প্রজন্ম ডেস্ক:
চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে হওয়া অধিকাংশ মামলার তদন্ত দুই বছরেও শেষ হয়নি। সাক্ষী না পাওয়া, তথ্য-প্রমাণের ঘাটতি, এজাহারের অসঙ্গতি এবং একাধিক আইনি জটিলতার কারণে তদন্তে অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (এফআরটি) জমা দিতে হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের ২ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে সারা দেশে ১ হাজার ৮৬৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়েছে ২৬৮টি মামলায়। সে হিসাবে তদন্ত নিষ্পত্তির হার ১৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এসব মামলায় মোট ১৬ হাজার ৯৩২ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের গেজেট অনুযায়ী, চব্বিশের আন্দোলনে ৮৩৪ জনকে শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, জাতিসংঘের একটি তথ্যানুসন্ধানী প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তদন্ত কার্যক্রম তদারকির জন্য পুলিশ সদর দপ্তর মেন্টর (পরামর্শক) কমিটি গঠন করলেও অধিকাংশ মামলার তদন্ত এখনও ঝুলে আছে। তথ্য-প্রমাণের ঘাটতি, সাক্ষী ও বাদী-আসামি-সংক্রান্ত জটিলতা এবং একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলার অভিযোগ তদন্তকে আরও জটিল করে তুলেছে। পাশাপাশি অনেক মামলায় পুলিশ ও অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তাও আসামি হওয়ায় তদন্ত কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষভাবে তদন্ত পরিচালনায় অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, বেশ কয়েকটি মামলার তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। বাকি অধিকাংশ মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। মেন্টর কমিটি প্রতিদিনই তদন্তের অগ্রগতি পর্যালোচনা করছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তাগিদ দিচ্ছে।
তদন্তে বিলম্বের কারণ সম্পর্কে খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, অনেক নিহতের স্বজন মরদেহ নিজ নিজ গ্রামে দাফন করলেও মামলা করতে আগ্রহ দেখাননি। আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃত স্বজন নন— এমন ব্যক্তিরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাদী হয়েছেন। কয়েকটি মামলায় এজাহারে ঘটনাস্থল ও ঘটনার সময়ের সঙ্গে বাস্তব তথ্যের অসঙ্গতি পাওয়া গেছে, যা তদন্তকে জটিল করেছে। এসব কারণে প্রকৃত স্বজনদের মাধ্যমে পরবর্তী সময়ে নতুন করে মামলা করতে হয়েছে। এ ছাড়া প্রথম দিকে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলে ভবিষ্যতে হয়রানির শঙ্কায় অনেকেই সাক্ষ্য দিতে অনাগ্রহী ছিলেন।
অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, যেসব ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে আইন-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা জরুরি। তার মতে, তদন্তের জন্য সুনির্দিষ্ট চেকলিস্ট অনুসরণ করে দায়িত্ব বণ্টন করলে কাজের গতি বাড়তে পারে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও অভিযোগপত্র দাখিলে বিলম্ব হলে ন্যায়বিচার ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় যাতে সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না হয়, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সতর্কতার সঙ্গে তদন্ত শেষ করতে হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের ২ আগস্ট পর্যন্ত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট ১ হাজার ৮৬৬টি মামলার মধ্যে তদন্ত শেষ হয়েছে ২৬৮টির। অর্থাৎ, গত দুই বছরে তদন্ত নিষ্পত্তির হার ১৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ। বাকি ৮৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ মামলার তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। মামলাগুলোর মধ্যে ৮০২টি হত্যা মামলা। এর মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে ১০৩টির। তদন্ত শেষে ৬৫টি হত্যা মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়েছে এবং ৩৮টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন (এফআরটি) জমা দেওয়া হয়েছে। সে হিসাবে হত্যা মামলার তদন্ত নিষ্পত্তির হার ১২ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এ ছাড়া অন্যান্য ধারায় হওয়া ১ হাজার ৬৪টি মামলার মধ্যে তদন্ত শেষ হয়েছে ১৬৫টির। এসব মামলার মধ্যে ১৪৭টিতে চার্জশিট এবং ১৮টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। এ শ্রেণির মামলায় তদন্ত নিষ্পত্তির হার ১৫ দশমিক ৫১ শতাংশ। হত্যা ও অন্যান্য ধারার মামলা মিলিয়ে মোট ২১২টি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ। একই সময়ে ৫৬টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, তদন্ত শেষে আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্রে মোট ১৬ হাজার ৯৩২ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলায় ৫ হাজার ৮৫৭ জন এবং অন্যান্য মামলায় ১১ হাজার ৭৫ জন আসামি রয়েছে।
সূত্র জানায়, হত্যা মামলাগুলোতে এজাহারভুক্ত আসামির সংখ্যা ৬৫ হাজার ২১০। এ ছাড়া সন্দেহভাজন আসামির সংখ্যা ২ লাখ ৫১ হাজার ৮৫১। অন্যদিকে, অন্যান্য ধারার মামলায় এজাহারভুক্ত আসামির সংখ্যা ৮৯ হাজার ১২১ এবং সন্দেহভাজন আসামির সংখ্যা ১ লাখ ৭৭ হাজার ৪৬৮।
প্রসঙ্গত, ১৯৪৩ সালের পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল (পিআরবি)-এর ২৭৫ ধারা এবং ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি (সিআরপিসি)-এর ১৬৯ ধারা অনুযায়ী, তদন্তে পর্যাপ্ত প্রমাণ না মিললে তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেন। এ ছাড়া পিআরবির ২৭৬ ধারা অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশের প্রতিবেদন গ্রহণ করতে পারেন। আবার সিআরপিসির ১৫৬(৩) ধারা অনুযায়ী পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেওয়া অথবা ১৯০(বি) ধারা অনুযায়ী অপরাধের বিষয়ে আমলে নেওয়ার ক্ষমতা আদালতের রয়েছে। এ ছাড়া সিআরপিসির ১৭৩(এ) ধারা অনুযায়ী, তদন্তে সম্পৃক্ততার প্রমাণ না মিললে তদন্তকারী কর্মকর্তা এজাহারে নাম থাকা কোনো ব্যক্তিকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করতে পারেন।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com