প্রজন্ম ডেস্ক:
তারেক রহমানকে রীতিমতো মাইনাস করার ষড়যন্ত্র হয়েছিল। ১২ বার রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল তাকে! শারীরিক নির্যাতনের মাত্রাটা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে তিনি আদৌ বেঁচে ফিরবেন কিনা, সেটা নিয়েও তৈরি হয়েছিল সংশয়! কিন্তু জুবাইদা রহমান আশা ছাড়লেন না।
১৪ বছরের জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে এক যুদ্ধ শুরু করলেন তিনি। স্বামীকে সুস্থ করতেই হবে! নিজে ছিলেন ডাক্তার।
১৯৯৫ সালে অনুষ্ঠিত বিসিএস পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে সরকারি চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর পুত্রবধূ হয়েও কোনো রাষ্ট্রীয় সুবিধা বা তদবিরের ধার ধারেননি।
নিজের চেষ্টা আর প্রজ্ঞা জড়িয়ে তারেক রহমানের পাশে ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিলেন জুবাইদা রহমান! তখনও কি ভাববার জো ছিল— এই তারেক রহমান আবার ফিরে আসবেন ফিনিক্স পাখির মতো? যেখানে তার বেঁচে থাকা নিয়েই ছিল সংশয়?
কিন্তু তারেক রহমান ফিরলেন! শুধু ফিরলেনই না, ভূমিধস জয় নিয়ে বসলেন প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে! আর স্পষ্ট করেই বললেন—‘সবার আগে বাংলাদেশ!’ তার সে কথার প্রমাণও পাচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ! ভারতের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলছে তার সরকার! নিজের প্রথম বিদেশ সফরে ভারতকে বাদ দিয়ে বেছে নিলেন মালয়েশিয়াকে! সেখানে গেলেন। এক রাজকীয় সংবর্ধনা দিলেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম! গানে গানে তারেক রহমানকে রীতিমতো আখ্যায়িত করলেন জাদুকর হিসেবে! হাবিব ওয়াহিদের গাওয়া—বাউল শাহ খোয়াজ মিয়ার ‘আমার বন্ধু মহা জাদু’ গানটি জুড়ে দিলেন নিজেদের ফুটেজে! রীতিমতো যেন মিউজিক ভিডিও! পাশে তখন ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ডা. জুবাইদা রহমান! তার সামনে তারেক রহমান মুগ্ধতা ছড়িয়েই যাচ্ছেন! তাকে নিয়ে রীতিমতো উৎসবে মাতলেন আনোয়ার ইব্রাহিম! যেন তারা আপন ভাই! নাচলেন-গাইলেন! আর প্রতিশ্রুতি এলো নানা বিষয়ে! বার্তা এলো—মালয়েশিয়া বাংলাদেশের পাশে আছে! এসব কিছু চোখের সামনে ঘটতে দেখে জুবাইদা রহমানের নিশ্চয়ই সেইসব দিনগুলোর কথা মনে পড়েছে—তারেক রহমান কাঁদছেন বাচ্চাদের মতো, বেগম জিয়া চোখের পানি ফেলছেন মুমূর্ষু ছেলের পাশে বসে!
মালয়েশিয়ার মাটিতে তারেক রহমান যে অভ্যর্থনা পেয়েছেন, সেটা স্রেফ প্রটোকলের ফুলের মালা ছিল না।
সোমবার (২২ জুন) সকালে পুত্রজায়ার পেরদানা পুত্রা ভবনে লাল গালিচায় হেঁটে তিনি যখন প্রবেশ করলেন, পাশে তখন স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান। আনোয়ার ইব্রাহিম নিজে ছুটে এসে অভ্যর্থনা জানালেন। প্রথমে একান্ত বৈঠক হলো দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে। তারপর ২৩ সদস্যের প্রতিনিধি দল নিয়ে হলো বিস্তৃত পর্যায়ের আলোচনা। আলোচনার টেবিলে যা এলো, তা নিছক কূটনৈতিক ভদ্রতার বিনিময় নয়—রীতিমতো দুইপক্ষের হিসাব-নিকাশ। সংস্কৃতি বিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক সই হলো। সন্ত্রাসবাদ দমনে গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি যৌথ দলিল বিনিময় হলো। বিনিয়োগ সংক্রান্ত আরও একটি দ্বিপাক্ষিক দলিলও সই হলো। আর সবচেয়ে বড় ঘোষণা এলো বাণিজ্য নিয়ে—তেত্রিশ দফার যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশ ঘোষণা দিল, ২০২৭ সালের মধ্যে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করা হবে। প্রবাসী শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করা, অনিবন্ধিত কর্মীদের বৈধতা আর আটক বাংলাদেশিদের প্রত্যাবাসন নিয়েও আলোচনা হলো টেবিলে। আর এসব ঘোষণার মাঝখানে তারেক রহমান নিজেই টেনে আনলেন উত্তরাধিকারের প্রসঙ্গ। তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯৭৯ সালের মালয়েশিয়া সফর যে রাজনৈতিক সম্পর্কের ভিত গড়েছিল, মা বেগম খালেদা জিয়ার ১৯৯৩ সালের সফর যে সেই সম্পর্ককে আরও গভীর করেছিল—তিনি যেন সেই ধারাবাহিকতাকেই আজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আইসিটি, জ্বালানি, অবকাঠামো, হালাল শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, ডিজিটাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর—প্রতিটা খাতেই বিনিয়োগের খোলা আমন্ত্রণ জানালেন তিনি।
মালয়েশিয়া অধ্যায় শেষ করেই ছুটলেন চীনে। দালিয়ান বিমানবন্দরে তাকে অভ্যর্থনা জানালেন লিয়াওনিং প্রদেশের ভাইস গভর্নর এবং চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত। সেখানে দুই দিন কাটিয়ে যোগ দেবেন বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সপ্তদশ বার্ষিক সম্মেলন—যা পরিচিত ‘সামার দাভোস’ নামে। তারপর ট্রেনে চেপে বেইজিংয়ের পথ ধরবেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের মূল কর্মসূচি শুরু হবে। বাংলাদেশ-চীন কূটনৈতিক সম্পর্কের সোনালি পঞ্চাশ বছরে প্রবেশের এই মুহূর্তে কর্মকর্তারা বলছেন, এই সফর নিছক রুটিন কূটনীতি নয়—এটি ভবিষ্যতের পথরেখা নির্ধারণের সফর। ২৫ জুন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আয়োজনে বিনিয়োগ ফোরামে চীনা ব্যবসায়ীদের সামনে দেশের সম্ভাবনা তুলে ধরবেন তিনি। আর ২৬ জুন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক সেরে সেদিনই ঢাকায় ফিরবেন।
এই সফরের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অধ্যায় কিন্তু প্রতিরক্ষা খাত নিয়ে। চীনের তৈরি চব্বিশটি জে-টেন সি-ই (J-10CE) মাল্টি-রোল যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা এই বেইজিং সফরই বড় ধরনের গতি পেয়েছে বলে সরকারের ভেতরের সূত্র জানিয়েছে। প্রতিটি যুদ্ধবিমানের আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছে চার কোটি ডলারের কাছাকাছি, আর আগস্টের মধ্যেই চুক্তি সইয়ের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে দুই পক্ষ। শুধু যুদ্ধবিমান নয়, মোংলায় আগে ভারতের জন্য বরাদ্দ থাকা একটি বিশেষ শিল্প পার্কের জমিও এখন সরাসরি চীনা বিনিয়োগের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে—সেই পুরোনো ভারতীয় সমঝোতা বাতিল করে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো মিলিয়ে চীন আর মালয়েশিয়ার সঙ্গে মোট পনেরো থেকে সতেরোটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সইয়ের লক্ষ্য স্থির করেছে বাংলাদেশ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই সফরে তিন বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন সহায়তা নিয়েও আলোচনা গড়াতে পারে। পররাষ্ট্র সচিব আগেই জানিয়েছিলেন, তিস্তা প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হতে পারে এই সফরে। অর্থাৎ একটামাত্র সফরেই প্রতিরক্ষা, অবকাঠামো, পানি আর বাণিজ্য—চারটি স্পর্শকাতর ক্ষেত্র একসঙ্গে নাড়াচাড়া হয়ে গেল।
তারেক রহমান কখনো সংসদ সদস্যও ছিলেন না। দীর্ঘ বছর কাটিয়েছেন প্রবাসে, লন্ডনে। ফলে তাকে নিয়ে সমালোচকদের প্রশ্ন ছিল স্পষ্ট—প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ছাড়া, কূটনৈতিক মঞ্চে দীর্ঘদিন না থেকে একজন মানুষ কীভাবে সামলাবেন প্রধানমন্ত্রীর পদের চাপ? কিন্তু প্রথম বিদেশ সফরেই যে প্রস্তুতি আর কূটনৈতিক পরিণতি তিনি দেখালেন, তাতে অনেকটা জবাব মিলে গেছে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। জিয়াউর রহমান যে কূটনীতির ভিত গড়েছিলেন ১৯৭৯ সালে, খালেদা জিয়া যে সম্পর্ককে পরিণত করেছিলেন তিনবারে—তারেক রহমান এখন সেই ধারাবাহিকতাকেই নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন। রক্ত যে আসলে কথা বলে—সেটার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে আরেকবার!
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com