প্রজন্ম ডেস্ক:
করিডোর, গ্যালারি কিংবা মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরাÑ এমন দৃশ্য যেকোনো দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার করুণ বাস্তবতাই ফুটিয়ে তোলে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালসহ দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর চিত্র কমবেশি এরকমই। ফলে সামর্থ্যবান রোগীরা ভালো সেবা পেতে ছুটে যান বেসরকারি হাসপাতালে। বেকায়দায় থাকেন স্বল্পআয়ের সাধারণ মানুষ। অসুখে-বিসুখে সরকারি হাসপাতালই তাদের ভরসা। যদিও সেখানে চিকিৎসা পেতে গেলে ভোগান্তির সীমা থাকে না। রোগীর চাপ সামলাতেই হিমশিম খেতে হয় চিকিৎসদের। আরও আছে দালালদের খপ্পরে পড়ে প্রতারিত হওয়ার নানা কাহিনী। এবার চিরচেনা বিবর্ণ এই দৃশ্যপটে আসতে যাচ্ছে বড় ধরনের পরিবর্তন।
সরকারি হাসপাতালের ওপর চাপ ও রোগীদের দুর্ভোগ কমাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে বেসরকারি হাসপাতালের শয্যা ও চিকিৎসাসেবা কেনার এক ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মডেল হিসেবে নিয়ে শুরু হবে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। এরপর একে একে তা সম্প্রসারণ করা হবে চট্টগ্রাম ও সিলেটে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় বেসরকারি হাসপাতাল থেকে সেবা কেনার এই যুগান্তকারী পরিকল্পনা দেশের চিকিৎসা খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঢামেক হাসপাতালের পক্ষে সেবা দেওয়ার জন্য যেসব বেসরকারি হাসপাতালকে যুক্ত করার কথা ভাবা হচ্ছে, সে তালিকায় রয়েছে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের শমরিতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ইমপালস হাসপাতাল, শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ইউনাইটেড হাসপাতাল (বর্তমানে কন্টিনেন্টাল হাসপাতাল)।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, প্রস্তাবিত এই গণমুখী ব্যবস্থার অধীনে সরকারি হাসপাতালে আসা রোগীদের একটি অংশকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় নির্ধারিত বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হবে। সেখানে শয্যাভাড়া, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা কনসালট্যান্ট ফি, প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোগীদের নিজের পকেট থেকে কোনো অর্থ খরচ করতে হবে না। সরকারি হাসপাতালে যেসব সুবিধা বিনামূল্যে পাওয়ার কথা, বেসরকারি হাসপাতাল থেকেই একই সুবিধা পাওয়া যাবে। মাস শেষে রোগীপ্রতি যাবতীয় খরচের হিসাব যাচাই করে বিল পরিশোধ করবে সরকার। প্রাথমিক পর্যায়ে মূলত মেডিসিন, শিশু বিভাগ এবং ছোটখাটো অস্ত্রোপচারের রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হবে।
সূত্র আরও জানায়, সবার জন্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার নতুন এই বন্দোবস্ত কীভাবে বাস্তবায়িত হবে তার একটি খসড়া নীতিমালা প্রস্তুত করা হয়েছে। সেখানে শয্যাভাড়া ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মূল্য নির্ধারণের বিষয়ে স্পষ্ট রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি বেসরকারি হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম সরাসরি তদারকি করার জন্য সাত সদস্যের একটি মনিটরিং কমিটি গঠিত হবে। অতীতে কোভিড মহামারির সময় ভুয়া রোগী দেখিয়ে কিংবা নানা কৌশলে বিল করার যে অভিযোগগুলো উঠেছিল, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে পুরো প্রক্রিয়ায় কঠোর স্বচ্ছতা আনতে চায় সরকার। রোগী ভর্তি, রেফারেল ও ডিসচার্জের যাবতীয় তথ্য সফটওয়্যারভিত্তিক অনলাইন ডেটাবেজের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে অনিয়ম ও অপব্যবহারের কোনো সুযোগ তৈরি না হয়।
স্বাস্থ্য অধিপ্তরের পরিচালক পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, উদ্যোগটি এখনও চূড়ান্ত বাস্তবায়নের পর্যায়ে যায়নি। কোন হাসপাতাল থেকে কী সেবা কেনা হবে, সেবার মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং সরকারি অর্থে রোগী ব্যবস্থাপনার কাঠামো কী হবেÑ এসব বিষয়ে প্রাথমিক পরিকল্পনা এবং তার খসড়া প্রস্তুত হয়েছে।
ঢামেকের মতোই সরকারি মূল্যে চিকিৎসা
২ হাজার ৬০০ শয্যার ঢামেক হাসপাতালে নিয়মিত প্রায় দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকায় একটি শয্যার জন্য হাহাকার লেগেই থাকে। মেঝেতে ঠাঁই নেওয়া রোগীর স্বজনরা একটি শয্যার জন্য ছুটে বেড়ান হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দ্বারে দ্বারে। দালালচক্রের প্রলোভনে পড়েন অনেকে। ফলে সরকারের নতুন পরিকল্পনাটি সবার জন্যই আশার আলো হয়ে দেখা দেবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, তালিকায় অন্তর্ভুক্ত বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে শয্যাসংখ্যার একটি অংশ খালি থাকে। সেই সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে সরকারি হাসপাতালের অতিরিক্ত রোগীর চাপ কমানোই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেছেন, ‘প্রাইভেট হাসপাতালে বেডের তুলনায় রোগী কম থাকে। তাই সরকারি হাসপাতাল থেকে সেখানে রোগী পাঠানো হলে চাপ অনেকটা কমবে।’
রোগীদের বাড়তি অর্থ দিতে হবে না জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেলের মতোই রোগীদের বেডের জন্য কোনো অর্থ দিতে হবে না, কনসালট্যান্টের জন্যও অর্থ দেওয়া লাগবে না। যে সমস্ত ওষুধ সরবরাহ আছে, সেটার জন্যও টাকা দিতে হবে না। যে সমস্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকবে, সেটার জন্যও খরচ করতে হবে না। অর্থাৎ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর যা খরচ হতো, সেখানেও একই খরচ হবে।’
বেডের অভাবে আটকে যাবে না চিকিৎসা
কোন ধরনের রোগীকে বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হবে, সে বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ড. ফোয়ারা তাসমিম বলেন, ‘ইমার্জেন্সি বা জীবনাশঙ্কা আছেÑ এমন নয়; অথচ ছাত্রছাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, বেডের অভাবে চিকিৎসাসেবা দেরি হবেÑ এমন রোগীকে নির্দিষ্ট মূল্যে বেসরকারি হাসপাতালে রেফার করা হবে। সরকারও রোগীর জন্য খরচ বহন করবে। এর ফলে এসব বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ছাত্রছাত্রীদের শেখাও হবে, আবার রোগীরাও সরকারি মূল্যে সেবা পাবেন।’
এখনও প্রস্তাবের পর্যায়ে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, এ বিষয়ে এখনও কোনো গেজেট হয়নি। পরিকল্পনা বিভাগ থেকে প্রস্তাব তৈরি হচ্ছে। এছাড়া সরকার কত অংশ ব্যয় করবে, রোগীর কোনো অংশ বহন করতে হবে কি না এবং কোন হাসপাতালে কীভাবে সেবা দেওয়া হবেÑ এসব বিষয় আগে নির্ধারণ করতে হবে। অর্থাৎ প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের আগে আর্থিক ও প্রশাসনিক কাঠামো চূড়ান্ত করার প্রয়োজন রয়েছে।
কোভিডের অভিজ্ঞতায় থাকবে ডিজিটাল নজরদারি
সরকারি অর্থে বেসরকারি হাসপাতালের সেবা কেনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কোভিডের সময় এ ধরনের কার্যক্রমে অনেক অপব্যবহার করা হয়েছে। যেখানে হয়তো রোগী ছাড়াই বিল করা হয়েছে। এ ধরনের নানা অভিযোগ আছে। তো সেটা যেন কেউ না করতে পারে, সেজন্য একটা সফটওয়্যারের মাধ্যমে পেশেন্ট এন্ট্রি, রেফারেল এবং ডিসচার্জÑ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা হবে, যাতে পুরো জিনিসটা একটা স্বচ্ছতার মধ্যে থাকে। পরিকল্পনা অনুযায়ী রোগী ভর্তি, রেফারেল ও ছাড়পত্রের তথ্য অনলাইনে সংরক্ষণ করা হবে। পরে সেই তথ্যের সঙ্গে হাসপাতালের বিল মিলিয়ে দেখা হবে। এতে ভুয়া রোগী দেখানো কিংবা সেবা না দিয়েও বিল করার সুযোগ কমানোর পাশাপাশি সরকারি অর্থের ব্যবহারও যাচাই করা সম্ভব হবে।
সরকারি অর্থে বিত্তবানদের স্বাচ্ছন্দ্যে নয়
সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ কমাতে উদ্যোগটি কার্যকর হতে পারে বলে মনে হলেও এর সুবিধা কারা পাবেনÑ সেটিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত যেখানে সরকারি স্বাস্থ্য অবকাঠামো দুর্বল বা নেই, সেসব এলাকায় সেবা পৌঁছে দেওয়া। পাহাড়ি অঞ্চল, চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা এনজিওর সঙ্গে নির্ধারিত মূল্যে অংশীদারত্বের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।’
ঢাকার অভিজাত এলাকায় সাধারণ সময়ে সরকারি অর্থে বেসরকারি হাসপাতালের সেবা কেনার বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি ছাড়া সাধারণ অবস্থায় ঢাকা শহরে বেসরকারি খাত থেকে এভাবে সেবা নেওয়া সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার উদ্দেশ্যের বিপরীত হতে পারে।’
এই জনস্বাস্থ্যবিদ আরও বলেন, ডেঙ্গু বা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ কিংবা শয্যার সংকট দেখা দিলে বেসরকারি সক্ষমতার সুবিধা নেওয়া যৌক্তিক। কিন্তু সমাজের উচ্চবিত্তের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য সরকারি অর্থ ব্যয় করা হলে স্বাস্থ্যবৈষম্য আরও বাড়তে পারে। তার মতে, স্থায়ীভাবে বেসরকারি খাত থেকে সেবা কিনতে গেলে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ব্যয় ও লাভের হিসাব বাড়িয়ে দেখানোর সুযোগ পেতে পারে। তাই সেবার মূল্য আগে থেকেই নির্ধারণ, মানদণ্ড ঠিক করা এবং কঠোর নজরদারি জরুরি।
সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতাও কাজে লাগাতে হবে
বেসরকারি হাসপাতাল থেকে সেবা কেনার পাশাপাশি সরকারি খাতের অব্যবহৃত সক্ষমতাকেও কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। মহাখালীর ডিএনসিসি কোভিড হাসপাতাল এর বড় উদাহরণ। প্রায় ১ হাজার শয্যার এই হাসপাতালে রয়েছে ২১২ শয্যার আইসিইউ। অথচ দীর্ঘ সময় হাসপাতালটির ৭০০ থেকে ৮০০ শয্যাই ফাঁকা পড়ে থাকে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার মতে, এই অবকাঠামোকে পূর্ণাঙ্গ সাধারণ হাসপাতালে রূপান্তর করা গেলে সরকারি খাতেই তৈরি হতে পারে বড় একটি চিকিৎসাকেন্দ্র। এতে একদিকে ঢাকা মেডিকেলের ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে নতুন করে বেসরকারি সেবা কেনার প্রয়োজনও কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, আমাদের দরকার হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা বিস্তৃত করা এবং পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সিগুলো সমাধান করার জন্য পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ করা। বেসরকারি সক্ষমতা কেনার উদ্যোগটি শুধু ঢাকার কিছু রোগীর জন্য সীমাবদ্ধ না রেখে তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবা, জরুরি পরিস্থিতি ও অব্যবহৃত সরকারি সক্ষমতার সঙ্গে সমন্বয় করা গেলে সেটিই হতে পারে উদ্যোগটির বড় জনস্বাস্থ্যগত সাফল্য। সঠিক রোগী নির্বাচন, নির্ধারিত মূল্য, ডিজিটাল নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগ গণমানুষের চিকিৎসাসেবার পরিসর বাড়ানোর একটি কার্যকর উপায় হয়ে উঠতে পারে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com