আগামী প্রজন্ম ডেস্ক:
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এখন গলার কাঁটা হয়ে উঠেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প তথা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য। বিশ্ববাজারে তেল দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে। বিশ্ব অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে। এদিকে হরমুজ প্রণালি অবরোধ করেও ইরানকে কাবু করতে পারছে না আমেরিকানরা। মিত্র দেশগুলোকে দিয়ে ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনার পথও খুলতে পারছে না ওয়াশিংটন।
এমন পরিস্থিতির জন্য গোটা দুনিয়া দায়ী করছে ট্রাম্পকে। বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে ফেলছেন ট্রাম্প, সরাসরি এমন অভিযোগ এনেছেন নোবেলজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিটজ। এদিকে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন ওপেকও ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। ওপেক ও ওপেক প্লাস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এ ছাড়াও ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ‘অপমানিত’ হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস।
এদিকে রাশিয়া ও ইরান যেকোনো পরিস্থিতিতে একে অপরের পাশে থাকবে বলে জানিয়েছেন রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রেই বেলোসভ। ইরানের উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী রেজা তালাই-নিকের সঙ্গে এক বৈঠকে আন্দ্রেই বেলোসভ এ কথা বলেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম প্রেস টিভির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা এবং ঘনিষ্ঠতা দিন দিন আরও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে দুই দেশের পক্ষ থেকেই চলমান সংকট ও সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এদিকে যুদ্ধে ইরানের ধারাবাহিক হামলা থেকে আমিরাতকে সুরক্ষা দিতে প্রতিবেশী আরব দেশগুলো যথেষ্ট ভূমিকা পালন করেনি বলে সমালোচনার পর ওপেক এবং ওপেক প্লাস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।
হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থায় বিশ্ব অর্থনীতির এই সংকটময় মুহূর্তে আরব আমিরাতের ওপেক ও ওপেক প্লাস ছাড়ার সিদ্ধান্ত তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর এই জোটকে দুর্বল করে দিতে পারে এবং জোটের ভেতর বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে, বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞরা। আমিরাতের এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে আগামী ১ মে থেকে।
আমিরাতের পদক্ষেপকে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট এবং এই জোটের কার্যত নেতা সৌদি আরবের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আমিরাত বের হয়ে যাওয়ার ঘোষণার পর ওপেকের বর্তমান সদস্য সংখ্যা ১১। এগুলো হলোÑ সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত, ভেনেজুয়েলা, আলজেরিয়া, লিবিয়া, নাইজেরিয়া, গ্যাবন, নিরক্ষীয় গিনি এবং কঙ্গো প্রজাতন্ত্র। আর ওপেকের সব সদস্যই ওপেক প্লাসের সদস্য। এই জোটে আছে, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, বাহরাইন, ব্রুনাই, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, ওমান ও সুদান।
দীর্ঘদিন ধরেই পারস্য উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো ইরানের হুমকি ও জাহাজে হামলার আশঙ্কায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানি সচল রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ২০ শতাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবহন হয়।
এদিকে ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে বিপর্যয়কর ভুল বলে কড়া সমালোচনা করেছেন নোবেলজয়ী যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিবিদ জোসেফ ই. স্টিগলিটজ। তার ভাষায়, এর ফলে যুদ্ধাপরাধ, প্রাণহানি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ধ্বংস ডেকে আনা হয়েছে।
তার ভাষায়, যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তত বাড়বে। তবে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলেও এর প্রভাব দীর্ঘদিন থাকবে। কারণ, গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খল ইতোমধ্যে ব্যাহত হয়েছে এবং তেল-গ্যাস উৎপাদন স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। তার মতে, এর ফলে যুদ্ধাপরাধ, প্রাণহানি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ধ্বংস ডেকে আনা হয়েছে।
স্টিগলিটজ বলেন, যুদ্ধের ভয়াবহ ফল এখন স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র আবারও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, যেখানে ইতোমধ্যে হাজারো মানুষের প্রাণ গেছে, যাদের বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক। তিনি আরও বলেন, এর ফলে কোভিড-১৯ পরবর্তী সময় বিশ্ব অর্থনীতির যে অগ্রগতি হয়েছিল, তা ধ্বংস হয়ে গেছে।
এদিকে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ‘অপমানিত’ হচ্ছে। তিনি সতর্ক করে আরও বলেন, যুদ্ধে তেহরান সুবিধাজনক অবস্থানে চলে এসেছে। এ কারণে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার কোনো সুস্পষ্ট পথ ওয়াশিংটনের হাতে নেই।
সোমবার জার্মানির মার্সবার্গ শহরে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্যে তিনি বলেন , বর্তমান পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রকে একটি গভীর কৌশলগত সমস্যায় ফেলে দিয়েছে। এ সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অতীতের ব্যর্থ সামরিক অভিযানগুলোর উদাহরণ টেনে আনেন।
ট্রাম্পের বাগাড়ম্বর কিন্তু থেমে নেই। হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করেছে ইরানÑ এই দাবি করেছেন ট্রাম্প। নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, “ইরান এইমাত্র আমাদের জানিয়েছে যে, দেশটি বর্তমানে ভেঙে পড়ার মতো অবস্থায়’ রয়েছে। তারা চায়, আমরা যেন যত দ্রুত সম্ভব হরমুজ প্রণালি খুলে দেই।” যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ বিষয়ে ট্রাম্প অনেকবার ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট দিয়েছেন। তার পোস্টের বেশিরভাগই মিধ্যা বলে প্রমাণ হয়েছে।
এদিকে ইরানের দেওয়া প্রস্তাব ট্রাম্পসহ তার জাতীয় নিরাপত্তা দলের সদস্যরা পর্যালোচনা করছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রস্তাবে ট্রাম্প সন্তুষ্ট হতে পারেনি বলে বিভিন্ন সূত্রে খবর প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলো। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাবের বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে তেলের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা কিছুটা স্তিমিত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। রয়টার্সের এক জরিপ অনুযায়ী, আগামী জুন মাসের জন্য এশীয় বাজারে অপরিশোধিত তেলের অফিসিয়াল সেলিং প্রাইস (ওএসপি) রেকর্ড পরিমাণ কমাতে পারে সৌদি আরব। মূলত স্পট প্রিমিয়াম কমে আসা এবং ইরান যুদ্ধের কারণে কয়েক সপ্তাহের সরবরাহ বিপর্যয়ের পর তেলের চাহিদা হ্রাস পাওয়ায়, এই সিদ্ধান্ত নিতে পারে দেশটি।
শিল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে করা এই জরিপে দেখা গেছে, সৌদির ফ্ল্যাগশিপ ‘আরব লাইট’ গ্রেডের তেলের দাম আগামী জুন মাসে দুবাই ও ওমান কোটেশনের গড় দামের চেয়ে ব্যারেল প্রতি ৭.৫০ থেকে ১৪.৫০ ডলার প্রিমিয়ামে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ মে মাসের তুলনায় জুনে দাম ব্যারেল প্রতি ৫ থেকে ১২ ডলার পর্যন্ত কমতে পারে।
যদিও ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত থামার কোনো লক্ষণ নেই, তবে যুদ্ধের শুরুতে যে ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে তেল কেনার হিড়িক পড়েছিল, তা এখন অনেকটাই কমেছে। ফলে বাজারে তেলের প্রকৃত সরবরাহ ও চাহিদা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এ ছাড়া এপ্রিলের শেষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম আফ্রিকা থেকে বিকল্প তেলের চালান আসার কথা রয়েছে। পাশাপাশি ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শোধনাগারগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ছাড়ের আওতায় রুশ তেলের আমদানি বাড়িয়ে দিয়েছে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com