প্রজন্ম ডেস্ক:
রাজধানীতে গ্যাসের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বাসাবাড়িতে থাকছে না গ্যাস। গভীর রাতে গ্যাস এলেও ভোররাতেই তা চলে যাচ্ছে। রান্না করা যাচ্ছে না ভাত-তরকারি। রাজধানীর অধিকাংশ এলাকার মানুষকে কলা-পাউরুটিসহ বাইরের খাবার খেয়ে দিন পার করতে হচ্ছে। ফিলিং স্টেশনেও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। শিল্প-কারখানাতেও গ্যাসের সরবরাহ নেই। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে অধিকাংশ কারখানা।
এক সপ্তাহ ধরে গ্যাসের এই সংকট চলছে। কখন এই সংকট দূর হবে– পেট্রোবাংলা বা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় নির্দিষ্টভাবে কিছুই জানাতে পারছে না। চলমান এই সংকটের জন্য জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করেছেন। আমেরিকার এক্সিলারেট এনার্জি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন কূপ থেকেও গ্যাসের উৎপাদন কমে গেছে। সব মিলিয়ে চাহিদার অর্ধেকে নেমে গেছে গ্যাসের সরবরাহ। গতকাল সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের অধিবাসী মো. আব্দুল হালিম বলেন, ‘দিনে গ্যাস থাকে না। কখন তা আসবে অপেক্ষা করতে করতে গভীর রাত হয়ে যায়। ততক্ষণ রাত জাগা সম্ভব হয় না। ঘুমিয়ে যাই। ফজরের নামাজের সময় উঠে দেখি গ্যাস নেই। ঠিকমতো খেতে পারছি না। কলা-রুটি খেয়ে থাকতে হচ্ছে। হোটেলের খাবারও খাওয়া যায় না। দাম বেশি। এভাবে কতদিন চলবে।’ এই থানার নবোদয় হাউজিংয়ের রুবেল মিয়াও বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে কোনো গ্যাস পাচ্ছি না। এই সংকট কবে দূর হবে। কেউ কোনো তথ্য জানাতে পারছেন না। বাধ্য হয়ে ঘরের ভেতরেই মাটির চুলায় রান্না করতে হচ্ছে। গ্যাসের লাইন খুললে দেখা যায় পানি আসে।’ সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কাঁটাসুর, নূরজাহান রোড, ইকবাল রোডেও একই দশা। দিনে কোনো গ্যাস থাকে না। গভীর রাতে এলেও শেষ রাতে তা চলে যায়।
এই সংকট শুধু মোহাম্মদপুরেই চলছে তা না। ধানমন্ডি, লালবাগ, মালিবাগ, বনশ্রী, ডেমরা, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, গাজীপুরের টঙ্গীতে একই দশা। বাসাবাড়ি থেকে শিল্প-কারখানায় পাওয়া যাচ্ছে না গ্যাস। শাহরিয়ার স্টিল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ অটো রি-রোলিং অ্যান্ড স্টিল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি এস কে মাসাদুল আলম মাসুদ বলেন, ‘ডেমরা থানায় গ্যাসের প্রকট সংকট। ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। সাত দিন ধরে শিল্প-কারখানা বন্ধ। কোনো কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছি না। কতদিন এভাবে চলতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে সংকট সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, তা জানাতে পারছে না।’ ঢাকা চেম্বারসহ বিভিন্ন সংগঠনের শিল্পোদ্যোক্তারাও জানান, গ্যাসের সংকটে কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
রাজধানীর উত্তরা থেকে ডেমরার সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ট্রাক ও প্রাইভেট কারের চালকরা। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ৩-৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও ৪০ টাকার গ্যাস পাওয়া যায় না। এ ব্যাপারে খিলগাঁও থানার সিএনজিচালক মো. সেলিম বলেন, ‘সাত দিন ধরে ফিলিং স্টেশনে গেলেও কোনো গ্যাস পাচ্ছি না। তিন দিন ধরে সিএনজি চালাতে পারছি না।’ অন্য এলাকার সিএনজিচালকদেরও একই অভিযোগ। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কখন ঠিকমতো গ্যাস পাওয়া যাবে? এভাবে চলতে থাকায় সিএনজিচালিত যানবাহনের চালকদের আয় বন্ধ হয়ে গেছে।
গ্যাসে চলমান সংকটের ব্যাপারে গতকাল সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে গ্যাসসংকট কাটাতে সব প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও এক সপ্তাহ লাগতে পারে। আমরা জানি বাসাবাড়িতে মা-বোনেরা, গৃহিণীরা সংসারের রান্নার কাজে প্রতিদিন চ্যালেঞ্জ অনুভব করছেন। শিল্পগুলো তাদের উৎপাদন কম্প্রোমাইজড করছে। সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে আসায় গণপরিবহনের সমস্যা হয়েছে। এই কারণে আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি জনগণের কাছে।
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘বলতে কোনো দ্বিধা নেই–এটা সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের ত্রুটি না। একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে সমস্যা হয়েছে। আমরা এই মুহূর্তে তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে পারছি না। এটা আমাদের সীমাবদ্ধতা। আমরা এই জন্য বারবার দুঃখ প্রকাশ করছি।’ প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘ত্রুটি দেখা দেওয়া ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) থেকে ৫০০ থেকে ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস সরবরাহ হয়। আমরা আশা করছি, আগামী সপ্তাহে ২৮০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট জাতীয় গ্রিডে তারা গ্যাস সরবরাহ করতে সমর্থ হবে।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, শেভরনসহ দেশের বিভিন্ন কোম্পানির ১১৯টি কূপে গ্যাসের উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৬১৫ মিলিয়ন ঘনফুট। এসব কূপের মাধ্যমে গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে ৯২২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট। আগের তুলনায় উৎপাদন কমে এ পর্যায়ে নেমেছে। এ ছাড়া রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করে চাহিদা মেটানো হচ্ছে। দেশে প্রতিদিন ৩ হাজার ৮৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকে। বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে ২ হাজার ১৫১ মিলিয়ন ঘনফুট। অগ্নিকাণ্ডের আগে দৈনিক ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আমেরিকার এক্সিলারেট এনার্জি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট ও সামিট ভাসমান টার্মিনাল থেকে প্রায় ৫৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দিনে সরবরাহ করা হতো। তিতাসসহ বিভিন্ন বিপণন কোম্পানির মাধ্যমে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে এই গ্যাস সরবরাহ করা হয় আবাসিক, শিল্প ও সিএনজিতে। কিন্তু গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে দিনে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এ কারণে শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজিসহ অন্যান্য গ্রাহকের ওপর চাপ পড়েছে। তাই দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। এলএনজি আমদানির অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করতে হবে। যাতে কোনো একটি স্থাপনায় সমস্যা দেখা দিলে সারা দেশে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি না হয়। সম্প্রতি সরকার বেগমগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে ৭২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি কূপ খনন প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। তা কার্যকর করতে কয়েক বছর লাগবে।
কবে আসলে গ্যাসের সংকট দূর হবে। এ ব্যাপারে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব মুনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল করতে কত সময় লাগবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ইংল্যান্ড থেকে বিশেষজ্ঞরা এসেছেন। সেখানকার প্রকৌশলীরা মেরামতকাজ করছেন। তারাই বলতে পারবেন ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি কখন স্বাভাবিক হবে। তবে আমরা আশা করি দ্রুত তা স্বাভাবিক হয়ে যাক।
উল্লেখ্য, একসময়ে দেশীয় গ্যাসফিল্ডগুলো থেকে দৈনিক ২ হাজার ৮০০ মিলিয়নের মতো গ্যাস উৎপাদিত হতো। বর্তমানে ১ হাজার ৬১৫ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। গ্যাসের মজুত কমে যাওয়ায় প্রতিনিয়ত কমে আসছে উৎপাদন। তাই ঘাটতি সামাল দিতে ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু করা হয়। এ জন্য সাগরে দুটি এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) স্থাপন করা হয়েছে। যার মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১ হাজার ১৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে সাগর উত্তাল হলেই এলএনজি খালাস বন্ধ হয়ে যায়, যার প্রভাব সম্প্রতি দেখা যায়।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com