প্রজন্ম ডেস্ক:
চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা থামছেই না। এতে যাত্রীরা হারাচ্ছেন দৃষ্টিশক্তি, ভাঙছে হাড়, ঘটছে মৃত্যুও। রেলওয়ে পুলিশের দাবি, অধিকাংশ ঘটনায় জড়িত স্কুলপড়ুয়া শিশু-কিশোররা। তবে ট্রেনযাত্রায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে সড়কপথে যাত্রী বাড়াতে পরিবহন ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ লোক দিয়ে পাথর নিক্ষেপ করাচ্ছেন—এমন অভিযোগও পেয়েছে পুলিশ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সন্তানকে নিবৃত্ত করতে ব্যর্থ অভিভাবকদের আইনের আওতায় আনার বিষয়টিও ভাবছে রেলওয়ে পুলিশ।
রেলওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজি ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান বলেন, পাথর নিক্ষেপকে নিছক শিশুদের দুষ্টুমি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রথমবার কোনও শিশুকে ধরা হলে তার অভিভাবককে ডেকে মুচলেকা নেওয়া হবে। এরপরও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে অভিভাবকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হবে।
এক পাথরে অন্ধকার সাব্বিরের ভবিষ্যৎ
সর্বশেষ গত ২১ জুলাই সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া ও জামতৈল রেলস্টেশনের মধ্যবর্তী এলাকায় দ্রুতযান এক্সপ্রেসে ছোড়া পাথরে ডান চোখে গুরুতর আঘাত পান ২২ বছর বয়সী সাব্বির হোসেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার চোখের নিচের হাড় ভেঙে গেছে এবং দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। একটি পাথর এভাবেই অন্ধকার করে দিয়েছে এক তরুণ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ।
পঞ্চগড় থেকে ঢাকাগামী ট্রেনটির যাত্রী সাব্বির বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। ঘটনার পর তাকে কামারখন্দ উপজেলার জামতৈল রেলওয়ে স্টেশনে নামিয়ে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পরবর্তী সময়ে হাড়ের অস্ত্রোপচারের জন্য তাকে জাতীয় নাক, কান ও গলা ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে সাব্বিরের বাবা দুলাল হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, অস্ত্রোপচারের জন্য প্রায় দেড় লাখ টাকা প্রয়োজন। সন্তানের চোখের আলো হারানোর আশঙ্কার পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যয় নিয়েও এখন দিশেহারা পরিবারটি।
সাব্বিরের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। গত ৩ জুন শ্রীমঙ্গল থেকে ঢাকাগামী পারাবত এক্সপ্রেস ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাছাকাছি পৌঁছালে বাইরে থেকে ছোড়া পাথরে এক শিশু যাত্রী আহত হয়। পাথরটি তার পেটে আঘাত করে।
এর আগে ১৭ মে একই ট্রেনে পাথর নিক্ষেপে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক এম এ বি ছিদ্দিক মজুমদার কপালে আঘাত পান। অল্পের জন্য তার চোখ রক্ষা পায়।
গত ৩০ এপ্রিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শহরগামী শাটল ট্রেনে পাথর নিক্ষেপে লোকোমাস্টার মো. ওমর ফারুক মাথায় আঘাত পান। ২৭ এপ্রিল কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী কক্সবাজার এক্সপ্রেসে পাথর নিক্ষেপে আহত হন দুই যাত্রী। তাদের একজন মোহাম্মদ হিমেল আহমেদের চারটি দাঁত ভেঙে যায় এবং ঠোঁটের ভেতরের অংশ ফেটে যায়। অপর যাত্রী মোহাম্মদ আবু সাঈদ ঘাড়ে আঘাত পান।
পূর্ণাঙ্গ তথ্যভান্ডার নেই
চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা নিয়ে কোনও একক সংস্থার কাছে সুনির্দিষ্ট ও বছরভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তথ্যভান্ডার নেই। ফলে প্রকৃত ঘটনা, আহত ও নিহতের সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। রেলওয়ে সূত্রের হিসাবে, গত এক বছরে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় অর্ধশতাধিক যাত্রী আহত হয়েছেন। গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন সময়ে প্রায় দুই হাজার ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছে। এতে ট্রেনের দরজা-জানালা ভাঙার পাশাপাশি বহু যাত্রী গুরুতর আহত হয়েছেন। কোনও কোনও ঘটনায় মৃত্যুও হয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন সময়ের প্রতিবেদনে বছরে গড়ে ১৫০ থেকে ২০০টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়। সে হিসাবে গত ১০ বছরে এমন ঘটনার সংখ্যা দেড় হাজার থেকে দুই হাজারের কাছাকাছি হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত এক দশকে এসব ঘটনায় অন্তত ১০ থেকে ১২ জন যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন কয়েক শত মানুষ। কেউ কেউ স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি বা স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন।
তবে কেন্দ্রীয় ও যাচাই করা তথ্যভান্ডার না থাকায় এসব পরিসংখ্যান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিটি ঘটনা, স্থান, সময়, ক্ষয়ক্ষতি, মামলা ও অভিযুক্তদের তথ্য নিয়ে সমন্বিত ডেটাবেজ তৈরি না হলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হবে।
‘মূলত স্কুলপড়ুয়া শিশুরাই পাথর ছোড়ে’
রেলওয়ে পুলিশের প্রধান জিল্লুর রহমান বলেন, অধিকাংশ ঘটনায় কোনও পেশাদার অপরাধীকে পাওয়া যায় না। রেললাইনের পাশের এলাকার শিশু-কিশোররা খেলার ছলে ট্রেন লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ে।
তিনি আরও বলেন, ‘এতে যে একজন মানুষের চোখ নষ্ট হতে পারে, মাথায় গুরুতর আঘাত লাগতে পারে কিংবা মৃত্যু হতে পারে—এই পরিণতি তারা বোঝে না। সে জন্য রেলওয়ে স্টেশনের পাশের দোকান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় জনসমাগমের জায়গায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।’
রেলওয়ে পুলিশের সদস্যরা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার স্কুলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বোঝাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমেও প্রচার চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি কোনও শিশু-কিশোরকে পাথর নিক্ষেপের সময় হাতেনাতে আটক করা হলে তার বয়স বিবেচনায় অভিভাবককে থানায় ডেকে সতর্ক করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জিল্লুর রহমান বলেন, ১২ বছরের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ সীমিত। তাই তার অভিভাবককে ডেকে মুচলেকা নেওয়া এবং সন্তানকে নিবৃত্ত করার দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়া যেতে পারে। আবার ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে প্রচলিত শিশু আইন অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, “প্রথমবার অভিভাবককে সতর্ক করে বলা হবে—আপনার সন্তান পাথর নিক্ষেপ করেছে, তাকে বোঝানোর দায়িত্ব আপনার। এরপরও একই কাজ করলে অভিভাবকের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার।”
পরিবহন ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ
শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি কোনও কোনও পরিবহন ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধেও ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ করানোর অভিযোগ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন রেলওয়ে পুলিশের প্রধান। তবে এমন অভিযোগের সংখ্যা কম এবং প্রতিটি অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায় না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জিল্লুর রহমান বলেন, ‘অনেক সময় অভিযোগ আসে, ট্রেনে যাত্রী ওঠা কমাতে বা মানুষের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করতে পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত কেউ কেউ লোক দিয়ে পাথর নিক্ষেপ করায়। এতে মানুষ ট্রেন এড়িয়ে সড়কপথের পরিবহন ব্যবহার করবে—এমন উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তবে মূলত শিশু-কিশোরদের সম্পৃক্ততাই বেশি দেখা যায়।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। পরিবহন ব্যবসায়ীদের কোনও অংশ পরিকল্পিতভাবে জড়িত থাকলে সেটিকে নিছক পাথর নিক্ষেপ নয়, বরং যাত্রীদের জীবন বিপন্ন করে বাণিজ্যিক সুবিধা নেওয়ার সংঘবদ্ধ অপরাধ হিসেবে তদন্ত করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে গোয়েন্দা নজরদারি, স্থানীয় পরিবহন শ্রমিক ও মালিকদের তথ্য এবং ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
আতঙ্ক তৈরির কারণ খুঁজে বের করতে হবে
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক হাদিউজ্জামান মনে করেন, পাথর নিক্ষেপকে শুধু দুষ্টুমি বা সচেতনতার অভাব হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না।
তিনি বলেন, “কোনও গোষ্ঠী রেলকে অজনপ্রিয় করতে বা যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতে চাইছে কিনা, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হবে। পাথর নিক্ষেপের সরাসরি লাভ স্পষ্ট নয়। ডাকাতি বা নাশকতার সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলে কেন শুধু আতঙ্ক তৈরি করা হচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।”
তিনি ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথে নজরদারি বাড়ানো এবং ট্রেনের বাইরে দূরবর্তী দৃশ্য ধারণে সক্ষম ক্যামেরা বসানোর পরামর্শ দেন। এতে ঘটনার পর ভিডিও বিশ্লেষণ করে নিক্ষেপকারীকে শনাক্ত করা সহজ হতে পারে।
চিহ্নিত এলাকায় সচেতনতা কার্যক্রম
রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী ও রেলওয়ে পুলিশ স্কুল-কলেজ এবং মসজিদে সচেতনতামূলক প্রচার চালাচ্ছে। লিফলেট বিতরণের পাশাপাশি জুমার নামাজের আগে বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার জন্য স্থানীয়দের সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে। রেললাইনের আশপাশে দায়িত্বে থাকা কর্মীদেরও সন্দেহজনক চলাচল দেখলে দ্রুত পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনীকে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রয়োজনের অর্ধেক পুলিশ
দেশে প্রায় ৫০০ যাত্রীবাহী ট্রেন চললেও রেলওয়ে পুলিশ সব ট্রেনে নিরাপত্তা দিতে পারে না। একটি ট্রেনে ন্যূনতম একজন ইনচার্জ ও দুজন কনস্টেবলসহ তিনজন সদস্য প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান জনবল দিয়ে প্রায় অর্ধেক ট্রেনে পুলিশ মোতায়েন সম্ভব হচ্ছে।
রেলওয়ে পুলিশের প্রধান জিল্লুর রহমান জানান, রেলওয়ে পুলিশের জনবল প্রায় ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০। প্রয়োজন অন্তত ৫ হাজার সদস্য। এ কারণে আন্তনগর, গুরুত্বপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক রুটের ট্রেনগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। নতুন পুলিশ নিয়োগ সম্পন্ন হলে রেলওয়ে পুলিশ আরও প্রায় ৫০০ সদস্য পাওয়ার আশা করছে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com