প্রজন্ম ডেস্ক:
গর্ভাবস্থা যেকোনো নারীর জন্যই একটি বিশেষ ও আনন্দময় সময়। তবে এই আনন্দময় সময়ে অনেক মায়ের শরীরেই বাসা বাঁধে নানা ধরনের জটিলতা, যার মধ্যে অন্যতম হলো গর্ভকালীন ডায়াবেটিস। সম্প্রতি বাংলাদেশের গর্ভবতী নারীদের ওপর পরিচালিত এক বৃহৎ পরিসরের গবেষণায় গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিয়ে অত্যন্ত উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। স্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষণা সাময়িকী দ্য ল্যানসেট রিজিওনাল হেলথÑ সাউথইস্ট এশিয়ায় শুক্রবার প্রকাশিত এ গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোয় মাতৃকালীন স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা নারীদের উল্লেখযোগ্য অংশ গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তশর্করা (হাইপারগ্লাইসেমিয়ায়) ভুগছেন।
ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (বাডাস) সেন্টার ফর গ্লোবাল হেলথ রিসার্চ ও ন্যাশনাল হেলথকেয়ার নেটওয়ার্ক এবং বারডেম জেনারেল হসপিটাল অ্যান্ড ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজের ১৮ জন গবেষক যৌথভাবে এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন। ল্যানসেটে প্রকাশিত গবেষণা নিবন্ধটির প্রথম লেখক ডা. বিশ্বজিৎ ভৌমিক। এ গবেষণার বিষয়ে কথা বলেছেন দলটির অন্যতম গবেষক অধ্যাপক ডা. সামছাদ জাহান শেলী, বর্তমানে যিনি ইউনাইটেড হেলথকেয়ার/ ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজে অধ্যাপনা করছেন।
গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসের প্রাদুর্ভাব এবং এর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ঝুঁকির কারণগুলো চিহ্নিত করার তাগিদ আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে পরিলক্ষ করা যায়। একই লক্ষ্যে বিশ্বজিৎ, শেলী ও তাদের সতীর্থ গবেষকরা দেশব্যাপী একটি সমীক্ষা চালান। এই গবেষণার ফলাফল শুধু চিকিৎসকদের জন্যই নয়, বরং সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এবং নীতিনির্ধারকদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস সম্পর্কে জানা যেজন্য জরুরি
গর্ভাবস্থার আগেই নারীরা ডায়াবেটিসে (প্রিজেস্টেশনাল ডায়াবেটিস মেলাইটাস বা পিডিএম) আক্রান্ত থাকতে পারেন। আবার, অন্তঃসত্ত্বা নারীরা নতুনভাবে দুই ধরনের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারেন। এক. জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস মেলাইটাস বা জিডিএম এবং দুই. ডায়াবেটিস ইন প্রেগন্যান্সি হিসেবে বা ডিআইপি। একজন সুস্থ মা মানে একটি সুস্থ প্রজন্ম। তাই অন্তঃসত্ত্বা নারীর গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিয়ে সচেতন হওয়া খুবই জরুরি। বাংলাদেশে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের মধ্যে জিডিএম ও ডিআইপির সামগ্রিক প্রাদুর্ভাব বা বিস্তারের হার নির্ণয় করতে এই গবেষণার উদ্যোগ নিয়েছিলেন ডা. বিশ্বজিৎ ভৌমিকের দল।
গর্ভাবস্থায় প্রথমবারের মতো রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে গেলে তাকে জিডিএম বলা হয়। এটি মা ও নবজাতক উভয়ের জন্যই মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এই অবস্থার কারণে গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ (প্রি-এক্লাম্পসিয়া), শিশুর অতিরিক্ত ওজন (ম্যাক্রোসোমিয়া) এবং নবজাতকের রক্তে শর্করা কমে যাওয়ার (নিওনেটাল হাইপোগ্লাইসেমিয়া) মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। শুধু তাই নয়, এর ফলে মা ও শিশু উভয়েরই সারাজীবনের জন্য টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।
গত কয়েক বছরের একাধিক গবেষণা থেকে ধারণা পাওয়া গেছে, দক্ষিণ এশিয়া এবং বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দ্রুত নগরায়ণ, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, স্থূলতা বৃদ্ধি ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের হার বাড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশে এই ডায়াবেটিসের হার ঠিক কত এবং কোন কোন কারণে নারীরা বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন, তা সুনির্দিষ্টভাবে খুঁজে বের করাই ছিল ডা. শেলীদের গবেষণার মূল উদ্দেশ্য। গ্লুকোজ চ্যালেঞ্জ টেস্ট (জিসিটি) নামক একটি প্রাথমিক স্ক্রিনিং পদ্ধতির কার্যকারিতা মূল্যায়ন করাও এই গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। পূর্বে বাংলাদেশে পরিচালিত আটটি গবেষণার একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা গিয়েছিল, জিডিএমের প্রকোপ প্রায় ১৩ শতাংশ। তাই নতুন ও আরও বৃহৎ পরিসরে এই চিত্রটি কেমন, তা যাচাই করা অপরিহার্য ছিল।
দেশব্যাপী সমীক্ষা
গবেষণাটি দেশব্যাপী ২০১৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে পরিচালিত হয়। এতে বাংলাদেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগের ৬৪টি জেলা থেকে মোট ৬ হাজার ৬৩১ জন গর্ভবতী নারী অংশ নেন। বাডাসের অধিভুক্ত ৭০টি কেন্দ্রে নিয়মিত মাতৃকালীন সেবা (অ্যান্টিনেটাল কেয়ার) নিতে আসা ২৪ থেকে ২৮ সপ্তাহের গর্ভবতী নারীদের এই গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গবেষণায় দ্বিধাপ স্ক্রিনিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, যেখানে প্রথমে ৫০ গ্রাম গ্লুকোজ চ্যালেঞ্জ টেস্ট (জিসিটি) এবং পরবর্তীতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৩ সালের মানদণ্ড অনুযায়ী ৭৫ গ্রাম ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট (ওজিটিটি) করা হয়।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের চিত্র
গবেষণার ফলাফলে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারী নারীদের মধ্যে ১৯.৪ শতাংশ জিডিএমে ও ৮.১ শতাংশ ডিআইপিতে আক্রান্ত। অর্থাৎ সব মিলিয়ে প্রায় ২৭.৫ শতাংশ নারী গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তশর্করার সমস্যায় ভুগছেন। গবেষণায় গ্রামের তুলনায় শহরের নারীদের মধ্যে এই ডায়াবেটিসের হার অনেক বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে। জিডিএমের ক্ষেত্রে শহরে এই হার ২৪.৪ শতাংশ, যেখানে গ্রামে তা ১২.৬ শতাংশ। অন্যদিকে, ডিআইপির ক্ষেত্রে শহরে এই হার ১১.০ শতাংশ এবং গ্রামে ৪.১ শতাংশ।
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জিডিএমের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি খুলনা বিভাগে, যা প্রায় ৩১.২ শতাংশ। এরপর রয়েছে ময়মনসিংহ (২৬.২%) এবং রাজশাহী (২০.১%); সবচেয়ে কম প্রকোপ দেখা গেছে রংপুর বিভাগে (১৪.৬%)। অন্যদিকে ডিআইপিরর প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি রাজশাহীতে (১০.৭%) ও সিলেটে (১০.৬%)।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের জন্য বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিষয়গুলো এই রোগের প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে, তা হলো : শহরাঞ্চলে বসবাস করা, অতিরিক্ত শারীরিক ওজন বা উচ্চ বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই), পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকা এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অর্থাৎ দিনে ৩০ মিনিটের কম সময় হাঁটা বা কায়িক শ্রম করা। এই ঝুঁকিগুলো যাদের মধ্যে যত বেশি একসাথে বিদ্যমান, তাদের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও তত বেশি বৃদ্ধি পায়।
সমাধানে গবেষণালব্ধ সুপারিশ
এই গবেষণার অন্যতম গবেষক ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ ও ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের অধ্যাপক ডা. সামছাদ জাহান শেলী বলেন, ‘আমাদের গবেষণার ফলাফল থেকে প্রতীয়মান হয় যে, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস একটি মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সংকট। বিশেষ করে শহুরে নারীদের জীবনযাপনে পরিবর্তন ও স্থূলতা এবং কায়িক শ্রমের অভাব এই ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সঠিক সময়ে স্ক্রিনিং ও সচেতনতাই হতে পারে এই রোগ প্রতিরোধের কার্যকর কৌশল।’
বাংলাদেশে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস মা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উভয়ের জন্যই দীর্ঘমেয়াদি হুমকি। এই ঝুঁকি কমাতে গর্ভবতী নারীদের জীবনাচরণ পরিবর্তন আনা অতীব জরুরি। শারীরিক ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা ও গর্ভাবস্থায় নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম বা হাঁটাচলা করার মতো বিষয়গুলো যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা এই গবেষণা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে। এই গবেষণার সবচেয়ে বড় প্রয়োগ হবে দেশের মাতৃকালীন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায়। গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস নির্ণয়ের জন্য দেশব্যাপী একটি সর্বজনীন স্ক্রিনিং বা পরীক্ষা ব্যবস্থা রুটিন চেকআপের অংশ হিসেবে চালু করা উচিত। বিশেষ করে গ্লুকোজ চ্যালেঞ্জ টেস্ট পদ্ধতিটি অত্যন্ত কার্যকর এবং এটি বাংলাদেশের মতো সীমিত সম্পদের দেশের জন্য একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে।
যেসব গবেষক এই সমীক্ষাটি পরিচালনা করেছেন তারা হলেন বাডাসের বিশ্বজিৎ ভৌমিক, তাসনিমা সিদ্দিক, শাইলা পারভীন, লিয়া কামরুন নেসা, শামিমা আক্তার, শামিম খান, মাদস হোলস্ট জেনসেন, এএইচএম এনায়েত হোসেন, হাজেরা মাহতাব, আবুল কালাম আজাদ খান, কামরুল হুদা, আবুল কালাম, শুকলা সাহা ও কাইসার আলম চৌধুরী এবং বারডেমের সামছাদ জাহান শেলী, ফারিয়া আফসানা, তারিন আহমেদ ও ফারুক পাঠান।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com