প্রজন্ম ডেস্ক:
জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশের ব্যয় গত অর্থবছরে নতুন রেকর্ড গড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামে ব্যয় হয়েছে ১০.৬৩ বিলিয়ন ডলার। এক বছর আগে একই খাতে ব্যয় ছিল ৫.১৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়েছে ১০৭ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্যে জ্বালানি ব্যয়ের এই চিত্র উঠে এসেছে।
দেশের মোট ৭৫.২৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানির বড় অংশ জ্বালানিতে। মোট আমদানি ব্যয়ের ১৪ শতাংশের বেশি গেছে জ্বালানি কিনতে। অর্থাৎ প্রতি সাত ডলারের আমদানিতে প্রায় এক ডলার গেছে জ্বালানিতে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী ব্যয়টি প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার কোটি। এটি ২০২০-২১ অর্থবছরের আগের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে এবার।
২০২০-২১ অর্থবছরে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ৮.৯৯ বিলিয়ন ডলার। সেসময় মহামারির পর বৈশ্বিক অর্থনীতি আবার সচল হতে শুরু করেছিল। তেলের চাহিদা দ্রুত বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারেও দাম বেড়েছিল তখন। এবারও চাহিদা ও দামের সমন্বিত প্রভাবে ব্যয় বেড়েছে।
বাংলাদেশের সামগ্রিক আমদানি বৃদ্ধির তুলনায় জ্বালানির ব্যয় অনেক দ্রুত বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট আমদানি ব্যয় ছিল ৬৮.৩৫ বিলিয়ন ডলার। পরের অর্থবছরে সেই ব্যয় ১০.১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫.২৪ বিলিয়ন ডলারে। অন্যদিকে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়েছে এর দশগুণেরও বেশি হারে। ফলে আমদানি ব্যয়ের ওপর জ্বালানির অংশ আরও বড় হয়েছে।
প্রধান আমদানি পণ্যের মধ্যবর্তী পণ্যের ব্যয় বেড়েছে ১৫.২ শতাংশ। মূলধনি পণ্যের আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৭.১ শতাংশ একই সময়ে। খাদ্যশস্য আমদানির ব্যয়ও ১১.৭ শতাংশ বেড়েছে গত অর্থবছরে। তবে ভোগ্যপণ্যের আমদানি ব্যয় কমেছে ১১.৪ শতাংশ ওই সময়ে। এতে আমদানির বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়।
শিল্পের কাঁচামালের কয়েকটি প্রধান খাতেও আমদানি কমেছে গত অর্থবছরে। তৈরি পোশাক সংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানি কমেছে চার শতাংশ। লোহা, ইস্পাত ও অন্যান্য বেস মেটালের আমদানি কমেছে ৪.৬ শতাংশ। প্লাস্টিক ও রাবার আমদানিও কমেছে দুই শতাংশ। অন্যদিকে সার আমদানি বেড়েছে ৪২ শতাংশ গত অর্থবছরে। তেলবীজের আমদানি বেড়েছে ৩৪.৪ শতাংশ একই অর্থবছরে। রাসায়নিক পণ্যের আমদানি বেড়েছে ৮.১ শতাংশ ওই সময়ে। ওষুধপণ্যের আমদানিও বেড়েছে ১৩.৮ শতাংশ গত অর্থবছরে।
মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি বেড়েছে ১৩.৮ শতাংশ একই সময়ে। অন্যান্য মূলধনি পণ্যের আমদানি বেড়েছে ৪.৪ শতাংশ। দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশে জ্বালানির চাহিদাও বেড়েছে গত অর্থবছরে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে জ্বালানি আমদানি হয়েছে ৫৭.৪ লাখ টন। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৫০ লাখ টন।
তবে পুরো অর্থবছরের মোট আমদানির পরিমাণ এখনও প্রকাশিত হয়নি। বিপিসির হিসাবে, গত অর্থবছরে দেশে জ্বালানির চাহিদা ছিল প্রায় ৭৪ লাখ টন। আমদানির তালিকায় ডিজেল, অপরিশোধিত তেল এবং ফার্নেস অয়েল ছিল। এ ছাড়া পেট্রোল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও বেস অয়েলও এসেছে। অপরিশোধিত তেল আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ৯২ শতাংশ। এ খাতে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১.২০ বিলিয়ন ডলারে গত অর্থবছরে। পেট্রোলিয়াম, তেল ও লুব্রিকেন্টস পণ্যে ব্যয় বেড়েছে ১০৯.১ শতাংশ।
পরিশোধিত পণ্যের ওপর বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির নির্ভরতা তুলনামূলক বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট ৬২.২০ লাখ টন জ্বালানি আমদানি হয়েছিল। এর প্রায় ৭৬ শতাংশ ছিল পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য। অপরিশোধিত তেলের অংশ ছিল প্রায় ২৪ শতাংশ ওই আমদানিতে। তাই পরিশোধিত জ্বালানির দামের পরিবর্তন ব্যয়ে বড় প্রভাব ফেলে।
পরিশোধিত জ্বালানির দাম অপরিশোধিত তেলের তুলনায় দ্রুত বেড়েছে এবার। গ্যাস অয়েল, ডিজেল ও জেট ফুয়েলের গড় দাম বেড়েছে ১৭.৬ শতাংশ। এসব পণ্যের আন্তর্জাতিক গড় দাম দাঁড়িয়েছে টনপ্রতি ৮৩৫ ডলার। অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক দাম বেড়েছে ১০.৪ শতাংশ একই সময়ে। ফলে পরিশোধিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ব্যয় বাড়িয়েছে আরও। পরিশোধিত জ্বালানির দামের সঙ্গে পরিশোধন মার্জিনও যুক্ত থাকে আন্তর্জাতিক বাজারে। সরবরাহে সংকট তৈরি হলে এই মার্জিন আরও বেড়ে যেতে পারে। পরিশোধন সক্ষমতায় সীমাবদ্ধতা থাকলেও একই ধরনের চাপ তৈরি হয়। চাহিদা বাড়লেও পরিশোধিত জ্বালানির দামে বাড়তি চাপ দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশের আমদানি কাঠামোয় এই বিষয়টি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বিশ্ববাজারে তেলের দামে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অস্থিরতা দেখা গেছে। কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি সচল হলে দাম বাড়ে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর দাম আবার বাড়ে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও তেলের বাজারে দামের বড় ওঠানামা দেখা গেছে। একপর্যায়ে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬০ ডলারে নেমেছিল।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে দাম বাড়ে। মার্চে ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৯ ডলারের বেশি হয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর দাম আবার ১২০ ডলার ছাড়ায়। পরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১০০ ডলারের নিচে নেমেছে। গত সোমবার ব্রেন্ট ৮৬.৭২ ডলার এবং ডব্লিউটিআই ৮১ ডলারে ছিল।
রেকর্ড আমদানি ব্যয়ের মধ্যেই দেশে জ্বালানি সরবরাহে চাপ দেখা দেয়। জ্বালানি কিনতে বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছিল।
বর্তমানে দেশে প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ১১৫ টাকায়। অকটেনের দাম ১৪৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৪০ টাকা। কেরোসিনের বর্তমান দাম প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা নির্ধারিত রয়েছে। জুনে অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম পাঁচ টাকা বাড়ানো হয়। তবে একই সময়ে ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। জুলাই ও আগস্টেও জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে দেশে।
এদিকে আমদানি ব্যয়ের বড় উত্থান নতুন ব্যয়ের চাপ তৈরি করেছে। বিশ্ববাজারের দামের পাশাপাশি দেশের চাহিদাও এই চাপ বাড়িয়েছে। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
তাই জ্বালানি আমদানি ব্যয় এখন বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় বিষয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে ব্যয়ের কারণ আরও পরিষ্কারভাবে জানা যেত। তবে প্রকাশিত তথ্য জ্বালানি আমদানির ওপর বাড়তি নির্ভরতা দেখাচ্ছে। দাম ও চাহিদার পরিবর্তন ভবিষ্যৎ ব্যয়ের গতিপথ নির্ধারণ করবে। রেকর্ড ব্যয়ের এই পরিস্থিতিতে স্থিতিশীল সরবরাহই এখন বড় বিবেচনা।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com