প্রজন্ম ডেস্ক:
ভূরাজনৈতিক কৌশলগত সমীকরণের চাপে এখন বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মতো পরাশক্তিধর রাষ্ট্রের চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করবে বাংলাদেশ, সে চ্যালেঞ্জের মুখে সরকার।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে হওয়া সমঝোতা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্য চুক্তির দ্রুত বাস্তবায়নের চাপ এবং ভারতের নীরব কূটনৈতিক তৎপরতা ক্রমেই সরকারের জন্য কঠিনতর পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোরের ঢাকা সফরকালেই মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি সামরিক জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি কেনার সিদ্ধান্ত যেন সবকিছুই এক অদৃশ্য শক্তির চাপে বাংলাদেশ।
একদিকে চীনের কৌশলগত অংশীদারত্বের সম্পর্কোন্নয়ন ও বিনিয়োগের হাতছানি, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বাণিজ্য চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নের চাপ–কোনদিকে যাবে বাংলাদেশ। তবে বাংলাদেশের সামনে এসব সুযোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচ্য মঙ্গলজনক যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে। চীনের উন্নয়ন প্রস্তাবগুলোকে পাশ কাটাতে যুক্তরাষ্ট্র ‘প্যাক্স সিলিকা’ উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। গতকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে এই প্রস্তাব দেন সফররত ট্রাম্পের বিশেষ দূত সার্জিও গোর। প্যাক্স সিলিকা ইনিশিয়েটিভ হলো–কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজগুলোর জন্য বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খল সুরক্ষিত করার লক্ষ্যে গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সুরক্ষা জোট। আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট জ্যাকব হেলবার্গের নেতৃত্বে এটি প্রযুক্তিগত নির্ভরতা হ্রাস করার জন্য মিত্র দেশগুলোকে একত্রিত করে। এ ছাড়া বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে শিগগিরই আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ জন বিভিন্ন শীর্ষ কোম্পানির কর্মকর্তা।
এদিকে সফররত সার্জিও গোর গত বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বৈঠকে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা করেন। কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ইস্যুতে বৈঠকটি সুখকর ছিল না। কারণ এই সফরে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক আরও জোরদার করার কথা বলা হলেও অন্তরালে ট্রাম্পের কী বার্তা সার্জিও গোর দিয়েছেন, তা নিয়ে চলছে নানা গুঞ্জন।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর ড. খলিলুর রহমান ও সার্জিও গোর কিছুক্ষণ একান্ত বৈঠক করেন। এই বৈঠকেই যত অস্বস্তিকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এই বৈঠক থেকে বেরিয়েই পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান মন খারাপ করে সরাসরি চলে যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে। সেখানে সার্জিও গোর যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা করেন, তা অবহিত করেন। যদিও একান্ত বৈঠকে সৃষ্ট অস্বস্তিকর পরিস্থিতি নিয়ে কেউই মুখ খোলেননি। তবে বৈঠকের পরদিন সৌদি সামরিক জোটে বাংলাদেশের যোগদান এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি কেনার সিদ্ধান্ত নিতে হয় বাংলাদেশকে।
কূটনীতিকদের মতে, ড. খলিলুর রহমান ও সার্জিও গোরের মধ্যে অনুষ্ঠিত একান্ত বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে। এই চুক্তির মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই। এই চুক্তি নিয়ে সরকারের ভেতর ও বাইরেও রয়েছে নানা বিরোধ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তড়িঘড়ি করে স্বাক্ষর করা এই চুক্তিটিকে বৈষম্যমূলক উল্লেখ করে এটি বাতিলের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। চুক্তির বাস্তবতা নিয়ে সংসদে আলোচনায় তোলারও দাবি উঠেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের চাপে এটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য বুমেরাং হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোর তিন দিনের সফর শেষে গতকাল শনিবার ঢাকা ছাড়েন। সফরকালে তিনি প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনারসহ সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব বৈঠকের সাফল্য নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে সার্জিও গোরের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি যে অস্বস্তিকর ছিল, সেটি কূটনীতিকরাও স্বীকার করেন।
ড. খলিলুর রহমান ও সার্জিও গোরের মধ্যে একান্ত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের অগ্রগতি ও বাংলাদেশের অবস্থান জানতে চাইতে পারেন বলে জানিয়েছিলেন কূটনীতিকরা। কেননা প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্পে অর্থায়নে দেশটির একধরনের অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য বাধায় তা থেকে কিছুটা সরে গেছে চীন। এই প্রকল্পে চীনের একক অর্থায়ন নিয়ে ভারতেরও আপত্তি ছিল দীর্ঘদিনের। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডর (সিএমবিসি) নির্মাণের প্রস্তাব দেন। এটি নিয়ে বাংলাদেশের আগ্রহও ছিল। কিন্তু এই করিডর নিয়ে আপাতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে কূটনৈতিক মহলে। কারণ করিডরটি মায়ানমারের রাখাইন হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু রাখাইনের দখলে থাকা আরাকান আর্মিকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এই করিডর ইস্যুতে আর বেশি দূর না এগোনোর চাপ দিয়ে থাকতে পারেন গোর। এ ছাড়া ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়েও সরকারের অবস্থান জানতে চাইতে পারেন গোর।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ বলেন, ‘ড. খলিলুর রহমান ও সার্জিও গোরের মধ্যে অনুষ্ঠিত একান্ত বৈঠকটি স্বাভাবিক ছিল না বলে মনে হয়েছে। এখানে দুপক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল।’ তিনি জানান, হতে পারে সার্জিও গোর বাণিজ্য চুক্তির শর্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের চাপ দিয়েছেন অথবা প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর ও দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক বেশি দূর এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশের অবস্থান জানতে চেয়েছেন, যা বাংলাদেশের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়েও পরিষ্কার জানতে চাইতে পারেন গোর।
সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, গত বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বৈঠকের পর সার্জিও গোরের মধ্যে বৈঠকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির ছায়া পড়ে তার সৌজন্যে দেওয়া নৈশভোজে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আয়োজিত নৈশভোজে অংশ না নিয়ে গোর পদ্মা থেকে বেরিয়ে যান। এ সময় নৈশভোজের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি চলমান ছিল। জানা গেছে, ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির কারণেই তিনি নৈশভোজ না করেই পদ্মা ছাড়েন।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com