প্রজন্ম ডেস্ক:
সারা দেশে গ্রামীণ সড়কগুলো গ্রামীণ জীবনযাপন আর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও মেরুদণ্ডের মতো। ইউনিয়ন ও উপজেলা থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ের লাখ লাখ মানুষ তাদের প্রাত্যহিক ও বাণিজ্যিক জরুরি প্রয়োজনে এসব সড়ক ব্যবহার করে থাকে। অথচ এসব গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নিয়মিত সংস্কারে তেমন কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হচ্ছে না। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, উপজেলার প্রধান সড়কগুলো মেরামতের জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে গ্রামীণ সড়ক নেটওয়ার্কের বড় অংশ ক্রমশ ভেঙে পড়ছে। খোদ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এ জন্য অর্থায়নের সংকটকে দায়ী করছেন। এই অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, এ খাতে বাজেট অপ্রতুল হওয়ায় তাদের কাছে যে চাহিদা আসে, সে অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।
কৃষিজাত ও অ-কৃষিজাত পণ্য বাজারে পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি অনেকাংশেই ভালো সড়ক নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল। তাই বছরব্যাপী যোগাযোগ নিশ্চিত ও বাণিজ্য সহজতর করতে এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে গ্রামীণ সড়কের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ২,০৮২,১২ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে প্রস্তাবিত ‘পল্লী সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মসংস্থান প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করবে। এর আগে ১৯৮৩ ও ১৯৮৪ সালে এবং পরবর্তী সময় ২০০৩-২০০৭ মেয়াদে এলজিইডি’র অধীনে সড়কসমূহের ব্যাপক সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ হয়েছিল। এরপর আর বড় আকারের কোনো রক্ষণাবেক্ষণ কাজ হয়নি।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ ২০২৩ সালের জুন মাসের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ১ লাখ ৪১ হাজার কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক পাকা ছিল। তখন এলজিইডি’র আওতায় সারা দেশে মোট ৩ লাখ ৫৩ হাজার ৩৫২ কিলোমিটার সড়ক পাকা করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল। তখনকার কাঁচা সড়কের দৈর্ঘ্য ছিল ২ লাখ ১২ হাজার ৬৫৩ কিলোমিটার। কাঁচা সড়ক পাকাকরণ একটি চলমান প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় অর্থ পেলে কাঁচা সড়কের গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার বিবেচনা করে পর্যায়ক্রমে পাকা করা হয়ে থাকে।
এলজিইডির সড়ক ও সেতু রক্ষণাবেক্ষণ ইউনিটের একজন নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, ‘সড়ক মেরামতে যত দেরি হবে, মেরামত খরচও তত বাড়বে। বর্তমানে এলজিইডির অধীনে গ্রামীণ সড়ক মেরামতে প্রয়োজনের তুলনায় সরকারের বরাদ্দ খুবই নগণ্য। উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারাও একই অভিমত দিয়েছেন। তাদের মতে, গ্রামীণ সড়ক সংস্কারে সীমাবদ্ধতার বড় কারণ আর্থিক স্বল্পতা ও প্রয়োজনের তুলনায় স্বল্প বাজেট। এতে গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মির্জা মো. ইফতেখার আলী বলেন, ‘এ সব গ্রামীণ সড়ক সংস্কার ও মেরামতে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। এর বিপরীতে যা বরাদ্দ হয় তা নিতান্তই অপ্রতুল। সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের ক্ষেত্রে এই অপ্রতুল বরাদ্দই সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। এ ছাড়া মৌসুমি বৃষ্টিপাতের কারণেও মেরামত কাজে বাধা তৈরি হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাজ করার সক্ষমতার ঘাটতিও প্রকট। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে প্রকৌশল দপ্তরে লোকবল ঘাটতি রয়েছে।’
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রশাসনিক শাখা থেকে জানা যায়, উপসহকারী প্রকৌশলী ও নকশাকার পদে রাজস্ব খাতে মোট শূন্যপদ সংখ্যা ১১৩৫টি। মাঠ পর্যায়ের এসব কর্মকর্তার পদ খালি থাকায় এলজিআরডির প্রকল্প বাস্তবায়ন পিছিয়ে যাচ্ছে। গ্রামীণ সড়ক ব্যবস্থাপনার কাজে প্রভাব পড়েছে।
মাঠ পর্যায়ের উপজেলা প্রকৌশলীরা বলছেন, গ্রামীণ সড়ক প্রকল্পের এ ধরনের অব্যবস্থাপনা ও সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলো নতুন নয়, বরং বেশ পুরনো। গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার এলজিইডি প্রকৌশলী মাকসুদুন্নবী মিন্টু জানান, ‘গত দুই বছরে এই উপজেলায় গ্রামীণ সড়কের বেশ কিছু মেরামত ও নতুন রাস্তা বাস্তবায়নের কাজ বন্ধ হয়ে আছে। বার বার বলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কাছ থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি। এ কারণে কমপক্ষে সাতটি কাজ বাতিল করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থের পর্যাপ্ত জোগান না থাকায় সব রাস্তার কাজ সমানভাবে সংস্কার করা সম্ভব হয় না।’
একই জেলার কাপাসিয়া উপজেলা প্রকৌশলী মো. সোহেল রানা বলেন, ‘গত দু’মাস আগে যোগদান করার আগে শুনেছি, গ্রামীণ সড়কের বেশ কিছু প্রকল্প ঠিকাদারের অনুপস্থিতির কারণে বাতিল করা হয়েছে।’ তিনি জানান, উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়কগুলোকে এলজিইডি থেকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। এর মধ্যে একটি সড়ক ৫.৫ মিটার যেটা মূলত ১৮ ফুট প্রস্থের সড়ক। এখানে দুই লেনে গাড়িগুলো চলতে পারে। আরেকটি হলোÑ ৩.৭ ফুট সড়কÑ যেটি গাড়ির চাপ নেওয়ার উপযুক্ত নয়। তবে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ হলে গ্রামীণ সড়ক ব্যবস্থাপনার কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।’
সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় ২ হাজার ৮২ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘পল্লী সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মসংস্থান প্রকল্প’ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় দেশের আট বিভাগের ৬৪ জেলার ৪৯৫টি উপজেলায় মোট ৯১ হাজার ৫৬০ কিলোমিটার পল্লী সড়ক নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। এই প্রকল্পের মোট বার্ষিক বাজেট গড়ে ৫২০ কোটি টাকা। ৬৪টি জেলায় এই বাজেট ভাগ করলে জেলা প্রতি গড়ে বার্ষিক ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৮ কোটি ১২ লাখ টাকা। শুধু গ্রামীণ নারী শ্রমিকদের দিয়ে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
এ বিষয়ে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার একটি ইউনিয়নের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চেয়ারম্যান বলেন, ‘গ্রামীণ সড়কের চাহিদামতো সকল রাস্তার নির্মাণ ও সংস্কারে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় উপজেলা প্রকৌশলী ও জেলা প্রকৌশলীদের সড়ক প্রাধিকার নির্বাচনে বেগ পেতে হয়। অনেক সড়কের আইডি থাকলেও তা সংস্কারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় না। এর বড় কারণ পর্যাপ্ত অর্থের সংকট’।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন বলেন, ‘চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ না থাকায় ইউনিয়নের সড়কগুলো মেরামত করা হচ্ছে না। এবার ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে ডিপিপি পাঠানো হয়েছে, এটি একনেকে অপেক্ষমাণ আছে। আগামী সপ্তাহে এটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এটি পাস হলে আমরা সংস্কারের কাজ পুরোদমে শুরু করতে পারব। এরপর পর্যায়ক্রমে আমরা একাধিকবার এ বরাদ্দের প্রস্তাব পাঠাব।’ এতে গ্রামীণ সড়ক সংস্কারের সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে কেটে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com