প্রজন্ম ডেস্ক:
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন নগরীতে বিধিমালার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণ করলে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানিসহ সব ধরনের ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া, বিধিমালাবহির্ভূত নির্মাণকাজ ঠেকাতে ভবন পরিদর্শন ও উচ্ছেদ অভিযান জোরদার করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে দেশের বিভিন্ন নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলো।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের গত আগস্ট মাসের দপ্তর ও সংস্থাগুলোর সমন্বয় সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। গত ১৯ আগস্ট মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব মো. ওবায়দুল রহমান। সভার কার্যবিবরণী সূত্রে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলি জানা গেছে।
ভবন পরিদর্শন ও তদারকি জোরদারের সিদ্ধান্ত
মন্ত্রণালয়ের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নকশাবহির্ভূত বা অবৈধ ভবনে অভিযান পরিচালনার পর চিহ্নিত ত্রুটিগুলো অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী আদৌ সংশোধন করা হয়েছে কি না— তা নিয়মিত তদারকি করে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সংস্থাগুলোকে। একই সঙ্গে সব উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে ভবন পরিদর্শনের সার্বিক সংখ্যা বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে পূর্ববর্তী মাসের তুলনায় চলতি মাসে কতটি ভবন পরিদর্শন করা হয়েছে, তার তুলনামূলক চিত্র ছক আকারে প্রতি মাসে জমা দিতে হবে।
এছাড়া, তদারকির গতি বাড়াতে ইমারত পরিদর্শকের শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরিদর্শকদের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিতে তাদের নির্দিষ্ট এলাকা ও ভবন চিহ্নিত করে দায়িত্ব বণ্টন করে দেওয়া হবে।
বিধিমালা লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণ ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে মন্ত্রণালয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণ করলে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ভবনের গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানিসহ সব ধরনের ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে। এই নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষসহ (জাগৃক) দেশের সব উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ভবন তদারকি জোরদার করতে ইমারত পরিদর্শকের শূন্য পদগুলোতে দ্রুত নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্ত পরিদর্শকদের সুনির্দিষ্ট ভবন ও এলাকার দায়িত্ব বণ্টন করে দেওয়া হবে। এছাড়া, অবৈধ ভবনে অভিযান পরিচালনার পর অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ত্রুটিগুলো সংশোধন করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সংস্থাকে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। বিধিমালা না মেনে ভবন নির্মাণ রোধে জনসচেতনতা বাড়াতে ব্যাপকভাবে প্রচার-প্রচারণা চালানোর নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি এ সংক্রান্ত কাজের তথ্যও মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
নতুন সংস্থা কার্যকর ও জনবল নিয়োগের সিদ্ধান্ত
সভায় নবগঠিত ছয়টি নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ ভবন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বিবিআরএ) এবং বাংলাদেশ স্থাপত্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিইএসআরআই) দ্রুত কার্যকর করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, অনতিবিলম্বে এসব নতুন প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের সাংগঠনিক কাঠামো এবং নিয়োগ বিধিমালা অনুমোদন করে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা নিতে হবে।
উক্ত সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য নবগঠিত ছয়টি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা-১ ও ২-এর যুগ্মসচিব এবং বিইএসআরআই-এর বোর্ড অব ট্রাস্টির সদস্যসচিবকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।
অকুপেন্সি সার্টিফিকেট গ্রহণ বাধ্যতামূলক করার নির্দেশ
সব ভবন মালিক যাতে শতভাগ ‘অকুপেন্সি সার্টিফিকেট’ (বসবাস বা ব্যবহার উপযোগী সনদ) গ্রহণ করেন, তা নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে সভায়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভবনের নকশা অনুমোদনের পত্রেই অকুপেন্সি সার্টিফিকেট সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় শর্ত যুক্ত করা হবে। পাশাপাশি তদারকি বাড়াতে প্রতি মাসে প্রদান করা সনদের সংখ্যা ছক আকারে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন হিসেবে জমা দিতে হবে, যেখানে পূর্ববর্তী মাসের সঙ্গে একটি তুলনামূলক চিত্র থাকবে।
ভবন নির্মাণকাজ শেষে এই সনদ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। উক্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা-২, ৩ ও ৪-এর উপসচিব এবং সব উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
জমির রেকর্ড ও নামজারি দ্রুত সম্পন্নের নির্দেশ
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সব দপ্তর ও সংস্থার মালিকানাধীন জমির গেজেট প্রকাশ, দখল নিশ্চিতকরণ এবং নামজারি দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সভায়।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিটি দপ্তর ও সংস্থাকে নিজ নিজ মালিকানাধীন সব জমির নামজারি ও রেকর্ডভুক্তির কাজ অনতিবিলম্বে শেষ করতে হবে। কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনার জন্য প্রতি মাসে কতটুকু জমির নামজারি ও রেকর্ড সম্পন্ন হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট বিবরণ ছক আকারে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন হিসেবে পেশ করতে হবে। মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সব দপ্তর ও সংস্থাকে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অব্যবহৃত জমি উদ্ধার ও অবৈধ দখল উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত
সভায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন অব্যবহৃত জমি উদ্ধারের বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সরকারি ভূমি উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর ও সংস্থাকে আরও তৎপর হতে হবে এবং দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিটি সংস্থাকে তাদের আওতাধীন অব্যবহৃত জমির বিস্তারিত তথ্য নির্ধারিত ছক আকারে পরবর্তী সমন্বয় সভায় দাখিল করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি জমিতে থাকা সব ধরনের অবৈধ দখল উচ্ছেদে কঠোর অভিযান পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত হয়।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সব দপ্তর ও সংস্থাকে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা শেষে সভায় বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আগামী এক বছরের কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানোর লক্ষ্যে গঠিত কমিটির সভা দ্রুত আহ্বান করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ১৮০ দিনের নির্ধারিত কর্মসূচির শতভাগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এছাড়া, ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার যেসব কাজ শতভাগ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি, সেগুলোকে আগামী এক বছরের কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সব দপ্তর, সংস্থা ও কর্তৃপক্ষের প্রধান এবং সংশ্লিষ্ট ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সভায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ই-সেবা কার্যক্রম বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়া শতভাগ অনলাইনে সম্পন্ন করতে হবে এবং আবেদন জমা পড়ার ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রমাণকসহ বিস্তারিত তথ্য প্রতি মাসের সমন্বয় সভায় পেশ করতে হবে। এছাড়া, মন্ত্রণালয়সহ এর আওতাধীন সব দপ্তর ও সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবপোর্টাল নিয়মিত হালনাগাদ করার তাগিদ দেওয়া হয়। নাগরিক ভোগান্তি কমাতে পর্যায়ক্রমে সব ধরনের সেবা ডিজিটাল বা ই-সেবায় রূপান্তর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন-১), সব দপ্তর ও সংস্থা প্রধান এবং আইসিটি শাখার সিস্টেম অ্যানালিস্টকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সভায় ই-টেন্ডারিং কার্যক্রমের বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা করে নতুন ‘পিপিআর ২০২৫’ কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সব দপ্তর ও সংস্থাকে নতুন এই পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) মেনেই সরকারি ক্রয় কার্যক্রম সম্পাদন করতে হবে। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অনুবিভাগ) এবং সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর-সংস্থা প্রধানকে।
অন্যদিকে, পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে, মন্ত্রণালয়ের পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা অধিশাখার সার্বিক তত্ত্বাবধানে পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা বোর্ড ও গণপূর্ত অধিদপ্তর যৌথভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ ও রেজিস্ট্রার প্রস্তুত করবে।
সভায় মাঠপর্যায়ে উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের সার্বিক অগ্রগতি নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। কার্যবিবরণী অনুযায়ী, উন্নয়ন প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিতকরণ এবং কাজের গতি বাড়ানোর লক্ষ্যে সব দপ্তর ও সংস্থা প্রধানকে নিয়মিত মাঠপর্যায়ে প্রকল্প পরিদর্শনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিদর্শনের পর প্রকল্পের সার্বিক অবস্থা তুলে ধরে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রস্তুতের পাশাপাশি সেই প্রতিবেদনের কপি মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে হবে।
একই সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে প্রকল্প পরিদর্শনের তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উক্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সব দপ্তর ও সংস্থা এবং পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অধিশাখা-২-এর যুগ্মসচিবকে প্রয়োজনীয় দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com