প্রজন্ম ডেস্ক:
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত আড়াইটায় মিরপুর-১ নম্বরের একটি ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেলে তেল নিতে লাইনে দাঁড়ান ওই এলাকার বাসিন্দা সুমন আহমেদ। প্রায় ৪০ মিনিট অপেক্ষার পর যখন তার তেল নেওয়ার পালা, তখন পাম্প কর্তৃপক্ষ জানায় তেল শেষ। সুমনের পেছনে তখন প্রায় দেড়শ মানুষের দীর্ঘ লাইন।
জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে গিয়ে এমন ভোগান্তি আর দুর্দশার চিত্র প্রায় প্রতিদিনের। তেল নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আবার কেউ কেউ অপেক্ষা করছেন রাতভর। আবার দীর্ঘ অপেক্ষার পরও তেল না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন অনেকেই।
এদিকে সংকট কাটাতে রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানি এবং এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ৬০ দিনের নিষেধাজ্ঞা ছাড়ের যে খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তা সঠিক নয় বলে জানিয়েছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ।
যুদ্ধের প্রভাবে দেড় মাস ধরে চলা জ্বালানি সংকটে ছুটির দিনে কিছুটা স্বস্তি মিলবে এমন আশা ছিল অনেকের। কিন্তু বাস্তবতা উল্টো। গতকাল শুক্রবার রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব অঞ্চলে জ্বালানি তেলের সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। কোথাও পাম্প বন্ধ, আবার কোথাও সীমিত বিক্রিতে দীর্ঘ লাইন। সব মিলিয়ে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশজুড়ে এখন অধিকাংশ পাম্পে ‘রেশনিং’ পদ্ধতিতে তেল বিক্রি হচ্ছে। নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি দেওয়া হচ্ছে না। তবু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে পাম্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আবার নতুন করে লাইন তৈরি হচ্ছে। এক ধরনের চক্রে আটকে পড়েছে সরবরাহ ব্যবস্থা।
পাম্পকর্মীরা বলছেন, ডিপো থেকে জ্বালানি সরবরাহে বিলম্বই এ সংকটের মূল কারণ। অনেক পাম্পে সকালে তেল না থাকায় সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়েছে। পরে যখন তেল আসে, তখন একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক যানবাহন ভিড় করে। ফলে রেশনিং করে সীমিত পরিমাণে তেল দিতে হচ্ছে। এতে একদিকে লাইন কমছে না, অন্যদিকে অসন্তোষ বাড়ছে।
এ সংকট ঘিরে ভিআইপি সুবিধা নিয়ে ক্ষোভও বাড়ছে। সাধারণ চালকদের অভিযোগ দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পরও তারা তেল পাচ্ছেন না, অথচ প্রভাবশালী পরিচয় ব্যবহার করে কেউ কেউ লাইনের বাইরে গিয়ে মুহূর্তেই তেল নিয়ে যাচ্ছেন। এতে পাম্পে উত্তেজনা ও হট্টগোলের ঘটনাও ঘটছে। কোথাও কোথাও পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। মৎস্য ভবন এলাকার রমনা পাম্পে মোটরসাইকেল চালকদের বিশৃঙ্খলার কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেও সরকারের পক্ষ থেকে ভিন্ন বার্তা দেওয়া হচ্ছে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারি পরিদর্শনকালে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, দেশে বর্তমানে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুদ রয়েছে। তিনি দাবি করেন, এপ্রিল ও মে মাসের জন্য পূর্ণ মজুদ আছে এবং জুন মাসের চাহিদা মাথায় রেখে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মার্চ ও এপ্রিল মাসে নির্ধারিত ক্রুড অয়েল সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদনে। একপর্যায়ে পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে দুটি বন্ধ হয়ে যায় এবং বাকি ইউনিটগুলোতে ‘ডেড স্টক’ দিয়ে শোধন কার্যক্রম চালাতে হয়েছে। তবে চলতি মাসের শেষের দিকে নতুন কার্গো আসার পর পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরবরাহে যেন কোনো বিঘœ না ঘটে, সে জন্য সরকার আগে থেকেই পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি বাড়িয়েছে। এ কৌশল কার্যকর হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীলভাবে তথ্য পরিবেশনের আহ্বান জানান, যাতে জনমনে অযথা আতঙ্ক না ছড়ায়।
তেল সরবরাহ বৃদ্ধির উদ্যোগ : গত মাসের তুলনায় এ মাসে অকটেনের সরবরাহ কমায় প্রতিদিন ঢাকার পাম্পে তেল নেওয়ার লাইন আরও দীর্ঘ হচ্ছে। অথচ দেশে অকটেনের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। দুর্ভোগ কমাতে আগামীকাল রবিবার অথবা পরশু সোমবার থেকে বাজারে অকটেন সরবরাহ ২৫ শতাংশ বাড়ানোর চিন্তা করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সরবরাহ বাড়ানো হলে ফিলিং স্টেশনের লাইন কমতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অকটেনের পাশাপাশি ডিজেলের সরবরাহ বাড়ানোরও পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
বিপিসি ও তেল বিপণন কোম্পানির কর্মকর্তারা বলছেন, পেট্রোলপাম্প থেকে ৩০ শতাংশ বাড়তি চাহিদা আসছে। কিন্তু গত বছর একই দিনে তারা যতটুকু তেল নিয়েছে, এবারও তা দেওয়া হচ্ছে। এতে কোনো কোনো পাম্প প্রতিদিন তেল পাচ্ছে না।
এটি নজরদারি করছে জ্বালানি বিভাগ। এর ব্যত্যয় হলে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। তাই বাড়তি চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তেল সরবরাহ কমিয়ে দিচ্ছে কোম্পানিগুলো। এতে তেল নিতে মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়ছে।
জ্বালানি বিভাগ ও বিপিসির তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে অকটেনের কোনো ঘাটতি নেই। সরবরাহ বাড়ানো না হলে অকটেন রাখার জায়গা পাওয়া যাবে না। দেশে সব মিলে অকটেন মজুদ করার সক্ষমতা আছে ৪৫ হাজার ৮১৯ টন। ১৫ এপ্রিল বিক্রির পর অকটেন মজুদ আছে ৩০ হাজার ৬৬৭ টন, যা বর্তমান সরবরাহ বিবেচনায় ২৬ দিনের মজুদ। স্থানীয় উৎস থেকেও প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৭০০ টন অকটেন যুক্ত হচ্ছে।
গত বছরের মার্চে প্রতিদিন গড়ে অকটেন সরবরাহ করা হয়েছে এক হাজার ১৯৩ টন। যুদ্ধের মধ্যে চাহিদা বাড়ায় এবার মার্চে দিনে সরবরাহ ২৬ টন বেড়ে হয়েছে এক হাজার ২১৯ টন। তবে গত বছরের তুলনায় এবার এপ্রিলে সরবরাহ কমেছে ৪৯ টন। আর গত মাসের তুলনায় এ মাসে সরবরাহ কমেছে ১০৪ টন। ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিন ডিপো থেকে গড়ে সরবরাহ হয়েছে এক হাজার ১১৫ টন অকটেন।
বছরে সরবরাহ করা মোট জ্বালানি তেলের ৬ শতাংশ অকটেন। গত অর্থবছর দেশে চার লাখ ১৫ হাজার টন অকটেন বিক্রি হয়। এর মধ্যে ৫০ শতাংশ দেশেই উৎপাদিত হয়। আর বাকি ৫০ শতাংশ আমদানি করা হয়। এপ্রিলে অকটেনের চাহিদা ৩৭ হাজার টন।
তেল নিতে বিশেষ সুবিধা চায় পুলিশ : চলমান সংকটের মধ্যে জ্বালানি তেল সংগ্রহে বিশেষ সুবিধা চেয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটি বলছে জ্বালানি নিতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, এতে জরুরি দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন ঘটছে। আসামি ধরতে অভিযান, টহল কিংবা দুর্ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছানো, সব ক্ষেত্রেই সময় নষ্ট হচ্ছে। তাই দেশের সব পাম্পে পুলিশ সদস্যদের জন্য আলাদা লাইন বা বিশেষ বুথ চালুর দাবি জানিয়েছে তারা।
রাশিয়া থেকে তেল আমদানির খবর সঠিক নয় : সংকট কাটাতে সরকার রাশিয়া থেকে ১০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ৬০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা ছাড় দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এমন খবর প্রকাশিত হয়েছে কয়েকটি গণমাধ্যমে। এ বিষয়ে গতকাল জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলছে, খবরটি সঠিক নয়।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের তথ্য জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহাম্মদ আরিফ সাদেক স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশের জন্য রাশিয়ান জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক নতুন ৬০ দিনের ছাড় প্রদানের বিষয়ে প্রকাশিত কিছু সংবাদ দৃষ্টিগোচর হয়েছে।
এতে বলা হয়, এ বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের কোনো অনুমোদিত কর্মকর্তা কোনো গণমাধ্যমকে কোনো তথ্য, নিশ্চিতকরণ বা মন্তব্য প্রদান করেননি। ১১ এপ্রিল থেকে ৯ জুন পর্যন্ত কথিত ৬০ দিনের ছাড় অথবা রাশিয়া থেকে ১০ লাখ টন ডিজেল আমদানির কোনো পরিকল্পনা সম্পর্কে এ বিভাগ কোনো সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিককে কোনো তথ্য প্রদান করেনি।
বিভাগ আরও স্পষ্ট করতে চায় যে, রাশিয়ান জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ছাড়সংক্রান্ত বিষয় কিংবা বাংলাদেশ কর্তৃক রাশিয়া থেকে ১০ লাখ টন ডিজেল ক্রয়ের কোনো প্রস্তাব, সিদ্ধান্ত বা ব্যবস্থা সম্পর্কে বিভাগের কাছে কোনো সরকারি তথ্য, হালনাগাদ তথ্য বা যোগাযোগ নেই।
অতএব এ বিভাগের কর্মকর্তাদের নামে প্রকাশিত এ ধরনের সংবাদ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ কর্তৃক প্রদত্ত কোনো অনুমোদিত তথ্যের ভিত্তিতে নয়। এ বিভাগের নামে সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ জাতীয় জ্বালানিনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারে বলে উল্লেখ করা হয় বিজ্ঞপ্তিতে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com