প্রজন্ম ডেস্ক:
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মাঠকর্মী নিয়োগ পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন উপজেলায়। গত বুধবার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে নাটোরের বাগাতিপাড়া এবং গাইবান্ধার ফুলছড়ি ও সুন্দরগঞ্জে। ইউএনও কার্যালয়সহ কয়েকটি সরকারি দপ্তরে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে। অনিয়মে যুক্ত থাকার অভিযোগ তুলে কর্মকর্তাদের অপসারণের দাবিও উঠেছে বিভিন্ন স্থানে।
ঢাকার নবাবগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকেই মাঠকর্মী নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয় সুপারিশ, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ করার খবর এসেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। কিন্তু একের পর এক বিক্ষোভের ঘটনায় মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মাঠ প্রশাসনে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘তারা বিধিবিধান অনুসরণ করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার চেষ্টা করছেন। তবে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের পছন্দমতো ফল না হলে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।’
নিয়োগের ফল প্রকাশের পরই বিক্ষোভ
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ডশুমারি-২০২৬-এর তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগ। দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবার চিহ্নিত করে তাদের সরকারি সহায়তার আওতায় আনার এই কর্মসূচির মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব যারা পালন করবেন, তাদের বাছাই নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে।
গত বুধবার নাটোরের বাগাতিপাড়ায় নিয়োগের ফল প্রকাশকে কেন্দ্র করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক সোহেল রানার নেতৃত্বে একটি মিছিল উপজেলা পরিষদে গিয়ে ইউএনওর কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয়। অভিযোগ রয়েছে, বিক্ষোভকারীরা ইউএনওর কক্ষের দরজায় লাথি মারেন এবং অফিসের সামনে থাকা ফুলের টব ও চেয়ার ভাঙচুর করেন।
গাইবান্ধার একাধিক উপজেলা ও ঢাকার নবাবগঞ্জে বিক্ষোভ
গাইবান্ধার ফুলছড়িতে নিয়োগ পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরে উপজেলা বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মী এবং নিয়োগে উত্তীর্ণ হতে না পারা ব্যক্তিরা ফল বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ ও কার্যালয় ভাঙচুর করেন।
বিক্ষোভকারীদের একজন সুপারভাইজার পদে আবেদনকারী ফুলছড়ি উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জয়নাল মিয়া জানান, এর আগে তিনি দুবার কাজ করলেও এবার চূড়ান্ত তালিকায় তার নাম নেই।
একই জেলার সুন্দরগঞ্জেও নিয়োগ নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। বিএনপি নেতাকর্মীদের নেতৃত্বে বিক্ষোভকারীরা ইউএনওর কার্যালয়ের মূল ফটক ও উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের দরজায় তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন এবং ইউএনও ও সমাজসেবা কর্মকর্তার বদলির দাবি করেছেন।
পলাশবাড়ীতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিলের পর সড়ক অবরোধ করেন। তাদের অভিযোগ, সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগে রাজনৈতিক পক্ষপাত করা হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগে সাদুল্লাপুরেও ইউএনও কার্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা দেওয়ার ঘটনা ঘটে। সেখানে দুই দফা পরীক্ষা নেওয়ার পর ফল প্রকাশ করা হয়েছিল।
ঢাকার নবাবগঞ্জের ১৪টি ইউনিয়নে ১২৬ জন তথ্য সংগ্রহকারী ও ১৪ জন সুপারভাইজার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ করেছে ছাত্রদল। ঢাকা জেলা দক্ষিণ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম নিরবের নেতৃত্বে উপজেলা ফটকে এ বিক্ষোভ হয়।
নিরবের অভিযোগ, ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহে মাঠকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়ায় কর্তৃপক্ষ আওয়ামী লীগঘেঁষা ব্যক্তিদের প্রাধান্য দিয়েছে। তিনি ওই নিয়োগ বাতিল করে পুনর্নিয়োগের দাবি জানান। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দিলরুবা ইসলাম বলেন, নিয়মনীতি অনুসরণ করেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। নিয়োগের আগে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তথ্য যাচাই-বাছাইও করা হয়েছিল।
অভিযোগের ধরন প্রায় একই
বিভিন্ন উপজেলার ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে অভিযোগের ধরনেও মিল দেখা যায়। কোথাও রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, কোথাও দলীয় সুপারিশকে গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ, আবার কোথাও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও নিয়োগ না পাওয়ার দাবি উঠেছে। কোনো কোনো এলাকায় যে পদে আবেদন করা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তার পরিবর্তে অন্য পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছেÑ এমন অভিযোগও রয়েছে।
ময়মনসিংহের গৌরীপুরে সুপারভাইজার পদে আবেদন করা কেউ তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন, আবার সুপারভাইজার পদে উত্তীর্ণ না হয়েও কেউ নিয়োগ পেয়েছেনÑ এমন অভিযোগও রয়েছে। তবে নিয়োগ কমিটির সভাপতি আফিয়া আমীন পাপ্পা এসব অভিযোগ নাকচ করেছেন। তার বক্তব্য, বিধিমোতাবেক লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং মেধাতালিকায় উত্তীর্ণ ব্যক্তিরাই নিয়োগ পেয়েছেন।
কোথাও তালা, কোথাও অপসারণের দাবি
চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে নিয়োগে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে বিএনপি, ছাত্রদল এবং নিয়োগবঞ্চিত আবেদনকারীরা বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে ইউএনও কার্যালয়সহ কয়েকটি সরকারি দপ্তরে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রায় ২ ঘণ্টা সরকারি দপ্তরের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। বিক্ষোভকারীরা ইউএনও ও সমাজসেবা কর্মকর্তার অপসারণও দাবি করেন।
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতেও নিয়োগ নিয়ে ইউএনও ফারজানা আখতারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ ও কার্যালয় ঘেরাও করা হয়। আন্দোলনকারীরা ইউএনওর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের অভিযোগ তোলেন এবং তার কুশপুতুলে আগুন দেন।
রাজশাহীর গোদাগাড়ী, যশোরের কেশবপুরসহ কয়েকটি উপজেলায়ও পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ করেছেন নিয়োগপ্রত্যাশীরা।
মৌলভীবাজারের রাজনগরেও ফ্যামিলি কার্ডশুমারির স্বেচ্ছাসেবী বাছাইয়ের ফল প্রকাশের পর উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা চলাকালে যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা উপজেলা পরিষদে জড়ো হন। সরকারবিরোধীদের বাছাই করা হয়েছেÑ এ অভিযোগে সেখানে উত্তেজনা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
প্রশাসনের জন্য বড় উদ্বেগ চাপ ও নিরাপত্তা
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে আরেকটি উদ্বেগজনক দিক সামনে এসেছে। সেখানে ইউএনও ও প্রশাসক মো. কায়েসুর রহমানকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে যুবদল নেতা কামরুল হাসান নিসানের বিরুদ্ধে। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে পরে তিনি আরেকটি ভিডিওতে ক্ষমা চেয়েছেন বলে জানা গেছে।
রাজনৈতিক পরিচয় বনাম যোগ্যতা
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির উদ্দেশ্য প্রকৃত দরিদ্র ও প্রয়োজনীয় পরিবারকে শনাক্ত করা। সেই কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নির্বাচনের শুরুতেই যদি রাজনৈতিক পরিচয়কে যোগ্যতার বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ ওঠেÑ তাহলে কর্মসূচির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। যদিও অভিযোগ ও প্রমাণ এক বিষয় নয়।
দ্রুত সমাধান জরুরি
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মাঠকর্মী নিয়োগ নিয়ে একের পর এক উপজেলায় বিক্ষোভের ঘটনায় বিষয়টিকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখার সুযোগ কমে আসছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ওপর রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ। পরিস্থিতি সামাল দিতে হলে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে একদিকে অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে, অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিক্ষোভ ও অসন্তোষের ফলে এই মাঠকর্মী নিয়োগ এখন কেবল নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি মাঠ প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব, সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা এবং জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির বিশ্বাসযোগ্যতার বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। দ্রুত, স্বচ্ছ ও প্রমাণভিত্তিক পদক্ষেপই পারে এই উত্তেজনা কমাতে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com