প্রজন্ম ডেস্ক:
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর কত মানব পাচার হয় তার সঠিক পরিসংখ্যান কোথাও নেই। তবে প্রতিবছর ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৭০ থেকে ৯০ হাজার মানুষ বিভিন্ন দেশের জেলখানা বা বন্দিশালা থেকে ডিপোর্টি হিসেবে ফিরে আসে। ২০০৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এভাবে সাড়ে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ দেশে ফিরেছে। এ ছাড়া সাগরপথে বিদেশে যেতে গিয়ে বছরে অন্তত ৫০০ বাংলাদেশির মৃত্যু ঘটে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জেলখানায় এখনো আটক আছেন শত শত বাংলাদেশি, যারা পর্যায়ক্রমে বহিষ্কার হয়ে দেশে ফেরত আসবে।
ইউরোপের সীমান্তরক্ষী বাহিনীগুলোর সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টাকারীদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই সবচেয়ে বেশি। এই পথটি সেন্ট্রাল মেডিটেরেনিয়ান রুট নামে পরিচিত। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই পথে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। এভাবে প্রবেশ করতে গিয়ে মাঝেমধ্যেই প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি ইতালি বা গ্রিসে পৌঁছানোর পথে নির্যাতন, জিম্মি করে অর্থ আদায় এবং মানবেতর পরিস্থিতিতে আটকে রাখার ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে। অনেকেই শেষ পর্যন্ত লিবিয়ায় আটক হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। গত ছয় বছরে প্রায় ১৫ হাজার বাংলাদেশিকে এভাবে লিবিয়া থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহায়তায় মানব পাচারের শিকার হয়ে ইউরোপ যাওয়ার পথে বিপদগ্রস্থ বাংলাদেশিদের প্রতি মাসেই ফেরত আনা হচ্ছে। বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে ও আইওএমের সহায়তায় গত ১৫ বছরে ইউরোপ যাওয়ার পথে আটক ও উদ্ধার হওয়া ৪৮ হাজার ৫৪৮ জন বাংলাদেশিকে ফেরত এনেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির গবেষণা অনুযায়ী মানব পাচারকারীরা ৩টি বড় রুট এবং ১৮টি ছোট রুট দিয়ে বাংলাদেশিদের ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাচার করে। বড় রুটগুলোর মধ্যে রয়েছে–ভূমধ্যসাগর, পূর্ব-মধ্যসাগর ও পশ্চিম-মধ্যসাগর। এ ছাড়া ছোট রুটগুলোর পাশাপাশি সম্প্রতি নতুন দুটি রুট যোগ হয়েছে। এই দুটি রুটের একটি হচ্ছে রাশিয়া এবং অন্যটি হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অর্থাৎ থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস ও মালয়েশিয়া। মানবাধিকার সংস্থা ‘ফরটিফাই রাইটস’ এবং ইউক্রেনভিত্তিক ‘ট্রুথ হান্ডস’-এর যৌথ তদন্তেও রাশিয়ায় মানব পাচারের অভিযোগ উঠে এসেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে মানবঢাল হিসেবে ঠেলে দেওয়া প্রায় অর্ধশত বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। শুধু বাংলাদেশ নয়, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভারত, কেনিয়া এবং বিভিন্ন আফ্রিকান দেশের নাগরিকদেরও একই কৌশলে রাশিয়ার যুদ্ধে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘের একটি বিশেষ কমিটিও তদন্ত শুরু করেছে।
রাশিয়ায় যুদ্ধে নিহত ও আহত কয়েকটি পরিবারের সদস্যরা মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য এবং আহতদের উদ্ধারের জন্য ব্র্যাকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে থাকা কিছু এজেন্সি ও দালাল চক্র নিরাপত্তারক্ষী, নির্মাণশ্রমিক, ওয়েল্ডার, পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা কারখানার চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে ৮ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করে বৈধ ভিসায় রাশিয়ায় নিয়ে যায়। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের রুশ ভাষায় লেখা বিভিন্ন নথিতে স্বাক্ষর করানো হয়, যার অর্থ তারা বুঝতে পারেন না। এরপর কয়েক সপ্তাহের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে সরাসরি ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
এদিকে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে সরকার ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন-২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। এই আইনে একক ও সংঘবদ্ধ মানব পাচারের ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডের সর্বোচ্চ শাস্তি বহাল রাখা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মানব পাচারসংক্রান্ত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা ঝুলে আছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৯৭৮টি মামলা এখনো তদন্তাধীন এবং ৩ হাজার ৩০৬টি মামলা বিচারাধীন। এ বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জানুয়ারিতে নতুন করে ৭১টি, ফেব্রুয়ারিতে ৬৬টি, মার্চে ১১০টি, এপ্রিলে ১৩০টি এবং মে মাসে ১২৩টি মামলা হয়েছে। এই সময়ে মাত্র ১৭টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। ২০২৫ সালে বা চলতি বছর এখন পর্যন্ত কোনো মামলায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির তথ্য পাওয়া যায়নি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আসামিরা খালাস পেয়েছেন।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, শুধু আইন করলেই হবে না, এর কার্যকর বাস্তবায়নও জরুরি। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষকে প্রযুক্তিনির্ভর মানব পাচার ও সাইবার স্ক্যামের ক্ষেত্রে সচেতন করা প্রয়োজন। এ ছাড়া মানব পাচারের ঘটনায় মূল অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং পাচারের সঙ্গে জড়িতদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। মানব পাচারপ্রবণ জেলাগুলোতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের দৃঢ় অঙ্গীকার ছাড়া মানব পাচার, অর্থ পাচার ও মাদকের মতো আন্তঃসম্পর্কিত অপরাধ নির্মূল করা কঠিন।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com