প্রজন্ম ডেস্ক:
কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা বা দৃশ্যমান কারণ ছাড়াই মঙ্গলবার রাতে আকস্মিকভাবে তিন জেলার জেলা প্রশাসককে (ডিসি) প্রত্যাহার করেছে সরকার। নাটোর, গাইবান্ধা ও রংপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ তিন জেলার শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে এভাবে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা মাঠ প্রশাসনে নতুন এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এটি কেবল রুটিন বদলি নয়, বরং খোলস পাল্টে মাঠ প্রশাসনকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর ইঙ্গিত।
মঙ্গলবার রাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই তিন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করে পরবর্তী পদায়নের জন্য মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। প্রত্যাহার হওয়া এই তিন কর্মকর্তা হলেনÑ নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন, গাইবান্ধার মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা ও রংপুরের মোহাম্মদ রুহুল আমিন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারি করা ওই প্রজ্ঞাপনে তাদের প্রত্যাহারের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি ওই তিন জেলায় নতুন কোনো জেলা প্রশাসককেও নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে শূন্য হওয়া পদগুলো নিয়ে যেমন কৌতূহল তৈরি হয়েছে, তেমনি বিদায়ী ডিসিদের হঠাৎ প্রত্যাহারের নেপথ্য কারণ খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
সরকারের এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত ঘিরে প্রশাসনের অভ্যন্তরে শুরু হয়েছে নানা জল্পনাকল্পনা। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মাঠ প্রশাসনে কর্মকর্তাদের যোগ্যতা, দক্ষতা ও সর্বোপরি রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে পদায়নের বিষয়টি বারবার গুরুত্ব পেয়ে আসছে।
এর আগে জেলা প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানামুখী বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের একটি বড় অংশের অভিযোগ ছিল, আগের সরকারের সময়ে ‘সুবিধাভোগী’ হিসেবে পরিচিত কিছু কর্মকর্তা এখনও মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল তবিয়তে রয়ে গেছেন। যদিও সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তা বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন। তবে নতুন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও ডিসি নিয়োগ ঘিরে বিতর্ক পুরোপুরি থামেনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও প্রশাসনে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের অনুগতদের ডিসি নিয়োগে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই পুরনো বিতর্কেরই পুনরাবৃত্তি ঘটে। ফলে মাঠ প্রশাসনকে সর্বপ্রকার রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা এবং কেবল যোগ্যতার ভিত্তিতে নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের পদায়নের বিষয়টি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মাঠ প্রশাসনের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার অতীত রাজনৈতিক পরিচয় বা ভূমিকা নিয়ে নানা ধরনের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে কিছু কর্মকর্তাকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ বা ‘গোপন রাজনৈতিক পরিচয়ের’ অধিকারী হিসেবে উল্লেখ করে প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে জোর আলোচনা চলছে।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে চরম সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। কোনো কর্মকর্তাকে কেবল গুজবের ভিত্তিতে রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করার আগে নির্ভরযোগ্য তদন্ত, সরকারি নথিপত্র কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য থাকা প্রয়োজন।
তারা উল্লেখ করেন, বর্তমান তিন ডিসিকে প্রত্যাহারের প্রজ্ঞাপনেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, প্রশাসনিক অনিয়ম বা অপরাধের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়নি। ফলে তাদের এই প্রত্যাহারকে সরাসরি কোনো অপরাধ বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অকাট্য প্রমাণ হিসেবে দেখার কোনো আইনি সুযোগ নেই। প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ডিসি প্রত্যাহার ও পরবর্তী পদায়ন একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অংশও হতে পারে। প্রকৃত কারণ জানতে হলে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ কিংবা আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।
তবে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে অন্য কথা। কর্মকর্তাদের অতীত কর্মকাণ্ড, পেশাগত যোগ্যতা ও বর্তমান পদায়ন নিয়ে নাকি পর্দার আড়ালে ব্যাপক যাচাই-বাছাই চলছে। কোনো কোনো গোয়েন্দা সংস্থা মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিষয়ে গভীরভাবে তথ্য সংগ্রহ বা যাচাই করেছে বলেও জোর গুঞ্জন রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছুই জানানো হয়নি।
বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত গণমাধ্যমের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ডিসি হিসেবে পদায়নের আগে বর্তমানে কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও অতীত কর্মকাণ্ড বিবেচনার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে। জেলা প্রশাসক পদটি প্রশাসনিক দিক থেকে রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তম্ভ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, ভূমি ব্যবস্থাপনা, নির্বাচন পরিচালনা থেকে শুরু করে সরকারের নীতি-নির্ধারণী বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকের ভূমিকাই প্রধান। ফলে এই পদে কোনো কর্মকর্তার নিয়োগ বা প্রত্যাহার নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার প্রভাব শুধু সচিবালয়ের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে না; স্থানীয় পর্যায়ে এবং সাধারণ মানুষের মাঝেও এর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া পড়ে।
একসঙ্গে তিন জেলার ডিসিকে প্রত্যাহারের পর প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে এখন একটাই প্রশ্নÑ এটি কি কোনো বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত, নাকি আরও বড় পরিসরে মাঠ প্রশাসন পুনর্বিন্যাসের শুরু? এর উত্তর এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে চলতি বছরে একাধিক দফায় ডিসি প্রত্যাহার ও পুনর্বিন্যাসের ঘটনা ঘটেছে। এর আগে গত মার্চেও পাঁচ জেলার ডিসিকে একযোগে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে নতুন ডিসি নিয়োগ নিয়ে আপত্তি ও বিতর্কের কারণে নিয়োগ বাতিল বা স্থগিত করার মতো নজিরও রয়েছে।
এসব কারণে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, জেলা প্রশাসনে পর্যায়ক্রমে আরও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। যদিও এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সম্ভাব্য তালিকা বা ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের কথা প্রকাশ করা হয়নি।
একসঙ্গে তিন জেলার ডিসিকে প্রত্যাহারের এই সিদ্ধান্তকে মাঠ প্রশাসনের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কঠোর বার্তা হিসেবে দেখছেন প্রশাসন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের মতে, সরকার যদি সত্যিই মাঠ প্রশাসনে বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস করতে চায়, তবে শুধু কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার করলেই চলবে না; নতুন পদায়নের ক্ষেত্রেও শতভাগ স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অতীতে প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল বাংলাদেশের চিরচেনা দৃশ্য। কখনও দলীয় আনুগত্যের অভিযোগে কর্মকর্তাদের সরানো হয়েছে, আবার কখনও নতুন সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর অভিযোগ উঠেছে। এতে বারবার প্রশাসনের পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এবারও যেন একই ধরনের অভিযোগের পুনরাবৃত্তি না হয়, সেটিই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে দক্ষতা, সততা, মেধা, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার ভিত্তিতে পদায়ন করা গেলেই কেবল মাঠ প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়বে।
তিন জেলায় নতুন ডিসি, রাজশাহীতে নতুন বিভাগীয় কমিশনার
এদিকে নাটোর, গাইবান্ধা ও রংপুরে নতুন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে রাজশাহী বিভাগে নতুন বিভাগীয় কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে গতকাল রাতে এ-সংক্রান্ত পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। সে অনুযায়ী, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের উপসচিব মোছা. সুমনী আক্তারকে নাটোরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) ড. মো. মনিরুজ্জামানকে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ইসরাত জাহানকে রংপুরের জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
রাজশাহীতে নতুন বিভাগীয় কমিশনার
রাজশাহী বিভাগে নতুন বিভাগীয় কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের সদস্য-পরিচালক মো. ইউসুফ আলী। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এই আদেশ জারি করা হয়। এর আগে মঙ্গলবার রাজশাহী বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার ড. এ এন এম বজলুর রশীদকে প্রত্যাহার করা হয়।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com