তি ও অসত্য তথ্য। চরিত্র হনন করছে অনেকের।
প্রতিপক্ষকে সামাজিকভাবে ধ্বংস করতে ব্যবহার করা হচ্ছে ফটোকার্ড। আইন আছে, গ্রেপ্তারও হচ্ছে, তবু থামছে না ভুয়া ফটোকার্ড প্রচার। বরং পরিস্থিতি ক্রমেই হচ্ছে ভয়াবহ। একের পর এক সংশ্লিষ্ট আইনগুলোও পড়ছে প্রশ্নের মুখে। জাতীয় সংসদেও এ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ‘সময় নষ্ট’ বলে মন্তব্য করতে হয়েছে স্পিকারকে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অসত্য কিংবা ভুয়া তথ্য ডিজিটাল যুগের সবচেয়ে বিপজ্জনক ও ভয়ংকর অস্ত্র। আর সেই অস্ত্রে গুলি-বারুদ ভরে দিচ্ছে কথিত ‘ফটোকার্ড’।
কোনো সংক্ষিপ্ত সংবাদ কিংবা কারও কোনো চমকপ্রদ উক্তি গ্রাফিক ডিজাইনের মাধ্যমে দৃষ্টিনন্দন কার্ড তৈরি করে তা বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, পোর্টাল, সোশ্যাল মিডিয়ায় ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়ানো হয়। এটাই ফটোকার্ড হিসেবে পরিচিত। এই ফটোকার্ডেই ব্যাপকভাবে গুজব এবং ভুল, মিথ্যা, মানহানিকর তথ্য প্রচারিত হলে বা মিথ্যা সংবাদ প্রতিষ্ঠানের নাম যুক্ত করা হলে সেটাকেই ভুয়া ফটোকার্ড বলা হয়। সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসবের পুনরাবৃত্তি এখনি রোধ করা না গেলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে। অথচ এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীরাই আইনের আশ্রয় নিচ্ছেন না; ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও কিছু করার থাকছে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘সামাজিক মাধ্যমকে আমরা নিরাপদ করতে পারিনি। রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রতিপক্ষকে হেয় করতে ফটোকার্ডকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।’ তিনি মনে করেন, ‘দেশে একাধিক আইন থাকলেও সেগুলোর সঠিক প্রয়োগের অভাবই বড় সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে ঘটনা আলোচনায় এলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, কিন্তু সব ক্ষেত্রে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখনই একে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সামনে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হবে। ইতোমধ্যেই একটি গোষ্ঠী এসব ব্যবহার করে অরাজকতা সৃষ্টি করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। তাই প্রতিটি ঘটনায় সমানভাবে আইন প্রয়োগ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। না হলে ‘ফটোকার্ড’ নামের এই ডিজিটাল অস্ত্রই হয়ে উঠবে রাষ্ট্রের ও নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে বড় অনিয়ন্ত্রিত হুমকি।’
সম্প্রতি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় আজিজুল হক নামে এক ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে জড়িয়ে ফেসবুকে একটি কুরুচিপূর্ণ ফটোকার্ড ছড়িয়ে দেন। এ ঘটনা দ্রুত ভাইরাল হলে তাকে গ্রেপ্তারও করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু তাতেও থামেনি বিতর্ক, বরং নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, ন্যায়সঙ্গতভাবে আইন প্রয়োগ হচ্ছে না।
একই চিত্রের দেখা মিলেছে ভোলায়। প্রধানমন্ত্রী, তার কন্যা জাইমা রহমান এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদকে নিয়ে সেখানে আপত্তিকর ফটোকার্ড শেয়ার করার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন মহিলা জামায়াত কর্মী সাওদা সুমি। কিন্তু তার তিন বছরের বাকপ্রতিবন্ধী সন্তানের বিষয়টি সামনে আসতেই সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। পরে তাকে আদালত জামিন দিলেও ততক্ষণে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে নানা বিতর্ক।
ঠাকুরগাঁওয়েও একই ধরনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন জামায়াত কর্মী আব্দুল্লাহ আল মামুন। বিএনপি নেতাদের নিয়ে ‘অশালীন’ ফটোকার্ড বানিয়ে পোস্ট করায় মামলা হয়েছে তার বিরুদ্ধেও। মুন্সীগঞ্জে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন শাওন মাহমুদ। এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে, যেগুলোতে বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
এদিকে এসব ঘটনায় প্রযুক্তিগত আইন বদলেছে বারবার, কিন্তু বাস্তবতা বদলায়নি এখনও। ২০০৬ সালের তথ্যপ্রযুক্তি আইন থেকে ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, এরপর ২০২৩ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইন ও সবশেষে ২০২৫ সালের সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশÑ সবকটি আইন প্রণয়নের সময়ই বলা হয়েছে, ‘নাগরিক অধিকার সুরক্ষিত হবে, অপব্যবহারও কমবে।’ কিন্তু মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, আইন প্রণয়নে নামের পরিবর্তন হয়েছে, চরিত্রের নয়। এখনও পুলিশের হাতে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারের ক্ষমতা রয়ে গেছে। ৩৫(ঘ) ধারা সেই পুরনো বিতর্কই টিকিয়ে রেখেছে। ফলে আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে মানবাধিকারকর্মী নূর খান বলছেন, ‘এখনও ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনেরই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।’ অন্যদিকে আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবালের মতে, চারবার সংশোধনের পরও আইন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি। তবে বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সমালোচনা এক জিনিস, কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কুরুচিপূর্ণ ফটোকার্ড নির্মাণ অবশ্যই অপরাধ এবং শাস্তিযোগ্য।’
এদিকে প্রযুক্তির অগ্রগতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সাইবার বিশেষজ্ঞ তানভীর জোহা বলছেন, ‘এআই ব্যবহার করে এমন বাস্তবসম্মত ছবি-ভিডিও বানানো যাচ্ছে, যা দেখে সত্য-মিথ্যা আলাদা করা প্রায় অসম্ভব। ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছেন। এর ফলে কেউ হারাচ্ছেন অর্থ, কেউ সম্মান, কেউবা নিরাপত্তা।’
ফেসবুকের ভুয়া বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়ে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর মেহেদী হাসানের খোয়া গেছে ৪৫০০ টাকা। ফটোকার্ডের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আরেক ছাত্র তুহিন বলেন, ‘আমি নিজেই বুঝতে পারি না কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা। এই বিভ্রান্তিই এখন সবচেয়ে বড় সংকট।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভালো-মন্দের দ্বিমুখী স্রোতে সামাজিক মাধ্যম ক্রমশই অচেনা হয়ে উঠছে। এখানে একদিকে রয়েছে তথ্যের উন্মুক্ত প্রবাহ, অন্যদিকে অপতথ্যের বন্যা। ভুয়া ব্যাংক দেউলিয়ার খবর থেকে শুরু করে জ্বালানি সংকট, রাজনৈতিক চরিত্রহনন থেকে নারীদের সম্পর্কে বিকৃত প্রচারÑ সবই এখানে ছড়িয়ে পড়ছে চোখের পলকে। রিপোর্ট করলেও অনেক কনটেন্ট সরানো হয় না, বরং অ্যালগরিদম সেটিকে আরও ছড়িয়ে দেয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম ইউনিটের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মদ নাসের রিকাবদার বলেন, ‘এসব ঘটনা প্রতিরোধ করতে হলে ভুক্তভোগীকেই আইনগত পদক্ষেপ নিতে হবে। সাধারণ ডায়েরি বা মামলা কিছু একটা করতে হবে। জিডি বা মামলা করার পর আমাদের কাছে এলে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি।’
গণমাধ্যমে বা অন্য কোনো মাধ্যমে আলোচনায় না আসা পর্যন্ত সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া ফটোকার্ড প্রচারের মতো ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা দেখা যায় নাÑ এমন প্রশ্নের উত্তরে ডিসি হাসান মোহাম্মদ নাসের বলেন, ‘আলোচনায় না এলে পুলিশ বসে থাকেÑ বিষয়টি এ রকম না। আমাদের কাছে যখন একটি অভিযোগ আসে, তখন আমরা সেটির ভিত্তিতে মাঠে নামি, তদন্ত করি, জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাই। মোট কথা অভিযোগটির সমাধান করি।’
বিদ্যমান একাধিক আইনের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কোনো জটিলতায় পড়তে হয় কি নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কোনো আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হয় না। কারণ প্রচলিত আইনেই এসব ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়া যায়। ভুক্তভোগীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অভিযোগ না করলেই কেবল এমন ঘটনার সুরাহা করা যায় না। অভিযোগ পেলেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজটা করতে পারে।’
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com