আগামী প্রজন্ম ডেস্ক:
রাজধানীর খিলগাঁও ভোজনরসিকদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। এখানে মানসম্মত যে কয়েকটি খাবার দোকান রয়েছে তার মধ্যে ‘সিরাজ চুই গোস্ত রেস্টুরেন্ট’ অন্যতম। চুই গোস্ত ছাড়াও তাদের অন্যতম আকর্ষণ ‘খিরসা ঘি’। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা তো বটেই ঢাকার বাইরে থেকেও অনেকে ছুটে আসেন এই ঘিয়ের স্বাদ নিতে। খাবারের সঙ্গে অল্প পরিমাণ ঘি যেন স্বাদ বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ।
গত শুক্রবার গাজীপুর থেকে আশরাফুল ইসলামসহ তার বন্ধুবান্ধবরা এসেছিলেন এই রেস্টুরেন্টে। খাবারের সঙ্গে খিরসা ঘি-ও খেয়েছেন। কিন্তু তারা জানতেনই না এই ঘি কী দিয়ে তৈরি হয়েছে। আলাপকালে আশরাফুল ইসলাম জানান, চার বন্ধু মিলে ছুটির দিন থাকায় ঢাকায় আসেন, প্রয়োজনীয় একটি কাজ সারার পর উল্লিখিত রেস্টুরেন্টের ঐতিহ্যবাহী খাবারও খেয়েছেন। তাদের বিশ্বাস এটি খাঁটি ঘি ছিল।
শুধু আশরাফুল নন, এমন শত শত গ্রাহক প্রতিদিন এই রেস্টুরেন্টের ঘি খাচ্ছেন। অথচ তারা জানেনই না এই ঘিতে নেই দুগ্ধজাতীয় কোনো পণ্যের অস্তিত্ব। সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক কামরুল হাসান বাদী হয়ে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে একটি মামলা করেছেন। মামলার আগে সংস্থাটির জনস্বাস্থ্য খাদ্য পরীক্ষাগারে এই ঘিয়ের ভৌত ও রাসায়নিক পরীক্ষা করা হয়। এই পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে গত ৭ মে একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করে ডিএসসিসির জনস্বাস্থ্য খাদ্য পরীক্ষাগার।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, এই ঘিতে দুগ্ধ চর্বির কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। অথচ ঘিতে দুগ্ধ চর্বির ন্যূনতম মান ৯৯ দশমিক ৭০ শতাংশ থাকার কথা। আয়োডিনের নির্ধারিত মান (২৫-৩৫) এই ঘিতে ছিল ৫৭ দশমিক ১২। অমøতা থাকার কথা ছিল ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ, পাওয়া গেছে শূন্য দশমিক ৮৫ শতাংশ। অন্যান্য উপাদানও নির্ধারিত মানে না পাওয়ায় আইন অনুযায়ী মামলা করা হয়েছে। এই মামলায় প্রতিষ্ঠানটির মালিকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরওয়ানা জারি হয়েছে।
জানতে চাইলে ডিএসসিসির জনস্বাস্থ্য পরীক্ষাগারের খাদ্য বিশ্লেষক ইলিয়াস জাহেদী বলেন, এই ঘি পুরোটাই পাম ওয়েল দিয়ে তৈরি। পামওয়েলের সঙ্গে সুগন্ধি মিশিয়ে এটি তৈরি করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, পামওয়েল জাল দিলে ঘিয়ের রঙ হয়, আবার রঙও মেশাানো হয়। আমরা এগুলো এখনো পরীক্ষা শেষ করিনি। শুধু ভেজাল নির্ণয় করেছি।
তবে সিরাজ চুইজালের মো. সিরাজুল ইসলাম দাবি করেছেন, এই রিপোর্ট একতরফা। পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে এটি করা হয়ে থাকতে পারে। তাই সিটি করপোরেশনের রেখে যাওয়া নমুনা তিনি আবার ল্যাবে পরীক্ষা করবেন।
আলাপকালে সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের এই রিপোর্টটি নিয়ে আমি কনফিউসড। আমরা যে প্রতিষ্ঠান থেকে ঘি নিয়ে আসি এটি বিএসটিআই অনুমোদিত। বিএসটিআই সিল দেওয়া ছিল, আমরা তাদের কারখানা পরিদর্শন করেছি, তারপর পণ্য কিনেছি। আমরা তো সঙ্গে মেশিন নিয়ে ঘুরে পণ্য কিনতে পারব না, পণ্য কিনেছি বিএসটিআইয়ের সিল দেখে।’
শুধু এই খিরসা ঘি নয়, এমন অনেক লোভনীয় পণ্যের মান রক্ষা করা হচ্ছে না। নজরদারি না থাকায় বিষাক্ত উপাদান দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে নানারকম ঐতিহ্যবাহী খাবারও। চটকদার নানা কথার ফাঁদে ফেলে ভোক্তাদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে মৃত্যুর দিকে। না জেনে বিষ খাচ্ছে মানুষ। আর এতে শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত সব বয়সী মানুষ ক্যানসারসহ নানা ধরনের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।
যেমন কোমল পানীয় না পান করে অনেকেই হোম মেইড বোরহানি, টক বা মিষ্টি দই বেছে নিচ্ছেন। নামকরা ব্র্যান্ডের দোকানগুলোতেও ফাস্টফুডের পরিবর্তে হোম মেইড পণ্যে ক্রেতার আগ্রহ বেশি দেখা যায়। নিরাপদ খাদ্য মনে করে নিজেদের তৈরি বলে প্রচার করা ঘি বা টমেটো সস্সহ নানা পণ্যে আকৃষ্ট হচ্ছেন ভোজনরসিক মানুষ। একটু স্বাস্থ্য নিরাপত্তার আশায় শিশুদের জন্য নামকরা ব্র্যান্ডের দোকান থেকে বেশি দামে কিনে নিচ্ছেন পাউরুটি, চকোলেট কিংবা গুঁড়া দুধের মতো পণ্য।
ঢাকায় বিরিয়ানির যে কয়েকটি বিখ্যাত বা জনপ্রিয় ব্র্যান্ড আছে হানিফ বিরিয়ানি তার মধ্যে অন্যতম। এখানে বিরিয়ানির সঙ্গে এক গ্লাস বোরহানি না খেলে অনেকেই অতৃপ্ত থেকে যান। রবিবার দুপুরে হানিফ বিরিয়ানির মতিঝিল শাখার সামনে কথা হয় শারমিন আক্তার নামের এক সরকারি চাকরিজীবীর সঙ্গে। বিরিয়ানি কিনতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন তিনি। আলাপকালে জানান, বাসায় মেহমান এসেছে, তাই ছুটি নিয়ে আগে চলে যাচ্ছেন। হানিফের বিরিয়ানি আর বোরহানি কিনে নিয়ে বাসায় গিয়ে একসঙ্গে দুপুরের খাবার খাবেন। কোমল পানীয় না নিয়ে বোরহানি নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোমল পানীয়ের চেয়ে বোরহানির স্বাদ আলাদা। তাছাড়া এটা যেহেতু নিজেরা কেমিক্যাল ছাড়া তৈরি করে নিশ্চয়ই ভালো হবে।
এমন বিশ্বাসেই হাজার হাজার মানুষ বোরহানি পান করছেন। তবে হানিফ বিরিয়ানিসহ নামিদামি অনেক ব্র্যান্ডের দোকানের বোরহানিতে মানহীন উপাদান পেয়েছেন খাদ্য বিশ্লেষকরা। সম্প্রতি হানিফ বিরিয়ানির মতিঝিল শাখার ‘শাহী বোরহানি’র নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে ডিএসসিসির জনস্বাস্থ্য খাদ্য পরীক্ষাগার। যেখানে দুগ্ধ প্রোটিন ছিল মাত্র ১ দশমিক ৭১ শতাংশ। যার নির্ধারিত মান ২ দশমিক ৭১ শতাংশ। ১০ শতাংশ দুগ্ধ চর্বির জায়াগায় পাওয়া গেছে মাত্র ২ দশমিক ১১ শতাংশ। রাসায়নিক পরীক্ষায় মানহীন প্রমাণিত হওয়ায় নিরাপদ খাদ্য আদালতে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
এই মামলায় বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে হাজির হয়ে নিজেদের দোষ স্বীকার করে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর প্রেক্ষিতে ভেজাল বোরহানির বিক্রির দায়ে হানিফ বিরিয়ানির মালিককে ৬ লাখ টাকা জরিমানা করেছে আদালত। গত রবিবার যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নুসরাত সাহারা বীথি এ জরিমানার আদেশ দেন।
একইভাবে পুরানা পল্টনের আদি নান্না বিরিয়ানির বোরহানিতে দুগ্ধ প্রোটিন ছিল মাত্র ১ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং দুগ্ধ চর্বি পাওয়া গেছে ২ দশমিক ৩৫ শতাংশ। খিলগাঁওয়ে সিরাজ চুই গোস্ত রেস্টুরেন্টের বোরহানিতে ১ দশমিক ৮৯ দুগ্ধ প্রোটিন এবং ২ দশমিক ৪৭ শতাংশ দুগ্ধ চর্বি পাওয়া গেছে। রাসায়নিক পরীক্ষার পর প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ এর বিভিন্ন ধারায় মামলা করা হয়েছে।
পাউরুটিতে ক্যানসারের উপাদান
ফুটপাতের চায়ের দোকান কিংবা পাঁচতরকা হোটেল, বস্তিবাসী অথবা উচ্চবিত্ত সবার নিত্যদিনের নাশতায় পাউরুটি খুব জনপ্রিয়। এই জনপ্রিয় পাউরুটিতে ক্যানসার সৃষ্টিকারী পটাশিয়াম ব্রোমেট ব্যবহার করা হচ্ছে। সম্প্রতি দুটি প্রতিষ্ঠানের তৈরি করা নিষিদ্ধ এ রাসায়নিক ব্যবহারের প্রমাণ পেয়েছে ডিএসসিসির জনস্বাস্থ্য খাদ্য পরীক্ষাগার। এর দায়ে খিলাগাঁওয়ের ‘নিউ আমাদের বাজার’ এবং ‘আইডিয়াল স্পেশাল ব্রেড (ইনস্ট্যান্ট)’ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে মামলা হয়েছে।
গত ৩০ এপ্রিল জনস্বাস্থ্য খাদ্য পরীক্ষাগারের প্রস্তুত করা এক সনদে এই পাউরুটিতে পটাশিয়াম ব্রোমেটের উপস্থিতি পান খাদ্য বিশ্লেষকরা। এরপর প্রস্তুতকারক এবং বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে মামলা করেন ডিএসসিসির নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক ও প্রসিকিউটিং অফিসার কামরুল হাসান।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পটাশিয়াম ব্রোমেট কসমেটিকসের উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পাউরুটি নরম করার জন্যই এই পটাশিয়াম ব্রোমেট ব্যবহার করা হয়েছে। এর ক্ষতিকারক তীব্রতার কারণে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রুটি, পাউরুটি ও বেকারি পণ্যে পটাশিয়াম ব্রোমেট ও পটাশিয়াম আয়োডেট ব্যবহার বন্ধের নির্দেশ দিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়াধীন নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে একাধিকবার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকও করেছে সরকার।
সরকারের ওই বিজ্ঞপ্তিতে এই রাসায়নিকটির ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে বলা হয়, এটি থাইরয়েড গ্রন্থির রোগ সৃষ্টি করে, একটি ঈষধংং ২ই পধৎপরহড়মবহ যা ক্যানসার সৃষ্টি করে, একটি এবহড়ঃড়ীরপ ঈধৎপরহড়মবহ যা জীনগত রোগ ও মিউটেশন ঘটাতে পারে। তাছাড়া ডায়রিয়া, বমিভাব, পেটের পীড়াসহ অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
আলাপকালে নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক কামরুল হাসান বলেন, পাড়া মহল্লায় বেকারিগুলো মান নিয়ন্ত্রণ করে না। এখানে প্রশিক্ষিত জনবল নেই বললেই চলে। কোন উপাদান কি পরিমাণ ব্যবহার করতে হবে তাও জানে না কর্মচারীরা। ফলে আন্দাজে এসব ব্যবহার করছে এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। জনস্বাস্থ্য খাদ্য পরীক্ষাগারের বিশ্লেষক ইলিয়াস জিহাদী বলেন, পটাশিয়াম ব্রোমেট খেলে ক্যানসার হতে পারে, ডিএনএর ক্ষতি হতে পারে।
দইয়ে দুগ্ধ প্রোটিন ২ শতাংশ!
বাজারজাত করা দইয়ে অন্তত ১৫ শতাংশ দুগ্ধ চর্বি থাকার কথা রয়েছে। অথচ মতিঝিলের মিথিলা ফার্মেড মিল্ক নামক প্রতিষ্ঠানের দইয়ের পরিমাণ ২ দশমিক ১৯ শতাংশ পাওয়া গেছে। ২ দশমিক ৭ শতাংশ দুগ্ধ প্রোটিন থাকার কথা, পাওয়া গেছে মাত্র ১ দশমিক ৪৯ শতাংশ। গত ১৯ এপ্রিল ডিএসসিসি জনস্বাস্থ্য খাদ্য পরীক্ষাগারের প্রস্তুত করা এক সনদে এমন তথ্য দেখা গেছে। গত ১৫ এপ্রিল মুগদাপাড়ার সরষে ইলিশ রেস্তোরাঁ থেকে এই দই সংগ্রহ করে ডিএসসিসির খাদ্য পরিদর্শকরা। তাছাড়া চাইনিজ রেস্টুরেন্টে বিষাক্ত রঙ এবং মানহীন টমেটো সস্ ব্যবহারের প্রমাণ পেয়েছে জনস্বাস্থ্য পরীক্ষাগারের বিশ্লেষকরা। এর আগে শিশুদের গুঁড়া দুধ ও কিটকাট চকোলেটসহ বিভিন্ন পণ্যে ক্ষতিকর উপাদান পান খাদ্য পরিদর্শকরা।
শুধু এই কয়েকটি প্রতিষ্ঠানই নয়, সারা দেশে এমন অসংখ্য প্রতিষ্ঠানই জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য নিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে দায়সারা মোবাইল কোর্ট বা মামলা করেই কার্যক্রম শেষ করা হচ্ছে।
খাদ্য পরিদর্শকরা বলছেন, অশিক্ষিত ও প্রশিক্ষণ ছাড়া সস্তা শ্রমিক দিয়ে খাদ্য প্রস্তুত করা হয়। জনবলের অভাবে অনেক এলাকা পরিদর্শনের আওতায় আসে না। অনেক প্রতিষ্ঠানকে তিন চার বার সতর্ক করার পরও তারা আবার একই অপরাধ করছে। এক্ষেত্রে আইনের আরও কঠোর প্রয়োগ জরুরি।
তবে এই কার্যক্রমের ফলে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। অনেকেই ক্ষতিকর রঙ ব্যবহার বাদ দিয়েছেন। যাদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে, তাদের প্রায় ৬০ শতাংশ নিজেদের দোষ স্বীকার করছেন। এতে তাদের মধ্যে এক ধরনের সচেতনতা তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, আমরা সারা দেশ থেকে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের নমুনা সংগ্রহ করি। এরপর সায়েন্স ল্যাবে টেস্ট করা হয়। খাদ্য মানসম্মত না হলে অনেক সময় মোবাইল কোর্টে জরিমানা করা হয়। সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়। এরপরও সমাধান না হলে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে মামলা করি। তাছাড়া খাদ্য প্রস্তুতকারকদের বোঝানোর জন্য ওয়ার্কশপ ও সেমিনার করা হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
ভেজাল খাদ্য উৎপাদন ও বিপণনকারীদের শাস্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের সামনে স্টিকার লাগিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা এবং জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক। খাদ্যে ক্ষতিকর উপাদান, জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি এবং সরকারি সংস্থাগুলোর তৎপরতা নিয়ে দেশ রূপান্তরকে তিনি এসব কথা বলেন। তাছাড়া হামে অধিক শিশু আক্রান্তেও ভেজাল খাদ্যের দায় রয়েছে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।
অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, খাদ্য গ্রহণের আগে সেটা ভেজালমুক্ত এবং তা খাওয়ার উপযোগী কি না গুরুত্ব দিতে হবে। এই সিদ্ধান্ত সরকার দেবে না, এই সিদ্ধান্ত ভোক্তাকেই নিতে হবে। আবার মানুষ তো খাদ্য পরীক্ষা করতে পারে না, তাহলে করণীয় কী? এ ক্ষেত্রে ভেজাল খাদ্য উৎপাদন ও বিপণনকারীর শাস্তির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের সামনে স্টিকার লাগিয়ে দিতে হবে। যে স্টিকারে লেখা থাকবে ‘এই প্রতিষ্ঠানে ভেজাল খাদ্য পাওয়া গেছে’। দোকানে স্টিকার লাগিয়ে দিলে মানুষ যেমন সচেতন হবে, বিক্রেতারাও সতর্ক হয়ে যাবে। কেউ চাইবে না তার দোকানে এমন স্টিকার লাগুক। এমন স্টিকার লাগানো হলে স্বাভাবিকভাবেই ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নেবেন।
তিনি বলেন, ভেজাল খাদ্যের ব্যাপারে আমাদের যে আইন আছে, তা পরিবর্তন করতে হবে। শুধু জরিমানাতে এই ভেজাল দূর হবে না। খাদ্যে যারা ভেজাল দেন, তাদের অনেক টাকা। এই টাকা জরিমানা করলে তাদের কিছু হবে না। চীনের একটি উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, চীনে শিশুদের গুঁড়া দুধে ভেজাল পাওয়ায় জড়িত সবার মৃত্যুদ- হয়েছিল। আমাদের সেই পথে হাঁটতে হবে।
ভেজাল খাদ্য ও ওষুধ উৎপাদনকারীদের কোনো ছাড় না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে শুধু ঢাকাতে অভিযান চালালে হবে না, একযোগে সারা দেশে অভিযান চালাতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেছেন, খাদ্যে ভেজাল বা জীবাণু থাকলে নিশ্চিত মানবদেহের ক্ষতি করবে। খাদ্যে কোনো ধরনের ক্ষতিকর দ্রব্য রাখা উচিত না। সরকারকে এ বিষয়ে কঠোর হতে হবে। এ ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেওয়া বা কারও প্রতি নমনীয় আচরণ কাম্য নয়। কারণ ভেজাল খাদ্য মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।
পাউরুটিতে পটাশিয়াম ব্রোমেট থাকার বিষয়ে ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, খাবার খেয়ে তো কেউ ক্যানসারের ঝুঁকি নিতে চাইবে না। তাই এ বিষয়ে ভোক্তাদেরও সতর্ক হতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে ভেজাল খাদ্য উৎপাদনকারীদের বিষয়ে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তিনি বলেন, পটাশিয়াম ব্রোমেট বয়স্ক ও শিশুদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, পামওয়েল কখনোই ঘিয়ের বিকল্প না। দুটোর দাম আকাশ-পাতাল পার্থক্য। পামওয়েল ভোজ্য তেল হলেও এটি কেউ ঘি হিসেবে খেতে চাইবে না। আর পামওয়েলকে ঘিয়ের ফ্লেভার বানাতে কী রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, তাও খতিয়ে দেখা দরকার। যারা ভেজাল খাদ্য তৈরি করছে তারা খাবার উপযোগী ফ্লেভার মেশাবে এটাও আশা করা যায় না।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com