প্রজন্ম ডেস্ক:
অনলাইন কেনাকাটা বা ই-কমার্স এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ; কিন্তু এই সুবিধার আড়ালেই জমজমাট হয়ে উঠেছে লাইসেন্সহীন পণ্যের অবাধ বেচাকেনা। দেশের শীর্ষস্থানীয় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম থেকে শুরু করে ফেসবুকের বিভিন্ন পেজ ও গ্রুপে এখন ভাসছে অনুমোদনহীন, নকল ও লাইসেন্সহীন বিদেশি পণ্য।
কসমেটিকস, ওষুধ, গ্যাজেট থেকে শুরু করে শিশুখাদ্য—সবকিছুই মিলছে অনলাইনে, যা বিপাকে ফেলছে বৈধ ব্যবসায়ীদেরও। পাশাপাশি এসব যাচাইবিহীন পণ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহবুবুল ইসলাম বলেন, ‘অনুমোদনহীন কসমেটিকসে ব্যবহার করা হচ্ছে ক্ষতিকারক পারদ, সিসা এবং নানা রকম নিষিদ্ধ রাসায়নিক। এর ফলে এসব ব্যবহার করে অসুস্থ হচ্ছে গ্রাহকরা। অনলাইন থেকে কেনা এসব অনুমোদনহীন ক্রিম বা সিরাম ব্যবহারের কারণে মানুষের ত্বকের স্থায়ী ক্ষতি হচ্ছে। এমনকি স্কিন ক্যান্সারের ঝুঁকিও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। অন্যদিকে লাইসেন্সবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ শিশুখাদ্য ও সাপ্লিমেন্ট শিশুদের লিভার ও কিডনির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করছে।’
বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, নামিদামি বিদেশি ব্র্যান্ডের লোগো ব্যবহার করে অত্যন্ত কম মূল্যে পণ্য বিক্রির অফার সারাক্ষণই দেওয়া হচ্ছে।
তালিকার শীর্ষে রয়েছে স্কিন কেয়ার, কসমেটিকস, জামাকাপড় এবং বিভিন্ন ওষুধ। বিএসটিআইয়ের কোনো রকম অনুমোদন ছাড়াই ‘আমদানীকৃত’ বা ‘১০০ শতাংশ অরিজিনাল’ ট্যাগ লাগিয়ে এসব পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। ভোক্তারা ফেসবুকের রিলস বা চটকদার ভিডিও বিজ্ঞাপন দেখে আকৃষ্ট হয়ে হয়ে অর্ডার করছে এবং পণ্য হাতে পেয়ে বুঝতে পারছে যে তারা প্রতারিত হয়েছে।
বাংলাদেশের ফেসবুক কমিউনিটির একটি পাবলিক গ্রুপ রয়েছে, যেটির নাম ‘ফ্রড অ্যালার্ট বিডি’। হাজার হাজার ফেসবুক আইডি থেকে এই গ্রুপে প্রতারক অনলাইন ব্যবসায়ীদের নিয়ে পোস্ট করা হয়, যাতে অন্যরা সতর্ক হতে পারে।
এই ফেসবুক গ্রুপে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫টি প্রতারণার অভিযোগ আসে। এ রকম ১০টি অভিযোগ খতিয়ে দেখা গেছে, তার মধ্যে চারটি অভিযোগ হচ্ছে কস্টমেটিকস পণ্যের, দুটি অভিযোগ খাদ্যপণ্যের ওপর, দুটি অভিযোগ জামাকাপড় নিয়ে এবং আরো দুটি অভিযোগ গ্যাজেট ও জুতা নিয়ে।
ভুক্তভোগীরা জানায়, প্রতারক ব্যবসায়ীরা পেইড প্রমোশন বা ফেক আইডি ব্যবহার করে পণ্যের পক্ষে শত শত ইতিবাচক রিভিউ তৈরি করেন। কপিরাইট লঙ্ঘন করে আসল ব্র্যান্ডের হুবহু নকল প্যাকেজিং তৈরি করেন। এতে অনলাইন ক্রেতারা বিভ্রান্ত হওয়ার কারণে পণ্য আসল না নকল তা ধরতে পারে না। এ ছাড়া বেশির ভাগ ফেসবুক পেজের কোনো স্থায়ী অফিস বা ট্রেড লাইসেন্স থাকে না। পণ্য বিক্রির পর কোনো সমস্যা হলে ক্রেতাকে অনলাইনে ব্লক করে দেয় এই চক্র। এ রকম একজন ভোক্তা বেসরকারি চাকরিজীবী শরীফ হোসেন বলেন, ‘দাম কম দেখে ট্রাস্ট ফুড নামের একটি অনলাইন পেজ থেকে ঘি অর্ডার করি। পরবর্তী সময়ে ঘি ব্যবহার করে দেখলাম যে এটা আসল নয়। এটা ওদের জানানোর পর ওরা আমাকে ব্লক করে দিয়েছে। শুধু অভিযান চালিয়ে এই প্রতারণা থামানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর কঠোর জবাবদিহি।’ তানহা সুলতানা নামের একজন শিক্ষার্থী জানান, তিনি একটি জার্সি অর্ডার করেন একটি ফেসবুক পেজ থেকে। কিন্তু তাঁকে যে কাপড়ের কথা বলা হয়েছে সেই কাপড় দেওয়া হয়নি। তিনি যখন এটার প্রতিবাদ করেন, তখন তাঁকে ফেসবুকে ব্লক করা হয়। এদিকে অনলাইনে লাইসেন্সহীন পণ্যের এই অবাধ বিক্রির কারণে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন দেশের বৈধ ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরা। একজন অনুমোদিত কসমেটিকস ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেন, ‘আমরা সরকারের সব নিয়ম মেনে ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি করে তা বিক্রি করি। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের খরচ বেশি পড়ে। অন্যদিকে যারা লাগেজ পার্টি, তারা পণ্য অবৈধভাবে এনে বিক্রি করে। তারা কর ফাঁকি দেয়, তাদের পণ্য নকলও। যার কারণে তারা অর্ধেক দামে বিক্রি করতে পারে। কম দাম দেখে অনেক ক্রেতা এদের ফাঁদে পড়ে। আমরা যেভাবে লোকসানে পড়ছি, তেমনি সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।’
আরেকজন ব্যবসায়ী সৈয়দ জামিন হায়দার অনলাইনে জার্সি বিক্রি করেন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘সারা পৃথিবী এখন ই-কমার্সের দিকে গেছে, কিন্তু বাংলাদেশে এখনো মানুষ এ খাতের ব্যবসায়ীদের পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না। সরকার যদি এসব অসাধু ব্যবসায়ীর ব্যাপারে কঠোর হয়, তাহলে মানুষ আরো বেশি অনলাইন ব্যবসায় ঝুঁকবে। তৈরি হবে নতুন উদ্যোক্তাও।’
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহবুবুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি প্রতারকদের বিরুদ্ধে।’ তিনি বলেন, ‘যেসব অনলাইন পেজের কোনো ঠিকানা নেই তাদের ধরতে বিএসটিআইয়ের একটা টিম আছে। এই টিম গোপনে কাজ করে, কখনো গ্রাহক সেজে পণ্য কিনে তারপর অভিযুক্তকে ট্রেস করে। আবার অনেক সময় এনএসআই আমাদের তথ্য দেয়। ঠিকানাবিহীন এসব পেজের মালিকদের ধরতে আমাদের সময় লাগে, কখনো কখনো এক মাসও লাগে। তবে অভিযোগ এলে বা আমাদের নজরে পড়লে আমরা যথাসম্ভব চেষ্টা করি এদের শাস্তির আওতায় আনতে।’
তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, অনলাইনে কেনাকাটার সময় শুধু কম দাম না দেখে বিক্রেতার ট্রেড লাইসেন্স আছে কি না, পণ্যে বিএসটিআইয়ের কিউআর কোড বা সিল আছে কি না তা যাচাই করে নিলে প্রতারণার শিকার হবে না গ্রাহকরা।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com