প্রজন্ম ডেস্ক:
ষান্মাসিক পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফল হয়নি; তাই মায়ের বকা শুনতে হয়েছে তনিমাকে (ছদ্মনাম)। অভিমানে মেয়েটি কেমন বদলে যেতে শুরু করেছে। তার মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়; আনমনে একা একা কথা বলতে শুরু করে একদিন। মানসিক বৈকল্য এমন পর্যায়ে চলে যায় যে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করতে হয়। পরে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হন মা-বাবা। তার চিকিৎসার (স্পিচ-থেরাপি) একপর্যায়ে জানা যায়, মা-বাবার মধ্যে দীর্ঘদিনের দাম্পত্য কলহের কথা। সেই কলহের জেরে তনিমাকে গালমন্দ করেন মা-বাবা দুজনেই। পারিবারিক সম্মান ও সামাজিক নিরাপত্তার কথা ভেবে তনিমা সে কথা চেপে যায়। ভয়ে কুঁকড়ে থাকতে থাকতে একসময় বদমেজাজি হয়ে ওঠে মেয়েটি।
শুধু তনিমা নয়, দেশের হাজারও তরুণ পারিবারিক বিপর্যয়ে মানসিক ব্যাধিতে ভুগছেন। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যে, শুধু পারিবারিক কারণ নয়; তথ্যপ্রযুক্তির নেতিবাচক ব্যবহারও শিশু-কিশোর ও তরুণদের মনোজগতে প্রভাব ফেলছে। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ঘটনাবলিও সুবিধাবঞ্চিত কিশোরদের অপরাধপ্রবণ করে তুলছে।
১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোররা ভুগছে বিষণ্ণতায়
সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে একটি বড় অংশ বিষণ্ণতা, উদ্বেগ এবং মানসিক চাপে ভুগছে। গবেষকদের মতে, বিষণ্ণতায় ভোগা সেই কিশোর-কিশোরীরা ভবিষ্যৎ জীবনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সমস্যায় পড়ে। এতে শিক্ষাগত ও কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা হ্রাসের পাশাপাশি বিভিন্ন নেতিবাচক পরিণতিও দেখা যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক সমীক্ষা বলছে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগতে থাকা কিশোররা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকিতে থাকে। গত বছর এই সংস্থার সমীক্ষায় বলা হয়েছে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ শিশু-কিশোর ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী শিশু-কিশোররা সব সময় অতিরিক্ত উদ্বেগ ও বিষণ্নতায় ভোগে। এমন পীড়ায় ভুগতে থাকা শিশুরা স্কুলে অনিয়মিত হয়ে পড়ে। এর বিরূপ প্রভাব পড়ে পড়াশোনায়। ১৫-১৯ বছর বয়সী কিশোরদের মধ্যে মেজাজের দ্রুত ও অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগতে থাকা কিশোররা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এটি তার একাকিত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়। কখনো কখনো বিষণ্ণতার মাত্রা এতই বেড়ে যায় যে কিশোর-কিশোরীরা আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হচ্ছে।’
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের আরও কয়েকজন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিশোরদের মনস্তত্ত্বে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এমন কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে–পারিবারিক বা সামাজিকভাবে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হওয়া, সমবয়সীদের চাপে পড়ে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা এবং আত্মপরিচয় অন্বেষণ। সমবয়সীদের সঙ্গে সম্পর্কও এখানে গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক। এই সম্পর্কের অবনতি হলে কিশোররা হরহামেশা সহিংস আচরণ করছে; গড়ে উঠছে ভয়ংকর কিশোর গ্যাং। স্কুলে সহপাঠীকে উপহাস বা হেয়প্রতিপন্ন করা হচ্ছে; প্রাক-কৈশোর বয়স (প্রি-টিন এজ) পেরোতে না পেরোতেই অনেকে যৌন সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে।
প্রাক-কৈশোরে আচরণগত পরিবর্তন, ভাবাচ্ছে অভিভাবককে
রাজধানীর ওয়ারীর এক অভিভাবক তার ১৪ বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। মায়ের অভিযোগ, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলেটি পড়াশোনায় একদম মনোযোগী নয়। সারাক্ষণ সে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকে। মাঝে মাঝে অকারণে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, কখনো একদম চুপ হয়ে যায়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দেখালেও তাতে স্থায়ী সমাধান মেলেনি বলে আক্ষেপ করেন সেই মা।
ওয়ারীর সেই মায়ের মতো এমন অভিযোগ দেশের হাজারও মায়ের। গত বুধবার সকালে রাজধানীর বনশ্রী আইডিয়াল স্কুলের সামনে কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাদের মধ্যে কয়েকজন একই সমস্যার কথা জানান। দুজন মা জানান, তাদের ৯ বছর বয়সী শিশুরা সহিংস আচরণ করছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিসঅর্ডার’-এর (এডিএইচডি) কারণে শিশুদের মধ্যে অতি চঞ্চলতা, মনোযোগের অভাব দেখা দিচ্ছে। ‘অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা’ এবং ‘বুলিমিয়া নার্ভোসা’র মতো খাদ্যাভ্যাসজনিত ব্যাধিগুলোও কৈশোর থেকেই দেখা দিচ্ছে। শিশুর মানসিক বিকাশ নিয়ে কাজ করেন–এমন কয়েকজন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা জানা গেছে, এ ব্যাধিতে ভোগা শিশুদের খাদ্যাভ্যাস অস্বাভাবিক। এ শিশুদের শারীরিক গঠন নিয়েও অভিভাবকদের উৎকণ্ঠার শেষ নেই।
চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনে বাংলাদেশের গবেষকদের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বয়োসন্ধিকালীন মানসিক স্বাস্থ্য-সংকটের কথা।
গবেষণায় দেখা গেছে, দশম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বিষণ্নতার মাত্রা অনেক বেশি। পড়াশোনার চাপ যেমন বাড়ছে, তেমনি ভালো ফলের জন্য পরিবার থেকে অতিরিক্ত চাপ বাড়ছে এই কিশোরদের ওপর। এই অতিরিক্ত প্রত্যাশাই কিশোরদের মনস্তত্ত্বে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
রাজধানীর মগবাজারে একটি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ক্লিনিকে সেবা (থেরাপি) নিতে আসা কিশোরদের কারও কারও মধ্যে ‘সাইকোসিসের’ লক্ষণও দেখা গেছে। এই ধরনের ব্যাধিতে আক্রান্ত কিশোররা মাঝে মাঝে অবাস্তব কিছু কল্পনা করতে শুরু করে।
১৫-১৯ বছরের শিশুদের অনেকে ধূমপানে আসক্ত হয়ে পড়ছে। কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের অনেকে এখন নিষিদ্ধ মাদকও সেবন করছে, যা আতঙ্ক ছড়াচ্ছে সমাজে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের সংকট, সমাধানে উদ্যোগ নিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসানের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি সমীক্ষায় দেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার দুর্দশার চিত্র উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারা দেশে মাত্র ৫০০ জন মনোবিজ্ঞানী এবং ২৭০ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন, যাদের সিংহভাগই শহরকেন্দ্রিক। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে শয্যাসংখ্যাও পর্যাপ্ত নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে ওই সমীক্ষায়। এতে বলা হয়েছে, মানসিক স্বাস্থ্য-সংকটে ভুগতে থাকা অধিকাংশ রোগী চিকিৎসাবঞ্চিত থেকে যাচ্ছেন। এর নেপথ্যে সামাজিক লাঞ্ছনা (স্টিগমা), কুসংস্কারকে দায়ী করেছেন গবেষকরা।
মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতামূলক প্রচার ও সতর্কতামূলক সংবাদ পরিবেশনে গুরুত্ব দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কামরুল হাসান। সারা দেশে স্কুলভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ করে স্বাস্থ্যসেবার কর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ, সম্প্রদায়ভিত্তিক সেবা, থেরাপির ফি কমিয়ে আনায় গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।
গত তিন মাসে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বড় পরিসরে কোনো নতুন প্রকল্প বা সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নেয়নি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে শহর ও উপজেলা শহরের হাসপাতালগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমীম এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবাকে আরও শক্তিশালী (স্ট্রেনদেনিং) করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক স্বাস্থ্য ও কাউন্সেলিংয়ের বিষয়টি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নতুন প্রকল্পগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিকে এখন বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com