প্রজন্ম ডেস্ক:
‘ওরে ওরে ওরে ওরে
তুই যে আমার নাড়ি ছেঁড়া ধন
তুই যে আমার জীবন
তুই যে আমার মরণ
তুই যে আমার অমূল্য রতন’
সন্তানকে নিয়ে প্রায় তিন দশক আগের বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় গানটি গত শুক্রবার থেকে যেন ঘরে ঘরে জনে জনে বাজছে। ব্যক্তিগত, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক পরিসরে চলছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিম (১৩) হত্যা প্রসঙ্গ। আলোচনা চলছে অনলাইন ও অফলাইনে। অপ্রতিম প্রসঙ্গ এলেই অবচেতন মনেই সবাই যেন যার যার ‘নাড়ি ছেঁড়া ধন’ সন্তানকে নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ছেন।
এসব আলোচনায় সামনে আসছে অপ্রতিমের বয়সী শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তায় ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রের ভূমিকা ও করণীয় প্রসঙ্গও। এর পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল রবিবার দৈনিক খবরের কাগজের সঙ্গে কথা হয়েছে সমাজ-রাষ্ট্রের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনস্বার্থে উচ্চ আদালতে রিট করে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান ও মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক মাসিক ম্যাগাজিন ‘মনের খবর’-এর সম্পাদক অধ্যাপক ডা. এম এম এ সালাউদ্দিন কাউসার (বিপ্লব) ও রাজধানীর ধানমন্ডি গভ. বয়েজ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন পাটওয়ারীর।
তাদের মতে, অপ্রতিমের মৃত্যুর মতো এমন অনভিপ্রেত ঘটনা এড়াতে সমাজের সবাইকে যার যার জায়গা থেকে দায়িত্ব নিতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণ যথাযথ হতে হবে, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে, শিশুদের খেলাধুলার জন্য মাঠ থাকতে হবে এবং সেখানে নিরাপত্তা থাকতে হবে। সর্বোপরি অভিভাবকদেরও খোঁজখবর রাখতে হবে যে তার সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে মিশছে। একই সঙ্গে শিশু-কিশোরদের কাছে দামি মোবাইল ফোন সেট বা অন্য কিছু দেওয়ার ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
মনজিল মোরসেদ বলেন, অপ্রতিমের বয়সীদের ক্ষেত্রে দুটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। মা-বাবাকে দায়িত্বশীল হতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রকেও দায়িত্ব নিতে হবে। শিশু-কিশোরের হাতে দামি মোবাইল সেট বা তেমন দামি কিছু দেওয়ার ক্ষেত্রে মা-বাবাকে সচেতন হতে হবে। আবার এমনও দেখা যায় যে পরিণত বয়সীরাও বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় দামি গহনা এড়িয়ে ইমিটেশনের গহনা পরে যাচ্ছে। কারণ তারা অনিরাপদ বোধ করছে। তাই সার্বিক আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই এখন শিশু-কিশোরদের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যাবহারের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে। আমাদের দেশেও শিশু-কিশোরদের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা উচিত।’
অধ্যাপক ডা. এম এম এ সালাউদ্দিন কাউসার (বিপ্লব) বলেন, মোবাইল ফোন সেট বা দামি কিছু এই বয়সী সন্তানকে দেওয়ার ক্ষেত্রে বা সন্তান কার সঙ্গে মিশছে–এ বিষয়ে মা-বাবকে তো সতর্ক হতেই হবে। কিন্তু শিশু-কিশোরদের জন্য তো খেলার মাঠ থাকতে হবে। মাঠে নিয়মিত খেলতে যেতে চাইলে, সেখানে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এই দায়িত্ব একক কারও নয়, সবার। যার যার জায়গা থেকে দায়িত্ব নিতে হবে। এর দায়িত্ব ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র, পুলিশ প্রশাসন–সবার।
অপ্রতিমের বয়সী উচ্চবিদ্যালয় পড়ুয়াদের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে হরহামেশাই শিক্ষকদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয় বলে জানান ধানমন্ডি গভ. বয়েজ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন পাটওয়ারী। নিজের স্কুলের গত সপ্তাহের একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘অষ্টম শ্রেণির একটি ছেলের সঙ্গে আরেকটি মেয়ের ঘনিষ্ঠতার ভিডিও দশম শ্রেণির আরেক ছাত্রের হাতে পড়ে। ভিডিও ছড়িয়ে দেবে–এমন ভয় দেখিয়ে দশম শ্রেণির ছাত্রটি অষ্টম শ্রেণির ছাত্রের কাছে টাকা আদায় করে। অষ্টম শ্রেণির ছেলেটিও ভয়ে দুই দফায় মিলে তাকে সাড়ে চার হাজার টাকা দেয়। এই টাকা সে তার বাবার পকেট থেকে নিয়ে দেয়। একসময় তার বাবা টের পেয়ে গেলে সে বাবাকে সব খুলে বলে। তখন তার বাবা এসে আমাকে জানান। তাও ভালো যে এই ঘটনা আমরা জানতে পেরেছি। এই ঘটনা থেকে নেতিবাচক আরও খারাপ কত কিছুই তো ঘটতে পারত। এমন কত কত ঘটনা ঘটছে। অপ্রতিমের বয়সীদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের ব্যাপারে আমি শঙ্কিত। এমন কিছু রোধে অভিভাবক, শিক্ষক সমাজ, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদসহ সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। তা না হলে এই প্রজন্মকে রক্ষা করা কঠিন হবে।’
প্রসঙ্গত, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিমকে (১৩) হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। গতকাল দুপুরে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান তার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি করেন। পুলিশের ভাষ্য, মায়ের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে অপ্রতিমকে পরিকল্পিতভাবে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলে নেওয়া হয়। সেখানে ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় বাধা দিলে তাকে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। পরে তার মৃত্যু নিশ্চিত হলে ফোনটি নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায় তিনজন।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com