প্রজন্ম ডেস্ক:
সাত বছর বয়সী শিশু সিরাজুল আল সামস। ছোট শরীরের এমন কোনো স্থান বাদ নেই, যেখানে আঘাতের চিহ্ন নেই। সামসকে প্রথমে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর পায়ের রগ কেটে, ছুরি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হয় পুরো শরীর। শরীরজুড়ে ১৭টি আঘাতের দাগ, যেন প্রতিটি ক্ষতচিহ্ন নীরবে বলে যাচ্ছে, কতটা নির্মমতার ভেতর দিয়ে শেষ হয়েছে ছোট্ট এই জীবন। পারিবারিক কোন্দলে সম্প্রতি দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে চাচাত ভাই আমানুর ইসলাম এভাবে হত্যা করে শিশুটিকে।
এত ছোট শিশুর সঙ্গে কার কী এমন শত্রুতা ছিল যে, তাকে হত্যা করা হলো? কেন খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করা হলো? সামসের এই বয়সে খেলার কথা, স্কুলব্যাগ কাঁধে স্বপ্ন নিয়ে ছুটে চলার কথা অথচ সাদা কাফনে কফিনের ভেতর আটকে গেল তার জীবন। শিশুদের নৃশংসভাবে হত্যার নজির শুধু এটাই নয়। গত মঙ্গলবারই রাজধানী ঢাকাতে হত্যা করা হয়েছে তিন শিশুকে। আর গত ১৬ মাসে হত্যার শিকার হয়েছে অন্তত ৫২৫ শিশু। এ সময় চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১ হাজার ২০১ শিশু। কখনো পাশবিকতার শিকার হয়ে, কখনো পারিবারিক দ্বন্দ্বের বলি হয়ে, আবার কখনো বড়দের হিংসা-বিদ্বেষের আগুনে পুড়ে থেমে যাচ্ছে ছোট ছোট প্রাণ। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বাস্তবতা শিশুরা নিরাপত্তা হারাচ্ছে পরিচিত মানুষের কাছেই; যাদের হাত ধরে বেড়ে ওঠার কথা, কখনো সেই হাতই হয়ে উঠছে মৃত্যুর কারণ।
সমাজবিজ্ঞানী ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন প্রজন্মকে আরও মানবিক গুণাবলির হতে হবে। শিশুহত্যা থামাতে শুধু আইন নয়; দরকার পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের একসঙ্গে দাঁড়ানো। কারণ, একটি শিশু হত্যার সঙ্গে হারিয়ে যায় ভবিষ্যতের একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, একজন শিল্পী, শিক্ষক, বিজ্ঞানী কিংবা শুধু একজন ভালো মানুষ হওয়ার সম্ভাবনা। আর তখন সমাজের বুকেও জমে থাকে এক অদৃশ্য প্রশ্ন, আমরা কি সত্যিই আমাদের শিশুদের নিরাপদ রাখতে পেরেছি?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ড. নেহাল করিম বলেন, ‘হিংস্রার বশবর্তী হয়ে শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে। একজন বয়স্ক লোককে হত্যা করতে অন্তত ২/৩ জনের দরকার হয়। আর একজন শিশুকে চাইলে একজনই হত্যা করতে পারে। অর্থাৎ দুর্বল হওয়ায় শিশুদের টার্গেট করে হত্যা করা হচ্ছে। তাছাড়া দেশে আইনের শাসন নেই, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সীমাবদ্ধতা রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব আছে। সবকিছু সিস্টেমের মধ্যে চললে শিশু হত্যাও কমে আসবে।’
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলেন, অপরাধীরা সবসময় দুর্বলকে টার্গেট করে। শিশুরা দুর্বল হওয়ায় লোভ ও স্বার্থের জন্য তাদের হত্যা করা হয়। আগে মুক্তিপণের জন্য অপহরণ ও প্রতিশোধ নিতে শিশুদের খুন করা হতো। ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও ছিল। এটি ঘটত বেশিরভাগ পরিচিতজন ও স্বজন দ্বারা। কয়েক বছর ধরে পারিবারিক কলহের জেরে বাবা-মার হাতেও সন্তান খুনের ঘটনা বাড়ছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এবং চলতি বছরের প্রথম চার মাসে অন্তত ৪২৫ শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে ধর্ষণের পর হত্যা, শারীরিক নির্যাতন, অপহরণ, আত্মহত্যা এবং বিস্ফোরণে মৃত্যু। এই সময়ে বলাৎকারের শিকার হয়েছে ৪৮ জন শিশু, এরমধ্যে ৩ জন বালক প্রাণ হারিয়েছে।
নৃশংসতার নিশানায় শিশুরা : সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল বাবা-মায়ের কোল, সেই প্রিয়জনই হয়ে উঠছে ঘাতক। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল, প্রতিশোধের নেশায় কিংবা হতাশা থেকে নিজের সন্তানকে খুন করতেও হাত কাঁপছে না। ২৩ জানুয়ারি বাগেরহাটের সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে ৯ মাসের সন্তানকে পানিতে চুবিয়ে হত্যার পর আত্মহত্যা করেন এক মা। স্বামী দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকায় ওই নারী হতাশা থেকে এমনটি করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ ও স্বজনরা। পারিবারিক কলহে গত ৯ মে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় নিজের তিন শিশুসন্তানসহ পাঁচজনকে হত্যা করেছে ফোরকান আলী। ‘বাচ্চার কান্না থামা, নাইলে মাইরা ফালামু’, এমন কথা বলেই মায়ের সামনে মুখ চেপে ধরে তিন মাসের শিশুকে হত্যা করেছে আরেক সৎবাবা। গত ১৭ এপ্রিল দারুস সালাম এলাকায় এই ঘটনায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
এ ছাড়াও মুক্তিপণ না পেয়ে হত্যা, মাদকাসক্ত ও বড়দের দ্বন্দ্বের বলি হচ্ছে শিশুরা। অপহরণের পর মুক্তিপণ না পেয়ে ২৫ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় বায়েজিদ নামে এক শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। নিহত শিশু ও ঘাতক একই ভাড়া বাড়িতে পাশাপাশি বসবাস করত। গত ১৮ মার্চ ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে মাদকের অর্থ সংগ্রহে মরিয়ম আক্তার (৪) নামে এক শিশুর গলায় থাকা রুপার একটি চেইন ছিনতাই করে মাদকাসক্ত ইয়াছিন মিয়া (১৬) ও আকাশ (১৫)। ছিনতাইকালে ইয়াছিন ও আকাশকে চিনে ফেলায় শ্বাসরোধে শিশু মরিয়মকে হত্যা করে বাড়ির পাশের একটি মাটির চুলার ভেতর লাশ ভরে রাখা হয়। শিশু মরিয়ম আক্তার একই গ্রামের মিজানুর রহমান ও রিমা আক্তার দম্পতির একমাত্র কন্যা।
গত ২৪ এপ্রিল ফরিদপুর বাখু-া আশ্রয়ণ প্রকল্পে সাত বছরের শিশু আইরিন আক্তার কবিতাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে হত্যা করে মাদকাসক্ত যুবক ইসরাফিল মৃধা। হত্যার পর শিশুটিকে পাশের বাড়ির শৌচাগারের সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে ফেলে দেওয়া হয়। গত ১১ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রামুতে মাদকের টাকার জন্য তিন বছরের শিশু ফাতেমাকে কুপিয়ে হত্যা করে তারই আপন চাচা নরুল হাকিম।
গত ৯ মে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় বাবার সঙ্গে অনলাইন জুয়ার টাকা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে ৯ বছর বয়সী শিশু আন্দালিব সাদমানকে অপহরণের পর হত্যা করে মরদেহ বস্তায় ভরে সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে লুকিয়ে রাখা হয়। ১৪ এপ্রিল চট্টগ্রামে সামান্য চা দিতে দেরি করায় মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে দুই মাসের কন্যাশিশু সাবরিনা জান্নাত মাহিরাকে মাটিতে আছাড় দিয়ে হত্যা করেছে বাবা ওসমান গণি।
সবশেষ গত মঙ্গলবার বিকেলে মিরপুরের একটি হাসপাতাল থেকে মোছা. মাইমুনা (১০) নামের এক গৃহকর্মীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, শিশুটি মারা গেলেও কাউকে জানায়নি গৃহকর্তা আইটি ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আবরার ফাইয়াজ ও তার স্ত্রী অ্যাডভোকেট মেহনাজ অনন্যা। পরে খবর পেয়ে লাশ উদ্ধার ও ওই দম্পতিকে আটক করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের কারণে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। ওইদিন রাতেই রামপুরা বনশ্রীর কোরআন ইন্টারন্যাশনাল হিফজ মাদ্রাসার টয়লেট থেকে ছাত্র আব্দুল্লাহর (১০) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরিবারের অভিযোগ, অব্দুল্লাহকে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশও বলছে, শিশুটির পায়ুপথ অস্বাভাবিক। বলাৎকার হওয়ার পর আত্মহত্যা করতে পারে শিশুটি। একই দিন পল্লবীতে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে। হত্যার আগে ধর্ষণের শিকার হয় শিশুটি। এরপর মাথা বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয় টয়লেটের বালতিতে। হিংসা-বিদ্বেষ কিংবা কোনো দ্বন্দ্ব থেকে নয়, শুধু প্রতিবেশী সোহেলের লালসার বলি হতে হয়েছে রামিসাকে। পুরো ঘটনার সময় সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না বাসায় থাকলেও স্বামীকে এহেন কাজে বিন্দুমাত্র বাধা দেননি। উল্টো স্বামীকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছেন বলে অভিযোগ ওঠেছে।
এমন নৃশংসভাবে হত্যা, শিশু হত্যা মনস্তাত্ত্বিক বিষয় হলেও এটি শ্রেফ অপরাধ, এমনটি বলছেন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, তারা (হত্যাকারীরা) অপরাধীই। পাশবিক প্রবৃত্তি জাগ্রত হলে মানুষের কাম, বাসনার ইচ্ছা জাগে। আবার সুপার ইগো মনকে স্বাভাবিক রাখে। কিন্তু যারা নৃশংস হত্যাকা- ঘটায় তাদের সুপার ইগো কাজ করে না, মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়ে সে অপরাধের দিকেই ধাবিত হয়। এসব রোধে পারিবারিক শিক্ষা বেশি দরকার। একই সঙ্গে মানবিক হতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধি ও সামাজিক-পারিবারিক ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বিচারব্যবস্থা দ্রুত করতে হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি, মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসেন বলেন, প্রতিটি হত্যার ঘটনা গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হয়। শিশুদের বিষয়টি তো আরও স্পর্শকাতর। এমন ঘটনায় যারাই জড়িত থাকুক, তাদের আইনের আওতায় আনা হয়। কঠোর বিচার যেন হয়, তাই দ্রুত চার্জশিট দেওয়া হয়। তার মতে, সামাজিক অস্থিরতা শিশু নির্যাতন ও হত্যার অন্যতম প্রধান কারণ।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com