প্রজন্ম ডেস্ক:
জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানোর সরকারি নির্দেশনার পরও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাম্পগুলোতে আগের মতোই দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। কোথাও কোথাও লাইন আগের চেয়ে আরও দীর্ঘ হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও চাহিদা মতো তেল না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চালক ও সাধারণ গ্রাহকরা।
এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেল নিয়ে বিশৃঙ্খলা কমাতে সারাদেশে আরও ১৯ জেলায় মোটরসাইকেলের ফুয়েল পাস নিবন্ধন কার্যক্রম চালু করার কথা জানিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
এদিকে সংকট সামাল দিতে সরকার বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। ধারাবাহিকভাবে তেলবাহী জাহাজ আসছে দেশে। এপ্রিল মাসের ২০ দিনে এখন পর্যন্ত ডিজেল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও ফার্নেস তেল নিয়ে ১২টি জাহাজ এসেছে। এতে মজুদ কিছুটা বেড়েছে।
পাম্পে এখনও দীর্ঘ লাইন : জ্বালানি তেল নিয়ে সংকট দূর করতে গত রবিবার রাতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) তেল সরবরাহকারী তিন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনাকে সরবরাহ বাড়ানোর নির্দেশ দেয়।
নির্দেশনা অনুযায়ী, গতকাল থেকে অকটেনের সরবরাহ ২০ শতাংশ এবং পেট্রল ও ডিজেলের সরবরাহ ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। তবে সরকারি এই নির্দেশনার প্রভাব মাঠ পর্যায়ে এখনো দৃশ্যমান নয়।
গতকাল দুপুরের দিকে রাজধানীর কল্যাণপুর, আসাদগেট, শাহবাগসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আগের মতোই তেল পাম্পে সাধারণ মানুষের জটলা।
আসাদগেট এলাকায় তালুকদার ফিলিং স্টেশনের সামনে তেলের জন্য অপেক্ষায় থাকা মোটরসাইকেলচালক আবির হোসেন বলেন, ‘সরকারের তেল সরবরাহ বৃদ্ধির ঘোষণা শুনে পাম্পে এসে দেখি আগের মতোই দীর্ঘ লাইন। তাহলে এই বাড়তি তেল কোথায় গেল? রোদ-গরমের মধ্যে এভাবে কষ্ট করে তেল নেওয়ার দিন কবে শেষ হবে?’
ওই পাম্পের উল্টো পাশে সোনারবাংলা ফিলিং স্টেশনের সামনে ব্যক্তিগত গাড়ির লাইনে তেলের জন্য অপেক্ষা ছিলেন লুৎফর রহমান নামের এক ব্যক্তি। খানিকটা ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘সরকার তেলের দাম বৃদ্ধি করল। কিন্তু এখন বাড়তি দাম দিয়েও তেল পেতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। সময় নষ্ট হচ্ছে। কষ্ট করছি ফাও।’
বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রথম দিনেই সরবরাহ বৃদ্ধির পুরোপুরি সুফল পাওয়া যাবে না। কয়েক দিনের মধ্যে চাপ কমে যাবে। আর অবৈধ মজুদ বন্ধ হলেও তেমন কোনো সংকট থাকবে না। কারণ, তেলের মজুদ এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত।
২০ দিনে এসেছে ১২টি তেলবাহী জাহাজ : ইরান যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি সরবরাহে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। পরিস্থিতি সামাল দিতে নানান উপায়ে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে সরকার।
জাহাজে তেল আসায় দেশের মজুদ দ্রুত বাড়ছে। এ সপ্তাহে তেল নিয়ে আরও অন্তত পাঁচটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে। এতে বিশেষ করে অকটেন ও ফার্নেস তেলের ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তি তৈরি হয়েছে। ডিজেলের ক্ষেত্রেও বড় চালান খালাস হলে পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
চলতি মাসে আটটি জাহাজে ২ লাখ ৭৪ হাজার টন ডিজেল দেশে এসেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। পাশাপাশি দুটি জাহাজে অকটেন এসেছে ৫৩ হাজার টন। একটি করে জাহাজে এসেছে প্রায় ১২ হাজার টন জেট ফুয়েল (উড়োজাহাজের জ্বালানি) এবং ২৫ হাজার টন ফার্নেস তেল। এর বাইরে ভারত থেকে পাইপলাইনে এসেছে আরও ১২ হাজার টন ডিজেল।
নিয়মিত তেল আসছে জানিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম বলেছেন, এপ্রিলে সংকট নেই। অকটেনের মজুদ এরই মধ্যে মাসিক চাহিদার চেয়ে বেশি হয়েছে। এখন মে ও জুনের সরবরাহ নিশ্চিত করতে আগাম পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
দেশে জ্বালানি ব্যবহারের বড় অংশই ডিজেলনির্ভর। মোট ব্যবহারের প্রায় ৬৩ শতাংশ। চলতি মাসে ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৪ লাখ টন। ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত সরবরাহযোগ্য মজুদ ছিল ১ লাখ ২ হাজার ১৯১ টন, যা দিয়ে প্রায় ৯ দিন চলবে। তবে আরও প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার টন ডিজেল খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এই চালান যুক্ত হলে মজুদ প্রায় দুই সপ্তাহ বাড়বে।
১ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ডিজেল বিক্রি হয়েছে ২ লাখ ৯০৪ টন। দৈনিক গড় বিক্রি ১১ হাজার ১৬১ টন, যা গত বছরের একই সময়ের ১১ হাজার ৮৬২ টনের তুলনায় কম। অর্থাৎ, সরবরাহের চাপ থাকলেও চাহিদা কিছুটা নেমেছে।
অকটেনের ক্ষেত্রে চিত্র ভিন্ন। মাসিক চাহিদা প্রায় ৪৭ হাজার টন হলেও ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত মজুদ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৯ হাজার টনে, যা দিয়ে ২৪ দিন চলবে। এর মধ্যে নতুন একটি জাহাজে ২৭ হাজার টন অকটেন এসে খালাস শুরু হয়েছে। ফলে মজুদ সক্ষমতার সীমা ছাড়ানোর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। গড় বিক্রি ১ হাজার ১১৫ টন, যা গত বছরের ১ হাজার ১৮৫ টনের তুলনায় কম।
পেট্রলের মজুদ রয়েছে ১৯ হাজার ১২৬ টন, যা দিয়ে প্রায় ১৪ দিন চলবে। দৈনিক গড় বিক্রি ১ হাজার ২৫৩ টন। গত বছরের ১ হাজার ৩৭৪ টনের তুলনায় কম।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ফার্নেস তেলের মজুদ রয়েছে ৬৭ হাজার ৩৭৮ টন, যা দিয়ে প্রায় ৩০ দিন চলবে। এ মাসে দৈনিক গড় বিক্রি ১ হাজার ৭২০ টন, যা গত বছরের ২ হাজার ২৬৩ টনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
অন্যদিকে জেট ফুয়েলের ক্ষেত্রে চাহিদা বেড়েছে। বর্তমানে মজুদ রয়েছে ২৩ হাজার ৮৬ টন, যা দিয়ে প্রায় ১৫ দিন চলবে। গড় বিক্রি ১ হাজার ৭৭৫ টন, যা গত বছরের প্রায় দেড় হাজার টনের তুলনায় বেশি। কেরোসিন ও মেরিন ফুয়েলের মজুদ যথাক্রমে প্রায় ৩৬ ও ৩২ দিনের।
‘ফুয়েল পাস’ আরও ১৯ জেলায় : সারাদেশে মোটরসাইকেলের ‘ফুয়েল পাস’ চালুর অংশ হিসেবে গতকাল আরও ১৯ জেলায় নিবন্ধন কার্যক্রম চালু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব জেলায় ফুয়েল পাস নিবন্ধন চালু করা হবে বলে জানিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
নতুন তালিকায় যুক্ত হওয়া জেলাগুলো হলো গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, বগুড়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বাগেরহাট, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, বরগুনা, ভোলা, ঝালকাঠি, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ফেইসবুক পোস্টে বলা হয় দেশব্যাপী ফুয়েল পাস সিস্টেম বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গতকাল সোমবার থেকে এসব জেলায় নিবন্ধন কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। ব্যবহারকারীদের মতামত, অভিযোগ ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য ফুয়েল পাসের অফিসিয়াল ফেইসবুক গ্রুপে যুক্ত হতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে।
জ্বালানি তেল বিক্রিতে শৃঙ্খলা আনা, নজরদারি বাড়ানো এবং বিতরণ আরও স্বচ্ছ করার কথা বলে সরকার ফুয়েল পাস ব্যবস্থা চালু করে।
এর আগে ১৮ এপ্রিল মন্ত্রণালয়ের আরেক পোস্টে বলা হয়, ‘ফুয়েল পাস বিডি অ্যাপের’ পাইলট কার্যক্রম বাড়াতে ঢাকার বাইরে কয়েকটি জেলা ও মেট্রোপলিটন এলাকার নিবন্ধিত মোটরসাইকেলকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে ঢাকা জেলায় আরও ১৮টি পেট্রোল পাম্পে পাইলটিং কার্যক্রম সম্প্রসারণের কথাও জানানো হয়।
ফুয়েল পাসের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে কিউআর কোডভিত্তিক পরিচয় ও নিয়ন্ত্রিত বিতরণের মাধ্যমে জ্বালানি বিক্রিতে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যেই এটি চালু করা হয়েছে। তবে ওয়েবসাইটে এটিও উল্লেখ আছে, এটি এখনো পাইলট বা পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে।
মোবাইল অ্যাপভিত্তিক এই ব্যবস্থা প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে ৯ এপ্রিল ঢাকার তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন ও আসাদ গেটের সোনারবাংলা ফিলিং স্টেশনে চালু করা হয়। প্রথম ধাপে শুধু মোটরসাইকেলচালকদের জন্য এই সেবা খোলা রাখা হয়েছিল।
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর দেশে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন, তেল না পাওয়া, কোথাও কোথাও বিশৃঙ্খলা এবং কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ সামনে আসে। এই অবস্থায় বিক্রি ও বিতরণে নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি ও শৃঙ্খলা আনতে ডিজিটাল ব্যবস্থার পথে যায় সরকার।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com