প্রজন্ম ডেস্ক:
২৪ জুলাই রাতের কথা। জমি নিয়ে বিরোধের জেরে সেদিন প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে মৃত্যু হয় রাজশাহীর পবা উপজেলার ফরিদা পারভীনের।
থানায় করা মামলার নথি অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরেই তার পরিবারের সঙ্গে পরশ নামে এক ব্যক্তির জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলছিল। অভিযোগ উঠেছে, ওইদিন রাতে এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মারামারির একপর্যায়ে পরশ ছুরি দিয়ে আঘাত করেন ফরিদা পারভীনের গলায়। গুরুতর আহত ফরিদাকে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক জানান তার মৃত্যু ঘটেছে।
চলতি বছরের ১১ মার্চ নীলফামারীর ডোমারে জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে নিহত হন মজনু মিয়া, গুরুতর আহত হন আরও দুজন। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকালে পৌর এলাকার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ময়দানপাড়ার জমিতে শুকনো একটি গাছ কাটতে গেলে বাবলু, মজনু ও নুরুল হক কালুসহ তিন ভাইকে বাধা দেন প্রতিপক্ষ সাবেক কাউন্সিলর বেলাল হোসেন ও তার পরিবারের সদস্যরা। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। এতে তিনজন গুরুতর আহত হন। পরে স্বজনরা তাদের নিয়ে ডোমার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার আগেই মজনু মিয়ার মৃত্যু হয়।
শুধু এ দুটি ঘটনাই নয়। প্রায় প্রতিদিই রাজধানীসহ দেশের কোথাও-না কোথাও জমি সংক্রান্ত বিরোধে এ ধরনের হত্যা ও সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। এতে মানুষ যেমন হতাহত হচ্ছে, তেমনি থানায় পাল্টাপাল্টি মামলায় আদালতে বাড়ছে মামলাজট। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে বিরোধ মীমাংসা করা হলেও পরে তা আবার ভেস্তে যাচ্ছে। বছরের পর বছর মামলা চালাতে সর্বস্বান্ত হচ্ছে মামলা বাদী-বিবাদী।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী জায়গা-জমি, ফ্ল্যাট ও পাওনা টাকা উদ্ধারে পুলিশের সরাসরি হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ নেই। তবে এসব বিষয়ে যদি সংঘর্ষ বা হতাহতের ঘটনা ঘটে, তবে থানায় মামলা হওয়ার পর পুলিশ শুধু অপরাধের বিষয়টুকু তদন্ত করতে পারে। সেখানে হয়তো জায়গা-জমির বিরোধকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটার কথা আদালতকে জানিয়ে চার্জশিট দেওয়া হয়। তবে বিরোধ মীমাংসার বিষয়টি সম্পূর্ণ আদালতের এখতিয়ার। এ কারণে জায়গাজমি নিয়ে বিরোধে মামলার সংখ্যা বাড়ছে। তবে যদি কোনো ঘটনায় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেওয়ায় সেখানে বাড়তি ফোর্স মোতায়েন করা হয় এবং সংঘর্ষ ঘটে থাকে, তাহলে দুই পক্ষকেই পুলিশ আইনের আওতায় আনে।
আইন-বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি জমি সংক্রান্ত বিরোধ। দেশের বিভিন্ন আদালতে বর্তমানে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৪৫ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৩১ লাখই জমি সংক্রান্ত। অর্থাৎ মোট বিচারাধীন মামলার প্রায় ৭০ শতাংশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভূমিবিরোধ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামীণ এলাকায় দায়ের হওয়া দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশেরই মূল কারণ জমি। দীর্ঘসূত্রতা, জটিল ভূমিব্যবস্থাপনা এবং একাধিক সংস্থার অসামঞ্জস্যপূর্ণ রেকর্ডের কারণে বছরের পর বছর ধরে এসব মামলা চলতে থাকে। এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী নারী, ক্ষুদ্র কৃষক ও নিম্নআয়ের মানুষ।
সূত্র অনুযায়ী, একই জমির একাধিক খতিয়ান, ভুল জরিপ, জাল দলিল, উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ, সীমানা নির্ধারণে অস্পষ্টতা এবং রেকর্ড সংশোধনে দীর্ঘসূত্রতা জমি সংক্রান্ত বিরোধের প্রধান কারণ। অনেক ক্ষেত্রে একটি মামলার নিষ্পত্তি ঘটার আগেই একই জমি নিয়ে আরও কয়েকটি মামলা হয়। ফলে আদালতে মামলার জট বাড়তেই থাকে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন গ্রামীণ নারীরা। স্বামী বা বাবার সম্পত্তিতে আইনগত অধিকার থাকলেও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, দলিল সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের খরচের কারণে তারা অধিকাংশ সময় নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না। অনেক নারীই আদালতে ঘুরেও জমির দখল ফিরে পান না। মামলা চলাকালে প্রভাবশালীদের দখল, ভয়ভীতি এবং আপসের চাপও তাদের মোকাবিলা করতে হয়।
ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের অবস্থাও সংকটপূর্ণ। জমি নিয়ে বিরোধের কারণে অনেক কৃষক বছরের পর বছর নিজেদের জমিতে চাষ করতে পারেন না। আদালতের নিষেধাজ্ঞা, দখল বিরোধ কিংবা সংঘর্ষের আশঙ্কায় আবাদ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে কৃষি উৎপাদন কমে, আয় বন্ধ হয় এবং অনেক পরিবার ঋণের ফাঁদে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জমিবিরোধ শুধু একটি আইনি সমস্যা নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
আইনজীবীদের মতে, একটি ভূমি মামলা নিষ্পত্তি হতে অনেক সময় ১০ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত লেগে যায়। নিম্ন আদালত থেকে আপিল, হাইকোর্ট এবং আপিল বিভাগ পর্যন্ত যেতে গিয়ে মামলার খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এতে প্রকৃত মালিকের চেয়ে বেশি সুবিধা পায় দালালচক্র, জালিয়াত ও ভূমিদস্যুরা।
গবেষকদের মতে, ভূমি প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের তথ্য একীভূত না হওয়াও বড় সমস্যা। ভূমি রেকর্ড, সাব-রেজিস্ট্রি, জরিপ এবং নামজারির তথ্য আলাদা আলাদা ব্যবস্থায় থাকায় একই জমি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে ডিজিটাল রেকর্ড এবং পুরনো কাগুজে রেকর্ডের মধ্যেও অসামঞ্জস্য দেখা যায়। এতে জাল দলিল তৈরি, এক জমি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি এবং ভুয়া মালিকানা সৃষ্টি করা সহজ হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মামলা কমাতে হলে কেবল আদালতের সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না। প্রয়োজন ভূমিব্যবস্থাপনায় মৌলিক সংস্কার। সব ভূমি রেকর্ড ডিজিটালি একীভূত করা, জরিপ হালনাগাদ করা, দলিল নিবন্ধন ও নামজারির তথ্য সমন্বিত করা এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং নারীদের ভূমি অধিকার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
তাদের মতে, বিচারাধীন ৪৫ লাখ মামলার মধ্যে ৩১ লাখই যখন জমি সংক্রান্ত, তখন এটি আর শুধু আদালতের জটের বিষয় নয়; এটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও বড় বাধা। ভূমি বিরোধ দ্রুত কমানো না গেলে কৃষি উৎপাদন, গ্রামীণ বিনিয়োগ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাÑ সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে। সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হবে সেই নারী ও কৃষকদের, যাদের জীবিকা ও নিরাপত্তা সরাসরি জমির ওপর নির্ভরশীল।
ভূমি সংক্রান্ত বিরোধের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি এবং বিচার বিভাগে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ। তিনি বলেন, ‘দেশে হওয়া মামলার বড় একটি অংশই ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ ও মাদক সংক্রান্ত। এসব মামলার নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগায় বিচারব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৪৫ লাখ মামলা বিচারাধীন। এই জট কমাতে বিচার বিভাগে প্রয়োজনীয় জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিটি মামলা নিষ্পত্তির জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ তার মতে, ‘সময়বদ্ধ বিচার নিশ্চিত করা গেলে মামলাজট কমবে এবং বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তিও অনেকাংশে লাঘব হবে।’
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com