প্রজন্ম ডেস্ক:
২০১৫ সালের ১০ নভেম্বর রাতে গলা কেটে হত্যা করা হয় মাজার শরিফের খাদেম রহমত আলীকে। এ মামলায় ২০১৮ সালের ১৮ মার্চ রংপুরের বিশেষ জজ আদালতের বিচারক নরেশ চন্দ্র সরকার ৭ আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন।
একই বছর মামলাটি হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়। প্রায় ৮ বছর পর ২০২৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে এ মামলার রায় হয়। এর মানে নিম্ন আদালতে কারও ফাঁসির রায় হলে সাধারণ নিয়মে হাইকোর্টে তার শুনানি আসতে ৬ থেকে ৮ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়।
বিচার ব্যবস্থার একটি বহুল আলোচিত বিষয় এই ডেথ রেফারেন্স। ফৌজদারি মামলায় বিচারিক আদালত কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ড দিলে সেটি কার্যকরের জন্য হাইকোর্টের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এজন্য সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুযায়ী মামলার সব নথি হাইকোর্টে পাঠিয়ে দেন। এই কার্যক্রমই পরিচিত ‘ডেথ রেফারেন্স’ নামে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ডেথ রেফারেন্স অর্থাৎ বিচারিক আদালত মামলার রায়, এজাহার, চার্জশিট, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও সমস্ত নথিপত্র আসার পর হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখা সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সংশ্লিষ্ট মামলার পেপারবুক তৈরি করে। কোনো কোনো মামলার ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির নির্দেশে অগ্রাধিকার ভিত্তিতেও পেপারবুক প্রস্তুত করা হয়।
সুপ্রিম কোর্ট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই ডেথ রেফারেন্স মামলার সংখ্যা চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত ছিল এক হাজার ২৫০টি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু মামলার নিষ্পত্তি হওয়ায় এ সংখ্যা কিছুটা কমেছে। মাত্র পাঁচটি ডেথ রেফারেন্স বেঞ্চকে এই অসংখ্য মামলার ভার সামলাতে হচ্ছে। প্রতি বছর নিম্নআদালত থেকে যতগুলো ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে, নিষ্পত্তির হার তার চেয়ে অনেক কম।
ডেথ রেফারেন্স মামলাগুলোর ধীর গতির পেছনে রয়েছে বেশ কিছু কারণ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো— সরকারি ছাপাখানা বা বিজি প্রেস থেকে মামলার বিবরণী বা ‘পেপারবুক’ ছাপা হয়ে আসতে লম্বা সময় লাগা। আইনজীবীরা বলছেন, প্রধান বিচারপতি নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠন করায় কয়েকটি আলোচিত মামলার রায়, যেমন নুসরাত বা আছিয়া হত্যা মামলা রায় মাত্র কয়েক মাসে এসেছে। কিন্তু এর ফলে পেছনের সাধারণ খুন বা ডাকাতির ১,২০০-এর বেশি মামলা যে অবহেলিত হচ্ছে, সেই চিত্রও প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। উচ্চ আদালতে স্থায়ী বিচারক নিয়োগে ধীরগতি এবং ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য ডেডিকেটেড স্থায়ী বেঞ্চের অপর্যাপ্ততাও এসব মামলার ধীর গতির বিশেষ কারণ।
কনডেম সেলে থাকা বন্দিদের কষ্ট
এদিকে আইনজীবীরা বলছেন, অসংখ্য ডেথ রেফারেন্স মামলা ঝুলে থাকায় কনডেম সেলে থাকা বন্দিদের মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, উচ্চ আদালত থেকে মৃত্যুদণ্ড চূড়ান্তভাবে বহাল না হওয়া পর্যন্ত কোনো বন্দিকে নিশ্চিতভাবে ‘মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী’ বলা যায় না। অথচ নিম্নআদালতের রায়ের পর পরই বছরের পর বছর এই আসামিদের ১২ বাই ১২ ফুটের সংকীর্ণ ও অন্ধকার কনডেম সেলে দিনে ২৩ ঘণ্টা বন্দি রাখা হচ্ছে। এদের একেকজনকে ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত এই সেলে কাটাতে হচ্ছে। অনেক বন্দিই মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করার এই তীব্র মানসিক চাপ সহ্য করতে পারেন না। আইনজ্ঞরা বলছেন, হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স শুনানির পর দেখা যায়, নিম্নআদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অনেক আসামিই নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে সম্পূর্ণ খালাস পান অথবা তাদের সাজা কমে যাবজ্জীবন হয়। বছরের পর বছর কনডেম সেলে মৃত্যুর প্রহর গোনার পর নির্দোষ প্রমাণিত হলেও তাকে এই ট্র্যাজেডি এবং মানসিক ক্ষত বহন করতে হয়।
আপিলে ঝুলে আছে রায়
এদিকে মৃত্যুদণ্ড চূড়ান্ত হওয়ার আগে দণ্ডিত বা দণ্ডিতদের কনডেম সেলে রাখার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০২১ সালের ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে রিট করেন চট্টগ্রাম, সিলেট ও কুমিল্লা কারাগারের কনডেম সেলের তিন কয়েদি। ওই রিট শুনানি করে ২০২২ সালের ৫ এপ্রিল রুল জারি করেন হাইকোর্ট। পরে ২০২৪ সালের ১৩ মে রুল যথাযথ ঘোষণা করে দেওয়া রায়ে বলা হয়, মৃত্যুদণ্ড চূড়ান্ত হওয়ার আগেই নির্জন সেলে আসামিকে দীর্ঘদিন রেখে দেওয়া সংবিধান ও ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা অনুমোদন করে না। রায়ে কনডেম সেলে থাকা আসামিদের পর্যায়ক্রমে দুই বছরের মধ্যে সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে রাখার ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের ওই রায় স্থগিত করেন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত। এরপর নিয়মিত আপিল করা হয়। যা দুই বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে মৃত্যুদণ্ড চূড়ান্ত হওয়ার আগে থেকেই আসামিদের থাকতে হচ্ছে কনডেম সেলে।
ডেথ রেফারেন্স বেঞ্চগুলোর সক্ষমতা
হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্সের জন্য নির্ধারিত ৫টি বেঞ্চের প্রতিটির দৈনিক কার্য তালিকায় সাধারণত ৩ থেকে ৫টি ডেথ রেফারেন্স মামলা শুনানির জন্য রাখা হয়। একটি মামলার পেপারবুক বা বিবরণী শত শত পৃষ্ঠার হয়ে থাকে। রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের দীর্ঘ যুক্তি তর্ক ও সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনার কারণে একটি মামলার শুনানি শেষ হতে কয়েক দিন, এমনকি কয়েক সপ্তাহও লেগে যায়। সুপ্রিম কোর্টের ডেথ রেফারেন্স পরিচালনাকারী আইনজীবীদের তথ্যমতে, হাইকোর্টের একটি সাধারণ ডেথ রেফারেন্স বেঞ্চ বছরে সর্বোচ্চ ৩৫ থেকে ৪০টি মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করতে পারে। সেই হিসাবে ৫টি বেঞ্চ মিলে সারা বছরে ১৫০ থেকে ২০০টি মামলা নিষ্পত্তি হয়। ১ বছরে কার্যদিবস থাকে প্রায় ২৪০ দিন। অর্থাৎ সব বেঞ্চ মিলিয়ে গড়ে প্রতি কার্যদিবসে একটিরও কম (আনুমানিক ০.৫ থেকে ০.৮টি) ডেথ রেফারেন্স মামলার চূড়ান্ত রায় বা নিষ্পত্তি সম্ভব হয়।
বিশেষজ্ঞ অভিমত
এ বিষয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘শুধু ডেথ রেফারেন্সের মামলা নয়, জনগুরুত্বপূর্ণ অনেক মামলাই পেন্ডিং আছে। গত ২০ বছরে বিভিন্ন কারণে নিম্নআদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সংখ্যা বেড়েছে। একটা মামলায় যদি ২০ জন ফাঁসি হয়, আপিলও কিন্তু ২০টা হবে। রেফারেন্স একটা হবে। অর্থাৎ মোট ২১টি আপিল হবে। সবগুলো মামলা কিন্তু পেন্ডিং। এগুলোর শুনানির জন্য আবার হাইকোর্টের নিয়ম অনুসারে পেপারবুক তৈরি করতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘১২০০ মামলার মধ্যে প্রায় ৯০০ মামলার পেপার বুক এখনও তৈরি হয়নি। তার মানে এসব মামলার শুনানিও হবে না। ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানির গতি বাড়াতে হলে নিম্নআদালতকে বিচারের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে হবে। আর ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য কোর্টের সংখ্যা বাড়াতে হবে। এ বিষয়গুলো সমন্বয় করা গেলে ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানিতে গতি আসবে।’
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা বলেন, ‘আমাদের দেশে ফৌজদারি কার্যবিধির যে ধারায় ডেথ রেফারেন্স কনফার্মেশনের জন্য ফাইল করা হয়, সেটা ১৮৯০/৯১ সালের একটি আইনের অধীনে। এই আইনটাকে যেসব দেশ নতুন করে চিন্তা করেছে, আমরা তাদের থেকে পিছিয়ে আছি। ভারত-পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ এই ডেথ রেফারেন্সকে অপেক্ষাকৃত নিম্নতম অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছে। আইনের অনুশীলনে যদি উচ্চ আদালত থেকে নতুন কিছু ‘ডকট্রিন’, নতুন কিছু ‘থিওরি’ ডেভেলপ করা যায়, তা হলে অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও ডেথ রেফারেন্স কমিয়ে ফেলা সম্ভব। আমাদের এখানে বার এবং সরকারের প্রসিকিউশন থেকে কার্যকরী অংশগ্রহণ নাই। ফলে বিচারিক কাজকর্ম উচ্চমানের হচ্ছে না।’
ডেথ রেফারেন্স মামলা সম্পর্কিত কার্যক্রমে সম্পৃক্ত সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল আল আমিন সিদ্দিকী বলেন, ‘চলমান ডেথ রেফারেন্স বেঞ্চগুলো পূর্ণ গতিশীলভাবে কাজ করছে। তবে অপেক্ষমাণ ডেথ রেফারেন্স মামলাগুলোর গতি বাড়াতে হলে বেঞ্চ আরও বাড়াতে হবে।’
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com