প্রজন্ম ডেস্ক:
কয়েক বছর ধরে ডিবি সেজে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছেন কাজল ইসলাম জিকু। সারাক্ষণ তার হাতে থাকত পিস্তল-ওয়াকিটকি। বিভিন্ন মালবাহী গাড়ি, গোডাউনে অভিযানের নামে মালামাল, অর্থ লুটে নিতেন। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েসহ আশপাশের এলাকায় যাত্রীবাহী গাড়ি থামিয়ে তল্লাশির নামে করতেন ডাকাতি। দেখলে তাকে আসল পুলিশই মনে হতো। বাস্তবে তিনি প্রতারকচক্রের সদস্য। পুলিশের চাকরিচ্যুত একজন সদস্য। চক্রে এমন আরও পাঁচজন রয়েছেন, যাদের একজন চাকরিচ্যুত সেনা সদস্য, আরেকজন বরখাস্তকৃত পুলিশ সদস্য। তারাও প্রতারণা করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়েছেন। অবশ্য চক্রের ছয় সদস্য সম্প্রতি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন।
এ ছয়জনের মতো ঢাকাসহ সারা দেশে কয়েকশ’ ভুয়া পুলিশ, র্যাব ও সেনা সদস্য রয়েছেন। তারা সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছেন। এতে জনমনে শঙ্কা ও ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে রয়েছেন। অভিযানের কথা বলে কে কখন বাসায় কড়া নাড়ে, সে ভয়ে থাকেন অনেকে। র্যাব-পুলিশ বলছে, বিভিন্ন বাহিনীর চাকরিচ্যুত অনেক সদস্য সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে তুলে এমন অপরাধকর্ম করে যাচ্ছে।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের লজিস্টিক শাখার ডিআইজি সারোয়ার মুর্শেদ শামীম বলেন, তারা টেন্ডারপ্রাপ্ত টেইলার্স কিংবা দোকানকে কাপড় সাপ্লাই দেন। এরপর ওইসব দোকানে গিয়ে শার্ট-প্যান্ট বানাতে সংশ্লিষ্ট ইউনিট থেকে পুলিশ সদস্যদের বলা হয়। সদস্যরা শুধু মাপ দিয়ে পোশাক সেলাই করে নিয়ে আসেন। খরচ সরকারিভাবে বহন করা হয়। যার তার কাছে পোশাক বিক্রির বিষয়টি তারা মনিটরিং করেন বলে দাবি করেন তিনি।
বাছবিচার ছাড়াই পোশাক বিক্রি : রাজধানীর পল্টনে ‘পলওয়েল সুপার মার্কেটটি’ পুলিশের। এ মার্কেটে পুলিশ সদর দপ্তরের লজিস্টিক শাখা থেকে লাইন্সেসপ্রাপ্ত ৩০টি দোকান রয়েছে। দোকানগুলোয় পুলিশের পোশাক, বুট, বেল্ট, হ্যান্ডকাফসহ অন্যান্য সরঞ্জামাদিও বিক্রি হয়। নিয়ম অনুযায়ী কেউ এসব কিনতে এলে তার বিপি নং (পুলিশ সদস্যদের ব্যক্তিগত পরিচিতি নম্বর) ও পুলিশ আইডি কার্ড দেখে এবং তিনি যে পুলিশ সদস্য তা নিশ্চিত হয়েই পোশাক বিক্রি করবেন দোকানিরা। কিন্তু দোকানিদের দু-একজন বাদে অধিকাংশই এ নিয়মের তোয়াক্কা করেন না। যে কেউ এসে অর্ডার করলেই তাকে বানিয়ে দেওয়া হয় র্যাব-পুলিশের পোশাক, বিক্রি করা বিভিন্ন সরঞ্জাম।
বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়া অপরাধীরা পলওয়েল মার্কেট থেকে পোশাক ক্রয়ের কথা জানিয়েছেন। বিষয়টি যাচাই করতে গত বুধবার ওই মার্কেটে যান এ প্রতিবেদক। মার্কেটের নিচতলায় ‘মিম ইউনিফর্ম টেইলার্স অ্যান্ড ফেব্রিক্সে’ গিয়ে পুলিশ পরিচয়ে দুই সেট পোশাক বানাতে চান এ প্রতিবেদক। দোকানি পুলিশ কিনা পরিচয় জানতে চাইলে ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাবে তিনি দরদাম করতে থাকেন। তবে পোশাক বানাতে পুলিশ আইডি কার্ড বা অন্য কোনো কাগজপত্র লাগবে কিনা, জানতে চাইলে উত্তরে তিনি ‘না’ বলেন। বিষয়টি মার্কেটের দোকান মালিক সমিতির নজরে আনলে ওই দোকানিকে সমিতির কার্যালয়ে ডাকা হয় এবং নিয়ম মেনে পুলিশের পোশাক বিক্রি না করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন সমিতির নেতারা।
শুধু মিম ইউনিফর্ম টেইলার্স অ্যান্ড ফেব্রিক্সে নয়, পাশের বাংলাদেশ মিলিটারি জেনারেল স্টোরেরও একই অবস্থা। দুই ব্যক্তি সাধারণ পোশাকে ওই দোকান থেকে বুট, হ্যান্ডকাপ, বেল্টসহ কয়েকটি সরঞ্জাম কিনেন। কিন্তু দোকানি দুই ব্যক্তির কাছ থেকে তার পুলিশ আইডি কার্ড কিংবা বিপি নং কোনটিই দেখতে চাননি। আবেদীন এন্টারপ্রাইজ দোকানেও দেখা গেছে, একই চিত্র। এ দোকানের স্টাফ মোক্তার বলেন, পুলিশের পোশাক দেখলেই তো বুঝা যায় তিনি পুলিশ!
জানতে চাইলে পলওয়েল সুপার মার্কেট দোকান মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম তালুকদার মনি বলেন, পোশাক, হ্যান্ডকাফ, বুট ও স্টিকসহ কিছু পণ্য বিক্রির সময় পুলিশ আইডি কার্ড ও বিপি নং দেখে বিক্রির বিধান রয়েছে। দোকানিদের সমিতির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কড়াভাবে বলা আছে। তারপরও কেউ অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মালিবাগে ‘পার্টি হাউজ’ মার্কেটে এবং কচুক্ষেতে আরেকটি মার্কেটেও একই চিত্র দেখা যায়। তবে এসব মার্কেটে পুলিশের পোশাক-সরঞ্জামাদি বিক্রি করা দোকানিরা বলছেন ভিন্ন কথা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দোকানি জানান, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাদের বডিগার্ড কিংবা দপ্তরের কনস্টেবলকে পাঠিয়ে পোশাক বানিয়ে নেন। অনেক সদস্য পোশাক পরেই কিনতে আসেন। তখন তার কাছে আইডি কার্ড কিংবা বিপি নং জানতে চাইলে উল্টো ধমক দেন। দোকানিদের অভিযোগ, নিচের পদমর্যাদার পুলিশ সদস্যদের জন্য বিভিন্ন সাইজের পোশাক সংশ্লিষ্ট ইউনিট আগেই বানিয়ে রাখে। কারও সাইজে না হলে তখন কেউ কেউ শার্ট, বুট নিয়ে আসে। কেউ সাইজ পরিবর্তন করে নেয় এবং কেউ কেউ বিক্রি করে দিতে চায়। আবার অনেক সদস্য দুই/তিনটা শার্টও বানায়। জিজ্ঞেস করলে জানায়, আরেকটি তার সহকর্মীর জন্য।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকানি জানান, তিনি ইসলামপুর থেকে পুলিশের পোশাকের কাপড় কিনে আনেন। অথচ এ কাপড় খোলা বাজারে পাওয়ার কথা নয়। শুধু পুলিশ সদর দপ্তরের লজিস্টিক শাখা টেন্ডারপ্রাপ্ত টেইলার্সকে এ কাপড় সাপ্লাই দেয়। কিন্তু অর্ডার করলে হুবহু রঙের কাপড় বানিয়ে দেন ইসলামপুরের কিছু ব্যবসায়ী। আবার জেলা পর্যায়েও পুলিশের পোশাক বিক্রি করা হয়।
সংশ্লিষ্ট দোকান মালিক সমিতির একাধিক নেতা জানিয়েছেন, পুলিশ সদর দপ্তরের লজিস্টিক শাখার কর্মকর্তারা কেবল সমিতির নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেই দায় সারছেন। এ ছাড়া কোনো দোকানে অবৈধ কাপড় রয়েছে কিনা, নিয়মের বাইরে গিয়ে পোশাক-সরঞ্জামাদি বিক্রি করছে কিনা, এ বিষয়ে তাদের মনিটরিং নেই। কেবল কোনো ঘটনা ঘটলে ডিবি, থানা পুলিশ অভিযান চালায়।
ভুয়া র্যাব ও আসল র্যাব চেনার উপায় সম্পর্কে জানতে চাইলে র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, প্রথমত, আমরা অভিযানে গেলে প্রত্যেক সদস্যের র্যাবের কটি থাকে। দ্বিতীয়ত, সদস্যদের কাছে র্যাবের মনোগ্রামযুক্ত আইডি কার্ড থাকে। এ ছাড়া সব সদস্যকে বলা আছে, অভিযানে কেউ পরিচয় জানতে চাইলে সঠিক পরিচয় উপস্থাপন করতে হবে।
কয়েকটি ঘটনা : গত ৯ ফেব্রুয়ারি উত্তরার ৬ নম্বর সেক্টরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক থেকে তিন ডাকাত সদস্যকে র্যাবের আইডি কার্ড, জ্যাকেট, ওয়াকিটকি সেট, হ্যান্ডকাফসহ যৌথ বাহিনী গ্রেপ্তার করে। তারা রাজধানীর একটি মার্কেট থেকে র্যাবের পোশাক বানিয়েছেন বলে জানায়। ২২ জানুয়ারি ডিবি পরিচয়ে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে হ্যান্ডকাফ ও অন্যান্য সরঞ্জামাদিসহ ডাকাতচক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা জেলা গোয়েন্দা শাখা (দক্ষিণ)। ২৮ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ভালুকায় ডিবি পরিচয়ে রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে ১৪ টন রড ছিনতাই করে একটি চক্র। ২৪ এপ্রিল কোটালীপাড়ায় ডিবি পরিচয়ে ডাকাতির চেষ্টাকালে দুজনকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন স্থানীয়রা। তাদের কাছ থেকে র্যাবের পোশাক ও হ্যান্ডকাফ উদ্ধার করা হয়। গত ১ মে ডেমরা থেকে ডাকাতচক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। তাদের কাছ থেকে অস্ত্র-গুলিসহ র্যাবের জ্যাকেট, হ্যান্ডকাফ, ওয়াকিটকি সেট উদ্ধার করা হয়। সবশেষ গত মঙ্গলবার ভোরে নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে ডিবি পরিচয়ে মালয়েশিয়াপ্রবাসী মো. আব্দুল মালেককে মারধর করে সাড়ে আট ভরি স্বর্ণ ছিনিয়ে নেয় ৭-৮ দুর্বৃত্ত।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com