প্রজন্ম ডেস্ক:
জাতীয় সংসদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদার ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে পাঁচটি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে এমন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সংবিধান ও কার্যপ্রণালী বিধিতে এ বিষয়ে কোনো বিধিনিষেধ না থাকলেও সংসদীয় ইতিহাসে এটি বিরল ঘটনা। অভিজ্ঞরা বলছেন, পার্লামেন্টারি প্র্যাকটিসে দীর্ঘদিনের রেওয়াজকে আইনের মতোই অনুসরণ করা হয়। সেই রেওয়াজ ভঙ্গ করাকে সংসদীয় ভাষায় ‘ব্যাড প্র্যাকটিস’ হিসেবে দেখা হয়।
জাতীয় সংসদের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপনকে। তিনি সরকারের তথ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। গত ২১ আগস্ট মন্ত্রিসভার রদবদলে তাকে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়। জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে তাকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে।
সংসদীয় কমিটির সভাপতিদের রাষ্ট্রীয় কোনো প্রটোকল না থাকলেও তারা গাড়িতে জাতীয় সংসদের পতাকা ব্যবহার ও নিরাপত্তার জন্য গানম্যান পেয়ে থাকেন। মন্ত্রী পদমর্যাদার ব্যক্তি হওয়ায় জহির উদ্দিন স্বপনের গাড়িতে জাতীয় পতাকা ব্যবহারের প্রাধিকার রয়েছে। তবে সংসদীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে পাওয়া ‘জাতীয় সংসদের পতাকা’ তিনি ব্যবহার করছেন না।
একইভাবে জাতীয় সংসদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি করা হয়েছে আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে। বিরোধী দলের উপনেতা হিসেবে তিনি সরকারের প্রতিমন্ত্রীর সমমর্যাদা ভোগ করেন। রাজধানীর বাইরে তিনিও জাতীয় পতাকা ব্যবহারের জন্য প্রাধিকারপ্রাপ্ত। সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুলকে। জাতীয় সংসদের হুইপরা সাধারণত প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা ভোগ করেন। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে সংসদের আরেক হুইপ আকতারুজ্জামানকে। এ ছাড়া পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে হুইপ জিকে গউছকে।
রাষ্ট্রীয়ভাবে পদমর্যাদা ভোগ করা ব্যক্তিদের এভাবে সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যেকেরই আলাদা দায়িত্ব রয়েছে। এর সঙ্গে সংসদীয় কমিটির সভাপতির মতো দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের বিশেষ কোনো মর্যাদা দেওয়া হয়নি। বরং সংসদ সদস্যরা এ পদে দায়িত্ব পেলে তারা আরও নিবিড়ভাবে কাজ করার সুযোগ পেতেন। এতে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হতো বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
এর আগে নজিরবিহীনভাবে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়েছে। মীর শাহে আলম তার মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডের জন্য যেখানে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটির কাছে জবাবদিহি করবেন, সেখানে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহিতার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি বিদ্যমান সংসদীয় রীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এর আগে অষ্টম জাতীয় সংসদে কৃষিপ্রতিমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে সরকারি হিসাব কমিটির সদস্য করা হলে বিতর্কের মুখে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। কার্যপ্রণালী বিধির ১৮৮ (২) বিধিতে বলা হয়েছে, ‘এমন কোনো সদস্য কমিটিতে নিযুক্ত হইবেন না, যাহার ব্যক্তিগত, আর্থিক ও প্রত্যক্ষ স্বার্থ কমিটিতে বিবেচিত হইতে পারেÑ এমন বিষয়ের সহিত সংশ্লিষ্ট আছে। কিংবা কোনো কমিটিতে কাজ করিতে অনিচ্ছুক সদস্যকেও অনুরূপ কমিটিতে লওয়া যাইবে না। প্রস্তাবককে অবশ্যই জানিয়া লইতে হইবে যে, তিনি যে সদস্যের নাম প্রস্তাব করিবেন, সেই সদস্য অনুরূপ কমিটিতে কাজ করিতে রাজি আছেন।’
এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ‘এই উপ-বিধিতে সদস্যের স্বার্থ বলিতে প্রত্যক্ষ, ব্যক্তিগত বা আর্থিক স্বার্থ বুঝাইবে এবং এমন কোনো ব্যক্তি কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হইবেন না, যাহার অন্তর্ভুক্তিতে আপত্তি রহিয়াছে এবং যাহার অন্তর্ভুক্তি সাধারণভাবে জনস্বার্থের অনুকূলে নয়, অথবা কোনো শ্রেণি বিশেষ অথবা উহার অংশের পরিপন্থী, অথবা রাষ্ট্রীয় নীতি অনুযায়ী যাহার অন্তর্ভুক্তিতে আপত্তি রহিয়াছে।’
জাতীয় সংসদের অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক মো. কামরুল ইসলাম বলেন, সংসদ চলে সংবিধান, কার্যপ্রণালী বিধি ও রেওয়াজ দিয়ে। পার্লামেন্টারি প্র্যাকটিসে দীর্ঘদিনের রেওয়াজকে আইনের মতোই অনুসরণ করা হয়। এটি ভঙ্গ করা ‘ব্যাড প্র্যাকটিস’। সংসদীয় ভাষায় ‘ব্যাড প্র্যাকটিস’ নিন্দনীয়। তার নিয়োগের মাধ্যমে সংসদের একটি প্রতিষ্ঠিত রেওয়াজ ভঙ্গ করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদের বিদ্যমান কার্যপ্রণালী বিধিতে নানা অসঙ্গতি রয়েছে। এর মধ্যে এটিও একটি। এ ছাড়া সংসদীয় কমিটির সুপারিশ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়নের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। ফলে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকেও কম গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়ে থাকে। আবার ভিন্ন অর্থে দেখলে, বিগত সময়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে যে মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডে সংসদীয় কমিটির সদস্যরা অযাচিত প্রভাব বিস্তার করে থাকেন।
প্রসঙ্গত, ১৯৯৭ সালের আগে জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটিতে সভাপতির দায়িত্ব পালন করতেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। সরকারের কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্য সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি নিয়োগের বিধান করা হয়। ওই কমিটিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে মন্ত্রিসভার সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ২০০৯ সালে জাতীয় সংসদের হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটনকে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছিল। কিছুদিন পরেই তাকে বাদ দেওয়া হয়। তবে এবার তিনজন হুইপ, বিরোধী দলের উপনেতা এবং মন্ত্রী পদমর্যাদার প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি নিয়োগের মধ্য দিয়ে নতুন উদাহরণ সৃষ্টি হলো।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com