প্রজন্ম ডেস্ক:
স্বস্তি মিলছে না রফতানি বাণিজ্যে। এমনিতেই রফতানি আয় কমছে ধারাবাহিকভাবে, তার ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক বাড়তি শুল্কের চোখ রাঙানো অস্বস্তি বাড়াচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে চুক্তির পর বাংলাদেশের ওপর ১৯ শতাংশ পাল্টা শুল্ক ধার্য করে ট্রাম্প প্রশাসন। এখন আবার ঘোষণা দিয়েছে জোরপূর্বক শ্রমের অপরাধে বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। এভাবে একের পর এক মার্কিন শুল্কের প্যাঁচে পড়ে দেশের রফতানি বাণিজ্যে শঙ্কা বাড়ছে, উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন রফতানিকারকরা।
চলতি অর্থবছরের টানা ৯ মাস পতনের পর এপ্রিলে ঘুরে দাঁড়ালেও গত মেতে এসে আবারও পড়ে গেছে তৈরি পোশাক খাতের রফতানি আয়। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, মে পর্যন্ত ১১ মাসে তৈরি পোশাক খাত থেকে মোট আয় এসেছে ৩ হাজার ৫১৩ কোটি ৩৪ লাখ ডলার। এর মধ্যে নিটওয়্যার খাত থেকে ১ হাজার ৮৭৮ কোটি ৩৬ লাখ ডলার এবং ওভেন গার্মেন্টস থেকে ১ হাজার ৬৫২ কোটি ৯৭ লাখ ডলার রফতানি হয়েছে। বছর ব্যবধানে রফতানি কমেছে ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ।
কমছে দেশের সার্বিক রফতানিও। এ সময়ে রফতানি হয়েছে ৪ হাজার ৩৭৯ কোটি ৯২ লাখ ডলারের পণ্য, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৪ হাজার ৪৯৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার। এমন চাপে রফতানি আয়ের মধ্যেই বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের ওপর নতুন শুল্কারোপের পরিকল্পনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন, যা নতুন করে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে রফতানিকারকদের কপালে।
অপরদিকে অটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) বাংলাদেশ ২০৪ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করেছে। এই রফতানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ কম। গত বছর এই বাজারে বাংলাদেশ ৮২০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করে। অন্যদিকে চীনের রফতানি প্রায় ৫৩ শতাংশ কমে গেছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশটি ১৭০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে দেশটি রফতানি করেছিল দ্বিগুণের বেশি অর্থাৎ ৩৬১ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, যুদ্ধসহ নানা রকম অনিশ্চয়তায় রফতানি আদেশ কমে গেছে। এই সিচুয়েশন চলতে থাকলে আসলে কী হবে, কোথায় কখন রফতানি আদেশগুলো প্লেস করবে, আবার কবে কোথায় কোন বিপদে পড়বে- এসব বিষয়ে বায়াররা শঙ্কিত হওয়ায় যথাযথভাবে তাদের যে পণ্য আমদানি করা দরকার তা করছে না।
তিনি বলেন, নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র যে শুল্কের ঘোষণা করেছে তা হচ্ছে একটা অজুহাত। মার্কিন উচ্চ আদালত ‘ইউনিভার্সাল বেসলাইন ট্যারিফ’কে আইনিভাবে অবৈধ বলে ঘোষণা দেওয়ার পর ট্যারিফ ইস্যুতে ভিন্ন পথে হাঁটে ট্রাম্প প্রশাসন। নানা ফন্দি ফিকির করে, কীভাবে কী করা যায়? ফোর্স লেবারকে অজুহাত হিসেবে সামনে আনা হয়েছে। সে ব্যাপারে আমি বলতে চাই, বাংলাদেশে কোনো অবস্থায় ফোর্স লেবার নেই।
বিকেএমইএ সভাপতি আরও বলেন, আগের রেসিপ্রোক্যাল শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে যখন মার্কিন উচ্চ আদালত স্থগিতাদেশ দিয়েছিল, তখন থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন অজুহাত খুঁজছিল নতুন আর কোন পন্থায় শুল্ক আরোপ করা যায়। তার আলোকেই তারা ফোর্স লেবারের অজুহাত তুলে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। আমি মনে করি এ ধরনের জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ একেবারে ভিত্তিহীন। আমাদের দেশে এই প্র্যাকটিস এখন আর নেই। তাই এই শুল্ক যদি বাস্তবায়ন করা হয় তা হলে সবার আগে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমাদের তৈরি পোশাক খাত। সুতরাং আমি মনে করি বর্তমান সরকারকে আগে থেকেই মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে এবং ওই শুল্ক যেন চূড়ান্তভাবে বাংলাদেশের ওপর আরোপ না করে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে মুখ্য ভূমিকা রাখতে হবে।
আর এ বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মার্কিন প্রশাসনের এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে উল্টো আরও ফোর্স লেবার বাড়তে পারে। তাই এই শুল্ক চূড়ান্ত হওয়ার আগে বাংলাদেশ সরকারকে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে মার্কিন প্রশাসনকে বোঝাতে হবে যে, বাংলাদেশের ওপর যেন ওই বাড়তি শুল্ক আরোপ না করা হয়। একই সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে করা আগের চুক্তি নিয়েও বাংলাদেশকে নতুন করে আলোচনা শুরু করা দরকার। কারণ বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে বেশ তাড়াহুড়া করে ওই চুক্তি করা হয়েছিল এবং অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারির চুক্তি অনুযায়ী আগের রেসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ ধার্য আছে ১৯ শতাংশ। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরও দশ শতাংশ শুল্ক। অর্থাৎ মার্কিন বাজারে পণ্য রফতানিতে মোট শুল্ক দাঁড়াবে ২৯ শতাংশ। এর ফলে দেশের রফতানি বাণিজ্যকে চাপে ফেলবে এবং বাজার হারানোর শঙ্কা দেখা দেবে। যদিও এই শুল্ক এখনই কার্যকর হচ্ছে না। আগামী ৬ জুলাই এর ওপর জনমত যাচাই করবে মার্কিন প্রশাসন, আর ৭ জুলাই এর ওপর গণশুনানি করবে ইউএসটিআর। এরপরই বর্ধিত ওই শুল্ক আরোপের বিষয়টি চূড়ান্ত হতে পারে।
তৈরি পোশাক রফতানির একক শীর্ষ বাজার মার্কিন বাজারে আবারও বড় ধরছেন ধাক্কা খেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। জোরপূর্বক শ্রমের অজুহাত তুলে বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের ওপর ওই ১০ শতাংশ বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন প্রশাসন।
ট্রাম্প প্রশাসন সেকশন ৩০১ তদন্তের ভিত্তিতে প্রস্তাব দিয়েছে- বাংলাদেশ, ভারত, চীন, ইইউ, কানাডা, মেক্সিকো, পাকিস্তান, ভিয়েতনামসহ ৬০ দেশকে বাড়তি শুল্ক দিতে হবে। এর মধ্যে কানাডা, ইইউ, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, পাকিস্তানের মতো দেশগুলোকে তাদের পণ্যে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। বাকি ৪৫ দেশ যেমন চীন, ভারত, জাপান, ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোকে দিতে হবে ১২.৫ শতাংশ।
ফোর্সড লেবার ইস্যুতে নতুন এই ১০ শতাংশ শুল্ক বসলে বাংলাদেশের ক্ষতিটা হবে মূলত দুদিক দিয়ে। প্রথমত সরাসরি রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দ্বিতীয়ত বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পণ্যের অবস্থান নড়বড়ে হবে। কেননা এই শুল্কারোপের ফলে তৈরি পোশাক, চামড়া, মৎস্য খাতের মতো যেসব খাতে শ্রমঘন কাজ বেশি, সেগুলোর ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক বসার শঙ্কা সবচেয়ে বেশি। তা ছাড়া বাড়তি শুল্কের কারণে ওই দেশের ক্রেতারা অন্য বাজারের দিকে ঝুঁকবে। ফলে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রভাব কমবে।
অন্যান্য দেশের শুল্কহার কেমন
যুক্তরাষ্ট্রের আগের শুল্ক আরোপ ছিল বিভিন্ন দেশের জন্য বিভিন্ন হার। ভারতের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল, পরে তা কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়। বাংলাদেশের জন্য গড়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। গত ফেব্রুয়ারির চুক্তির পর ১৯ শতাংশ পাল্টা শুল্ক ধার্য করা হয়। এর সঙ্গে নতুন প্রস্তাবে জোরপূর্বক শ্রম ইস্যুতে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য দেশের মধ্যে চীনের ২০ শতাংশের সঙ্গে অতিরিক্ত ৩৪ শতাংশসহ মোট ৫৪ শতাংশ, ভিয়েতনামের ৪৬ শতাংশ, কম্বোডিয়ার ৪৯ শতাংশ, মিয়ানমারের ৪৪ শতাংশ, লাওসের আগের ১৭ শতাংশের পাশে অতিরিক্ত ৩৭ শতাংশসহ মোট ৫৪ শতাংশ, ব্রাজিলের ১৫ শতাংশ। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়।
পোশাকের দামও কমছে
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা গত মার্চে বৈশ্বিক বাজার থেকে পোশাক আমদানি মূল্য ২ দশমিক ৩১ শতাংশ কমিয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের পোশাকের দাম কমেছে ২ দশমিক ৭৭ শতাংশ। গত বছর মার্চে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের গড় মূল্য ছিল ২ ডলার ৯৪ সেন্ট প্রতি স্কয়ার মিটার, তবে চলতি বছরের মার্চে দাম কমে নেমে আসে ২ ডলার ৮৬ সেন্টে। শীর্ষে থাকা ভিয়েতনামের কমেছে ২ দশমিক ১৮ শতাংশ। প্রতি স্কয়ার মিটার ৩ ডলার ৩৬ সেন্ট থেকে কমে ৩ ডলার ২৯ সেন্টে নেমে এসেছে। সবচেয়ে বেশি কমেছে চীনের সাড়ে ২১ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ১১ শতাংশ।
শুল্ক ঝামেলায় বৈশ্বিক বাজার
গত বছরের ২ এপ্রিল বিশ্বের ১৫৭টি দেশের পণ্যে বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এটি ৯ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও পরে তিন মাসের জন্য স্থগিত হয়। এরপর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। শুরুতে বাংলাদেশি পণ্যে ৩৭ শতাংশ শুল্ক থাকলেও ৮ জুলাই সেটি কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করা হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছায় বাংলাদেশ। তাতে পাল্টা শুল্ক কমে ২০ শতাংশে দাঁড়ায়। গত ৭ আগস্ট পাল্টা শুল্ক কার্যকর হয়।
পাল্টা শুল্ক আরোপের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি করে গত ৯ ফেব্রুয়ারি। সে চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের ওপর দেশটির পাল্টা শুল্কের হার কমে হয় ১৯ শতাংশ। তবে ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওপর যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন তা মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করেছেন। তারপর সব দেশের পণ্যের ওপর ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার ঘোষণা দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com