প্রজন্ম ডেস্ক:
এসএসসির ফল প্রকাশের পর পছন্দের কলেজের ফটকে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের দীর্ঘ সারি, উৎকণ্ঠা আর একটি আসনের জন্য মরণপণ লড়াইÑ একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির এই চেনা দৃশ্য গতবারের মতো এবারও অনেকটাই পাল্টে যাচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের হাতে গোনা কয়েকটি নামিদামি কলেজে এবারও সেই চিরচেনা ভিড় দেখা গেলেও, উল্টো দিকে দেশের শত শত কলেজ এবার ধুঁকবে চরম শিক্ষার্থী সংকটে। এমন এক রূঢ় বাস্তবতার মধ্যেই আগামী ২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে একাদশে ভর্তির আবেদন, যা চলবে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী। অথচ ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে একাদশে ভর্তির জন্য দেশে আসন রয়েছে প্রায় সাড়ে ২৫ লাখ! অর্থাৎ পাস করা প্রতিটি শিক্ষার্থী যদি একাদশে ভর্তিও হয়, তারপরও সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে খালি পড়ে থাকবে ১৪ লাখের বেশি আসন। আর যদি ঝরে পড়া বা বিদেশে পাড়ি জমানো শিক্ষার্থীদের হিসাব বাদ দেওয়া হয়, তবে এই শূন্যতা আরও বাড়বে।
এই সংকট কেবল ২০২৬ সালের খাতায় সীমাবদ্ধ নয়, এর প্রমাণ মিলেছে গত শিক্ষাবর্ষেই। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে একাদশ ভর্তির দ্বিতীয় ধাপে দেশের ৪১৩টি কলেজ একজন শিক্ষার্থীও পায়নি! আরও ১০টি প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী পছন্দক্রমই দেয়নি। এই তালিকায় এমনকি রাজধানীর মগবাজার, খিলগাঁও, মোহাম্মদপুর, মতিঝিল ও উত্তরার বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও ছিল। অর্থাৎ একসময়ের ‘ভর্তিযুদ্ধ’ এখন রূপ নিয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ‘টিকে থাকার যুদ্ধে’।
আসনের প্রাচুর্য, অথচ পছন্দসই কলেজের আকাল
এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে পাসের হার ও সংখ্যা কমার কারণে শিক্ষার্থী সংকটে পড়বে অপেক্ষাকৃত কম জনপ্রিয় ও প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। সাধারণ, কারিগরি ও মাদ্রাসাÑ এই তিন ধারার বোর্ডেই এবার প্রায় ৫৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ আসন খালি থাকার আশঙ্কা রয়েছে, যা গতবারের চেয়ে ১৪ শতাংশ বেশি।
তবে আসন উদ্বৃত্ত থাকলেও জিপিএ-৫ পাওয়া সব শিক্ষার্থী তাদের কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারবে না। কারণ মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসন সীমিত। এবার ১১টি বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। এর ফলে ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোতে বরাবরের মতোই তীব্র প্রতিযোগিতা হবে, আর দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলো হাহাকার করবে শিক্ষার্থীর জন্য।
বদলে যাওয়া হিসাব-নিকাশ
এক দশকে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ও পাসের হার কমার প্রবণতা থাকলেও সেই অনুপাতে উচ্চ মাধ্যমিকের প্রতিষ্ঠান ও আসন কমানো হয়নি। ফলে একসময় প্রশ্ন ছিল ‘সবাইকে ভর্তি করার মতো আসন আছে কি না?’, আর এখন প্রশ্ন দাঁড়িয়েছেÑ ‘বিদ্যমান আসনগুলোর আদৌ প্রয়োজন আছে কি না?’ অপরিকল্পিতভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আসন বাড়ানোর ফলেই আজ এই অবকাঠামো অব্যবহৃত সম্পদে পরিণত হচ্ছে।
শিক্ষার্থীরা এখন শুধু একটি আসন নয়, খুঁজছে ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। রাজধানীর মতো জায়গায় যখন কোনো কলেজ শিক্ষার্থীশূন্য হয়ে পড়ে, তখন শুধু আসন সংকট নয়, সামনে আসে ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান, শিক্ষকস্বল্পতা, ফলাফল এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার মতো গুরুতর প্রশ্নগুলো।
‘সক্ষমতা পুনর্মূল্যায়ন দরকার’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে মানের পার্থক্য থাকাটা স্বাভাবিক, তবে সেই ব্যবধান এত বিশাল হওয়া উচিত নয়। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘একদিকে শিক্ষার্থীর উপচে পড়া ভিড়, অন্যদিকে কোনো প্রতিষ্ঠান একজন শিক্ষার্থীও পাচ্ছে নাÑ এটি পুরো শিক্ষাব্যবস্থার জন্যই গভীর উদ্বেগের।’
তার মতে, ‘এই দুর্বলতার পেছনে রয়েছে সম্পদের ঘাটতি এবং শিক্ষকদের দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গির অভাব। শুধু প্রান্তিক পর্যায়ে নয়, রাজধানীতেও এমন অসংখ্য দুর্বল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘নতুন প্রতিষ্ঠান বা অতিরিক্ত আসন তৈরির বদলে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও শিক্ষার মান দ্রুত পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার।’
‘দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইসিইউতে নিতে হবে’
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী এই সংকট সমাধানে থাইল্যান্ডের মডেল অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘থাইল্যান্ডে যেসব স্কুলের ফল খারাপ হয়, সেগুলোকে আইসিইউ বা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। বাংলাদেশেও দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের মূল সমস্যাগুলো বের করতে হবে।’
এবার ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজনও পাস করতে না পারার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘ কেন এমন হলো, এর গভীরে যাওয়া দরকার। অনেক প্রতিষ্ঠানে বাংলা বিষয়ের শিক্ষক ইংরেজি পড়াচ্ছেন। রাষ্ট্র ও পরিবার উভয়েই শিক্ষার পেছনে বিনিয়োগ করছে। এই বিনিয়োগের সুফল পেতে প্রান্তিক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।’
উচ্চশিক্ষাতেও অশনিসংকেত
শিক্ষাবিদদের শঙ্কা, একাদশে শিক্ষার্থী কমার এই প্রভাব শুধু কলেজ পর্যায়েই আটকে থাকবে না, অচিরেই তা বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষাতেও আঘাত হানবে। কলেজে শিক্ষার্থী কমলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাব্য শিক্ষার্থীও কমবে। এর ফলে অবকাঠামোর ব্যবহার, অর্থায়ন এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর টিকে থাকা নিয়ে নতুন সংকটের তৈরি হবে। তবে একই সঙ্গে এটিকে সুযোগ হিসেবেও দেখছেন তারা। শিক্ষার্থী কমলে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত উন্নত করা এবং গবেষণায় বেশি মনোযোগ দেওয়া সম্ভব।
২ সেপ্টেম্বর থেকে আবেদন
২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া ভর্তি কার্যক্রমে এবারও কলেজভিত্তিক কোনো ভর্তি পরীক্ষা থাকছে না। এসএসসি পরীক্ষার ফল, পছন্দক্রম এবং কোটা বিবেচনায় কেন্দ্রীয়ভাবে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হবে। একজন শিক্ষার্থী সর্বনিম্ন পাঁচটি এবং সর্বোচ্চ ১০টি কলেজ পছন্দ করতে পারবে।
মোট আসনের ৯৩ শতাংশ সাধারণ শিক্ষার্থীদের মেধার ভিত্তিতে উন্মুক্ত থাকবে। বাকি ৭ শতাংশের মধ্যে ৫ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের এবং ২ শতাংশ শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এর অধীনস্থ কর্মীদের সন্তানদের জন্য সংরক্ষিত। প্রথম দফায় নির্বাচিতদের ফল প্রকাশ হবে ১৭ সেপ্টেম্বর এবং ক্লাস শুরু হবে ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে।
এবার একাদশে ভর্তি কেবল কে কোন কলেজে সুযোগ পেল, তার গল্প নয়। একদিকে নামিদামি কলেজের ফটকে একটি আসনের জন্য অসংখ্য স্বপ্নের অপেক্ষা, আর অন্যদিকে দুর্বল কলেজগুলোতে একটি মুখের জন্য খালি বেঞ্চের দীর্ঘশ্বাসÑ এই দুই বিপরীত বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়েই এখন নির্ধারিত হবে দেশের উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার ভবিষ্যৎ।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com