প্রজন্ম ডেস্ক:
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে ভারত ও চীন প্রশ্নকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একটি পক্ষ মনে করছে, বিএনপি সরকারে এসে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে আরেক পক্ষের মতে, জামায়াত ও এনসিপি ভারতের বিরুদ্ধে অতিরঞ্জিত অবস্থান নিয়ে এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করছে, যা শেষ পর্যন্ত ভারতের অভ্যন্তরীণ হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকেই শক্তিশালী করতে পারে।
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হঠাৎ করে জুলাই অভ্যুত্থানকে বিতর্কিত করার মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্মকাণ্ডকে ন্যায্যতা দেওয়ার একটি সুসংগঠিত প্রচেষ্টা চলছে।
আবার একপক্ষ আরেকপক্ষকে ‘ভারতপন্থী’ বলে যে ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরি হচ্ছে তাতে ভারতীয় প্রভাব বাড়া ছাড়া কমছে না। ফলে এই ধরনের ন্যারেটিভ তৈরি করতে ভারত জামায়াত-এনসিপিকে বা বিএনপিকে কৌশলে কাজে লাগাচ্ছে কি না বা তারা নিজেরাই ব্যবহৃত হচ্ছে কি না সেই প্রশ্নও দেখা দিয়েছে।
বিশেষ করে একদিকে পলাশবাড়ীতে মন্দির নির্মাণ, ঢাকাসহ কিছু জায়গায় মন্দিরের পক্ষে-বিপক্ষে মিছিল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হিন্দুত্ববাদবিরোধী এবং হিন্দুত্ববাদী শত শত পোস্ট এবং জামায়াত-এনসিপির প্রকাশ্য ভারতবিরোধী রাজনীতি, অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিএনপি সরকারকে ‘ভারতপন্থী’ ট্যাগ দেয়ার চেষ্টা—এই দুই মেরুর টানাপোড়েনে বিএনপির মূল রাজনৈতিক অবস্থান কী, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারী মনে করেন, কৌশলের বিচারে বিএনপি এই মুহূর্তে এগিয়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ভারতের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক থাকবে? তিনি বলেছিলেন, ‘আমার দেশের জনগণ যদি চায়, তাহলে সুসম্পর্ক থাকবে’। এই উত্তরের মধ্যে একটি স্পষ্ট বার্তা আছে। আর তা হলো, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণ হবে বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে, নতজানু মনোভাব থেকে নয়।
নুরুল আমিন বেপারী বলেন, এই ন্যায্যতাভিত্তিক সম্পর্কের একটি বাস্তব উদাহরণ হলো তিস্তার পানি ইস্যু। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছিলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা কারও করুণার বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইনে বাংলাদেশের প্রাপ্য। ভারত পানির ন্যায্য হিস্যা না দিলে জাতিসংঘে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও তিনি দিয়েছিলেন। সরকারে আসার পরও সেই অবস্থান থেকে সরে না গিয়ে বরং তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়ে কারিগরি কমিটি সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এটি নতজানু নয়, বরং দর-কষাকষির কূটনীতির একটি উদাহরণ।
ড. বেপারী বলেন, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়া, আওয়ামী লীগের দোসরদের গ্রেপ্তার করে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা এবং তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প অব্যাহত থাকা—এই সিদ্ধান্তগুলো প্রমাণ করে, বিএনপি সরকার ভারতের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী চলছে না। ভারতের সঙ্গে নতজানু সম্পর্ক তৈরির ইচ্ছা থাকলে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার প্রশ্নই উঠতো না।
তিনি আরও বলেন, বিরোধী দলে থাকলে যেভাবে বিভিন্ন দেশ নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া যায়, সরকারে থাকলে সেভাবে দেওয়া যায় না। এটি কূটনীতির স্বাভাবিক নিয়ম। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার চীন ও ভারতের সঙ্গে ভারসাম্যের রাজনীতি করবে। চীনের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতার প্রমাণও মিলছে। বেইজিংয়ের আমন্ত্রণে শীঘ্রই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর হতে পারে। শেখ হাসিনার আমলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রথা ভেঙে তারেক রহমান তার আনুষ্ঠানিক বিদেশ সফরের জন্য ভারত নয়, চীনকে বেছে নিচ্ছেন। এই সিদ্ধান্তটিই একটি কৌশলগত বার্তা বহন করে।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, জামায়াত-এনসিপি যত অপ্রাসঙ্গিকভাবে ভারতবিরোধিতা করছে, ভারতে হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী তত শক্তিশালী হচ্ছে। সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে এর প্রতিফলন দেখা গেছে। সেই নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় ইস্যুর চেয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিই ছিল বেশি আলোচিত বিষয়। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নিপীড়নের কথিত ঘটনাবলী ভারতে বিজেপির নির্বাচনী বক্তব্যে কাঁচামাল সরবরাহ করেছে। প্রশ্ন হলো, জামায়াত-এনসিপির উগ্র ভারতবিরোধী অবস্থান কি তাহলে বিজেপিরই পরোক্ষ রাজনৈতিক ইন্ধন জোগাচ্ছে?
সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক সরদার ফরিদ আহমদ বলেন, শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ক্ষমতায় ছিলেন ২০২৪ সাল পর্যন্ত, আর ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে ২০১৪ সালে। বাংলাদেশের মানুষের ভারত বিরোধিতার কারণে কি তাহলে তখন বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে? তখন তো বাংলাদেশে ক্ষমতায়ই ছিল আওয়ামী লীগ। ভারতের আজ্ঞাবহ সরকার। ভারতের আগ্রাসী নীতি ও দাদাগিরির প্রতিবাদ করলে ভারতে বিজেপি শক্তিশালী হবে এই ধরনের ন্যারেটিভ যারা প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছেন তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ৯০ লাখ ভোটারকে ভোটই দিতে দেওয়া হয়নি। সেখানে কীভাবে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে সেটা সবাই জানেন।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির চেয়ে জামায়াত-এনসিপি বেশি মাত্রায় ভারতের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের পরিচয়কে সামনে রেখে বিএনপির ঐতিহাসিক জাতীয়তাবাদী ভোটব্যাংককে ধীরে ধীরে ধর্মভিত্তিক পরিচয়ের দিকে টেনে নেওয়া হচ্ছে, যা বিএনপির রাজনৈতিক ভিত দুর্বল করে দেওয়ার কৌশল হতে পারে। কেননা, এই জাতীয়তাবাদী ভোটাররাই দীর্ঘদিন বিএনপির সমর্থক হিসেবে ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক ড. রাশেদ আলম ভূঁইয়া তার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বলেন, জনমানসে একটি ধারণা তৈরি হচ্ছে যে বিএনপির রাজনীতি ভারতের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এই ধারণা সত্য হোক বা না হোক, এটি বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি করছে। বিভিন্ন ইস্যুতে বিএনপির মন্ত্রীদের বিরুদ্ধেও জনরোষ দেখা যাচ্ছে। কথার কথা, এর পেছনে জামায়াতও থাকতে পারে। এই পরিস্থিতিতে বিএনপির মূল ভোটব্যাংকের একটি অংশ জামায়াতের দিকে সরে যাচ্ছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
ড. রাশেদ আরও বলেন, এখন বিভিন্নভাবে ২৪-এর অভ্যুত্থানকে বিতর্কিত করা হচ্ছে। ২৪-এর অভ্যুত্থান যদি বিতর্কিত হয়, তাহলে আওয়ামী লীগ ধীরে ধীরে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে। আর আওয়ামী লীগ ফিরলে ভারত ও দেশটির আধিপত্যবিরোধী ভোট চলে যাবে জামায়াত-এনসিপির ঘরে। তখন মূল রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা হবে আওয়ামী লীগ বনাম জামায়াত-এনসিপি জোটের মধ্যে। ভারতের পুরো সমর্থনও তখন থাকবে তাদের ঐতিহাসিক মিত্র আওয়ামী লীগের প্রতি। তখন বিএনপি জাতীয় পার্টির মতো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। এই চিন্তাভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ১/১১-এর সক্রিয় কুশীলবরা সরকারের কাছে ঘেঁষছেন বলে যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেটি বিএনপির জন্য সত্যিকারের অশনিসংকেত। সরকারের মন্ত্রীদের কারও কারও বক্তব্য ও আচরণ প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও শক্তিশালী মনে হয়। দলের জন্য কার ওপর আস্থা রাখা যায়, সে বিচার না করতে পারলে ভেতর থেকেই দল দুর্বল হবে। এজন্য কারা বিএনপির বন্ধু, সেই বিবেচনায় সরকারের পদায়ন করা উচিত।
ইংল্যান্ডের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মো. ইমরান আহম্মেদ বলেন, বিএনপি ও জামায়াত-এনসিপি ফাঁদে পড়ছে কি না, সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেওয়ার সময় এখনো আসেনি। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত, জনগণ এখন দলীয় বক্তব্য নয়, কার্যকর শাসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইন-শৃঙ্খলা এবং গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন দেখতে চায়। বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের আদর্শিক অবস্থান পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা এবং একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ, পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখা।
তিনি বলেন, সব মিলিয়ে বলা যায়, ২৪-এর অভ্যুত্থানের চেতনা, জাতীয় স্বার্থ এবং সুশাসনের প্রতিশ্রুতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারলে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবে। ব্যর্থ হলে যে সংশয় তৈরি হচ্ছে, সেটি আরও গভীর হবে, আর সেই সুযোগটিই কাজে লাগাবে তাদের প্রতিপক্ষরা।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com