প্রজন্ম ডেস্ক:
অসহনীয় লোডশেডিং ও তীব্র জ্বালানি সংকট থেকে মুক্তির পথ হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর জোর দিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ বিভাগের উদ্যোগে ১০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রণয়ন করা জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র বাস্তবায়নে ইতোমধ্যেই ব্যাপক তোড়জোড় শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে আগামী গ্রীষ্ম মৌসুমের আগেই ফেব্রুয়ারির মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ থেকে চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
লক্ষ্য অর্জনে সারা দেশে সকল সরকারি দপ্তর/সংস্থার স্থাপনার তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে কাজের অগ্রগতি তদারকির জন্য বিভাগ, জেলা ও মন্ত্রণালয় ভাগ করে ২৮ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের চারজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে যুগ্ম সচিব, উপ-সচিব ও সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদার ২৮ জন কর্মকর্তা এই বিশেষ দায়িত্ব পালন করবেন। সারা দেশে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে সমন্বয় করে এ কাজ করার কথা বলা হয়েছে। প্রতি মাসের ১৫ ও ৩০ তারিখে দুইবার কাজের অগ্রগতি রিপোর্ট আকারে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিবকে জানাতে বলা হয়েছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে জারি করা এক আদেশে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
রুফটপ সোলারের লক্ষ্য অর্জনের জন্য ইতোমধ্যেই সারা দেশে চলছে রুফটপ সোলার নেট মিটারিং ‘সার্ভিস প্রোভাইডার’ তালিকাভুক্তির লক্ষ্যে অবহিতকরণ সভা। এই সভা থেকে জানানো হচ্ছে, সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী প্রয়োজনের অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুৎ ১০.৫০ টাকা হারে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে। এরই মধ্যে সরকার এডিবি বরাদ্দ থেকে টাকা ছাড় করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে এ ব্যাপারে আলাদা আলাদা চিঠি দিয়ে নির্দেশনা দিয়েছে। আগামী ২৭ জানুয়ারির মধ্যে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ৩৭০ কোটি টাকা ছাড় দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের জারি করা আদেশ থেকে জানা যাচ্ছে, আগামী গ্রীষ্ম মৌসুম শুরুর আগেই ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে তিন থেকে চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। চারজন অতিরিক্ত সচিবকে দুটি করে বিভাগ ও তাদের নেতৃত্বে অন্য কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভিন্ন জেলা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের এই নির্দেশনাপত্রে আরও বলা হয়েছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা প্রত্যেক জেলার জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে ও উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের সভাপতিত্বে বিদ্যমান জেলা বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা ও সাশ্রয় সমন্বয় কমিটি' এবং ‘রুফটপ সোলার কর্মসূচি বাস্তবায়নে জেলা পর্যায়ের কমিটি’-র মাধ্যমে, বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার স্থানীয় কার্যালয়ের সহযোগিতায় জেলা ও উপজেলার আওতাধীন সকল সরকারি দপ্তর/সংস্থার স্থাপনা নির্বাচন, প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, তালিকা প্রণয়ন এবং সময়াবদ্ধ বাস্তবায়ন কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করবেন।
আদেশে কার্যপরিধি সম্পর্কে বলা হয়েছে, কর্মকর্তাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলাসমূহে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ তারিখের মধ্যে রুফটপ সোলার স্থাপন-সংক্রান্ত কার্যক্রম বাস্তবায়ন সম্পন্ন করার লক্ষ্যে কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। এজন্য জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে তথ্য সংগ্রহ ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন কার্যক্রম সমন্বয় করতে হবে। তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম এবং সময়াবদ্ধ বাস্তবায়ন পরিকল্পনার অগ্রগতি সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিবকে উল্লিখিত ছক অনুযায়ী প্রতি সপ্তাহে জানাবেন এবং কোনো প্রতিবন্ধকতা বা সমস্যা দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত সচিবকে জানাবেন। অতিরিক্ত সচিবরা তাদের আওতাধীন জেলাসমূহের অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রতি মাসের ১৫ ও ৩০ তারিখে সচিব, বিদ্যুৎ বিভাগকে লিখিতভাবে জানাবেন। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে বিভিন্ন সময় যেসব পত্র, নির্দেশনা ও অন্যানা প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হবে সেসব দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্ট জেলার বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাসমূহের কর্মকর্তাদের জানাতে হবে। অতিরিক্ত সচিবরা তাদের আওতাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী জেলার দায়িত্ব পুনঃবিন্যাস করতে পারবেন।
বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সবুর হোসেন জানান, সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্যে এরই মধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হবে, তা যথাযথভাবে নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, সারা দেশে স্থানীয় সরকারের মোট ছয় হাজার ৫৪৪টি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানÑ যেমন এলজিইডি সদর দপ্তর, সমস্ত সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, নির্বাহী প্রকৌশলী এলজিইডির দপ্তরগুলো, ওয়াসা, জনস্বাস্থ্য এবং বিভিন্ন হাটবাজার বা গ্রোথ সেন্টার রয়েছে। এগুলোর মধ্যে যেসব ভবনে সোলার সিস্টেম স্থাপনের সক্ষমতা রয়েছে, সেগুলোকে তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। তা ছাড়া এসব স্থাপনায় কী ধরনের বা পরিধির সোলার সিস্টেম বসানো যাবে তার তালিকা প্রণয়ন করতেও এরই মধ্যে সকল মন্ত্রণালয়ে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।
রুফটপ সোলার বিদ্যুৎ সাশ্রয়, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে অভিমত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও উন্নয়নকর্মীরা। তারা বলেন, রুফটপ সোলারের সম্প্রসারণে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানের আওতাধীন সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, কমিউনিটি সেন্টার, মার্কেটসহ বিভিন্ন স্থাপনার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা যেতে পারে। এসব ছাদ পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা হলে নতুন জমি অধিগ্রহণ বা অতিরিক্ত ভূমি ব্যবহারের প্রয়োজন ছাড়াই নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে।
এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ‘আমাদের টার্গেট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিত্যক্ত ছাদ ব্যবহার করে আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চাচ্ছি প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট। এই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্দেশ্য হচ্ছে, তারা ১৫০ মেগাওয়াট ব্যবহার করবেন, আর বাকি ১৫০ মেগাওয়াট সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্যাকেজ অনুযায়ী নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে ১০ টাকা ৫০ পয়সা হিসাবে সরকারের কাছে বিক্রি করবে এবং তা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।’ তিনি বলেন, ‘বিক্রি করলে আমরা হিসাব করে যেটা দেখেছি, আমরা যে টাকা ছাড় করছি এবং তারা যে টাকা ব্যয় করবে, ১০ টাকা ৫০ পয়সা হিসেবে তারা যদি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরকারের কাছে জাতীয় গ্রিডে দিয়ে বিক্রি করে বা গ্রিডে দিয়ে বিক্রি করে টাকা পায়, তাহলে ৩ থেকে ৪ বছরের মধ্যে ব্যয় হওয়া অর্থ উঠে আসবে।’
প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৩৭০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে কথা বলে আমরা একটা স্ট্যান্ডার্ড হিসাব নিয়েছি। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগেও তার একটা হিসাব এসেছে। সে অনুযায়ী, ৫ দশমিক ৫ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ছাদে সোলার প্যানেলের মাধ্যমে খরচ হবে প্লাস-মাইনাস ৩ লাখ ২৬ হাজার টাকা। এই ৩ লাখ ২৬ হাজার টাকার হিসাবকে প্লাস-মাইনাস করেই আমরা ইউনিয়ন পরিষদের সাড়ে তিন হাজার ভবনের জন্যে টাকা ছাড় করেছি।’
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com