প্রজন্ম ডেস্ক:
নিত্যনতুন পন্থায় খাদ্যে ভেজাল মেশানোর এই মহোৎসব সাধারণ মানুষের আসল খাদ্য চেনার পথকে কঠিন থেকে কঠিনতর করে তুলেছে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থা বছরব্যাপী মোবাইল কোর্ট অভিযান, জরিমানা, প্রতিষ্ঠান সিলগালা করেও কূলকিনারা পাচ্ছে না।
শিশু থেকে পশু। পানি থেকে দুধ। সবজি থেকে পোল্ট্রি। ফুটপাত থেকে মেগা শপিংমল। ছোট হোটেল থেকে বড় নামকরা কোম্পানি। থানা থেকে জেলা, বিভাগ থেকে রাজধানীসহ সবখানেই থাবা বসিয়েছে সর্বগ্রাসী ভেজাল।
নিত্যনতুন পন্থায় খাদ্যে ভেজাল মেশানোর এই মহোৎসব সাধারণ মানুষের আসল খাদ্য চেনার পথকে কঠিন থেকে কঠিনতর করে তুলেছে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থা বছরব্যাপী মোবাইল কোর্ট অভিযান, জরিমানা, প্রতিষ্ঠান সিলগালা করেও কূলকিনারা পাচ্ছে না। উল্টো আইনি ফাঁকফোকরকে কাজে লাগিয়ে ভেজালকারী প্রতিষ্ঠানের নাম গোপন থাকায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে, আর মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ধুঁকছে পুরো জাতি।
খাদ্যে ভেজালের লাগাম টানতে মাঠে কাজ করছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। কিন্তু তাদের একের পর এক অভিযানের পরও পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো উন্নতি নেই।
৯ জুলাই বিএসটিআই রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি শপিংমলের আলমাস সুপার শপে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। সেখানে নিম্নমানের শিশুখাদ্য, ফ্লেভার ড্রিংকস ও গুঁড়া দুধ বিক্রির দায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। বিএসটিআইয়ের সিএম উইংয়ের উপপরিচালক (হালাল সার্টিফিকেশন) এসএম আবু সাঈদ বলেন, রমজান ও ঈদ মৌসুমে লাচ্ছা সেমাই, ঘি, কোলড্রিঙ্কসসহ বিভিন্ন পণ্যে ভেজালের মাত্রা বেড়ে যায়। তা ছাড়া থানা, জেলা ও বিভাগীয় শহরে অভিযান চালিয়ে দেখা গেছে, চানাচুর, মিষ্টি, চকলেট, শিশুখাদ্য তথা গুঁড়া দুধসহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্যে ভেজালের ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে।
তিনি জানান, বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোবাইল কোর্ট ও সার্ভিল্যান্সের মাধ্যমে ৮৪৯টি ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯৭০টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এই দুই বছরে মোট ২,৪১৫টি মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়, যার মাধ্যমে ১,৭৬২টি মামলা দায়ের এবং ১৮টি প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৬৬টি প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হয়েছে। এত কিছুর পরও ভেজালকারীদের দৌরাত্ম্য কমছে না বলে স্বীকার করেন এই কর্মকর্তা।
একই চিত্র ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ক্ষেত্রেও। অধিদপ্তরের কার্যক্রম ও গবেষণাগার বিভাগের পরিচালক আতিয়া সুলতানা জানান, ভেজাল পণ্য, খাদ্যপণ্যে নিষিদ্ধ দ্রব্যের মিশ্রণ ও অবৈধ প্রক্রিয়ায় পণ্য উৎপাদনের অভিযোগে তারা ইতোমধ্যে ৭ হাজার ২৪৪টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছেন। এতে জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৮ কোটি ৪৮ লাখ ২৪ হাজার ৯০০ টাকা। অন্যদিকে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) তাদের নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৬৮টি অভিযান চালিয়ে ৬৩টি মামলা দায়ের ও ৭৩ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করেছে। কিন্তু তিনটি সংস্থার এই সমন্বিত ও ধারাবাহিক চেষ্টার পরও ভেজালের প্রকোপ রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
খাবারে সিসা থেকে মলজাত জীবাণু
সম্প্রতি মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর মাত্রায় প্রিজারভেটিভ ব্যবহারের কারণে তিনটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে বিএফএসএ। এর মধ্যে রয়েছে ইস্ট কেক ইন্টারন্যাশনাল ফুড লিমিটেড, ইস্ট জিবাই ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড এবং আরবোটিং ফুড কোং লিমিটেডের জ্যাম ফিল্ড স্লাইস ব্রেড ও পিঠা।
তা ছাড়া বিএসটিআই কাজী ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ফ্রেশ গার্ডেন অ্যাগ্রো রিসোর্সেস, অলিভ বাংলাদেশ লিমিটেড, ডেকো ফুডস লিমিটেডসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ৮টি পণ্যে পণ্যে মাত্রাতিরিক্ত সংরক্ষণকারী পদার্থ, মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর অনুজীবের উপস্থিতি এবং বাংলাদেশ মানমাত্রার ব্যত্যয় ধরা পড়ায় বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের বিষয় উঠে এসেছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ল্যাব পরীক্ষায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করা নমুনায় শাকসবজিতে মিলেছে ক্ষতিকারক সিসা ও ক্যাডমিয়াম। শিশুখাদ্যে পাওয়া গেছে নিরাপদ সীমার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ভারী ধাতু। এ ছাড়া ভোজ্য তেলে অতিরিক্ত ট্রান্সফ্যাট, মুড়িতে ইউরিয়া, গুড়ে নিষিদ্ধ রাসায়নিক এবং বিস্কুট ও স্ট্রিট ফুডে মাত্রাতিরিক্ত প্রিজারভেটিভের উপস্থিতি শিউরে ওঠার মতো।
ল্যাব পরীক্ষায় খাগড়াছড়ির পানির প্রতি ১০০ মিলিলিটারে ৬০ সিএফইউ, বাগেরহাটে ৪৩ সিএফইউ ও দিনাজপুরে ১২০ সিএফইউ ফিকাল কলিফর্ম পাওয়া গেছে। মাইক্রোবায়োলজিক্যাল দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা-২০২১ অনুযায়ী, নিরাপদ পানিতে ফিকাল কলিফর্মের মাত্রা শূন্য থাকার কথা। ফিকাল কলিফর্ম মূলত মলদূষণের কারণে তৈরি হয়, যা ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড ও হেপাটাইটিসের মতো পানিবাহিত রোগের প্রধান কারণ।
অন্যদিকে ঢাকায় সংগৃহীত শাকসবজিতে ১.১৬ থেকে ২.৩৭ পিপিএম পর্যন্ত সিসা পাওয়া গেছে, যেখানে এর গ্রহণযোগ্য সীমা মাত্র ০.৩ পিপিএম। শিশুখাদ্যেও সিসার মাত্রা গ্রহণযোগ্য সীমার (০.০২ পিপিএম) চেয়ে অনেক বেশি (০.০৫ থেকে ০.০৭ পিপিএম) পাওয়া গেছে, যা শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।
বিশেষজ্ঞ অভিমত
এত জরিমানা ও সিলগালার পরও কেন ভেজাল বন্ধ হচ্ছে নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘খাদ্যে ভেজালের কারণে আমরা বহুমুখী স্বাস্থ্যগত সংকটে পড়ছি। প্যাকেটজাত খাদ্যের গায়ে উপাদানের সঠিক তথ্য লেখা থাকার কথা থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠান তা মানছে না। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে না পারলে আমাদের পুরো জাতির উৎপাদনশীলতা ও কর্মক্ষমতা কমে যাবে। ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে অকালে মৃত্যুর হারও বাড়ছে।’
ল্যাব পরীক্ষায় ভেজাল প্রমাণিত হওয়ার পরও সরকারি সংস্থাগুলো কেন প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করে নাÑ এ প্রসঙ্গে ডা. মুশতাক বলেন, ‘কোম্পানির নাম না বলার কারণেই মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে না। এখানে বিদ্যমান আইনে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আইন সংশোধন করে নিয়মমাফিক বাজার থেকে নমুনা তুলে পরীক্ষা করতে হবে এবং দোষী প্রমাণিত হলে সেই প্রতিষ্ঠান ও পণ্যের নাম জনসমক্ষে ঘোষণা করতে হবে। কারণ ভেজালকারীরা রাষ্ট্রের এই আইনি দুর্বলতাকেই নিজেদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।’
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com