প্রজন্ম ডেস্ক:
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়া মোকাবিলার কথা বলেছেন তিনি। তবে তার প্রত্যাবর্তনের তারিখ, ভারতে অবস্থান থেকে কীভাবে দেশে ফিরবেন এবং তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা ফিরবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অন্যদিকে, তাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া হয়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে সরকার তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখছে। কথিত প্রত্যাবর্তন ঘিরে আওয়ামী লীগের যেকোনো ধরনের কর্মকাণ্ড কঠোর হস্তে দমন করার ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ইতোমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ডিসেম্বরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও জনমনে গুঞ্জন চলছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সম্ভাব্য ভূমিকা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবস্থান, সরকারের প্রস্তুতি এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আলোচনায় আসছে। বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার ফেরা কী আদৌ সম্ভব কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
শেখ হাসিনার ঘোষণায় নির্বাসনে থাকা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদেরও তার সঙ্গে দেশে ফেরার কথা এসেছে। তবে তাদের মধ্যে কারা ফিরবেন, কতজন ফিরবেন কিংবা দেশে ফিরে কীভাবে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হবেনÑ সে বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানানো হয়নি। তবে ফেসবুক লাইভে এসে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, ড. হাছান মাহমুদ, শ ম রেজাউল করিমসহ অনেক নেতা দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। যাদের অনেকের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে। ফলে দেশে ফেরার ঘোষণা সামাজিক মাধ্যমের মধ্যেই সীমিত থাকবে, না কি বাস্তবেও তারা দেশে ফিরবেন; তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিদেশে অবস্থানরত সিনিয়র নেতাদের দেশে ফেরার সম্ভাবনা কম। বিশেষ করে যারা ইউরোপ ও আমেরিকায় অবস্থান করছেন, তারা সেখানে স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ একটি জীবন বেছে নিয়েছেন। অনেকেই সন্তানদের লেখাপড়া করিয়ে স্থায়ী হওয়ারও চেষ্টা চালাচ্ছেন। সেখানকার আরাম-আয়েশ ছেড়ে শেষ বয়সে দেশে ফিরে তারা বিচারের মুখোমুখি না-ও হতে পারেন। এদিকে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা ও মন্ত্রীদের বেশ কয়েকজন ইতোমধ্যেই কারাগারে মৃত্যুবরণ করেছেন। অনেক সিনিয়র নেতা কারাবাসে রয়েছেন। এমন পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখছেন পলাতক সিনিয়র নেতারাও। এ ছাড়া মধ্যম সারির যেসব নেতা ভারতে অবস্থান করছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাদের সেখানে অবস্থান করা কঠিন হবে। তাদের অনেকেই ইউরোপ-আমেরিকামুখী হতে পারেন।
এদিকে দেশে অবস্থান করা আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের একটি বড় অংশ স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমঝোতা করে নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখছেন। চালাচ্ছেন ব্যবসা-বাণিজ্যও। এর বাইরে একটি বড়সংখ্যক কর্মী-সমর্থক রয়েছেন; যারা নিষিদ্ধ অবস্থায়ও নানা কর্মসূচি পালন করছেন। আওয়ামী লীগের এই অংশটিকেই পাশে পেতে পারেন শেখ হাসিনা। তবে তাদের দিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করে সরকার পতনের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
জাহাঙ্গীরগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. শামসুল আলম বলেন, ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা একটি রাজনৈতিক স্ট্যানবাজি। তিনি যে প্রেক্ষিতে দেশ থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেই পরিস্থিতি এখনও বিদ্যমান রয়েছে। তিনি ক্ষমা না চেয়ে পার্শ্ববর্তী একটি দেশে অবস্থান করে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে বাংলাদেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। এসব ফাঁকা আওয়াজ দিয়ে তিনি নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু নেতাকর্মীরা উল্টো বিপদে পড়ছেন।
এদিকে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণার পর পুলিশ ও প্রশাসনের ভেতরের অবস্থান নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ক্যান্টনমেন্ট থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল হাসানের কথিত একটি অডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বলা হচ্ছে, এখনও প্রশাসনের ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে আওয়ামী লীগের বড় একটি সমর্থক গোষ্ঠী। তারাও ভেতরে ভেতরে তৎপরতা শুরু করছে। তবে তারা যাতে সংগঠিত হতে না পারে, সরকার সে ব্যাপারেও কঠোর দৃষ্টি রাখছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর ডিসেম্বরের রাজনৈতিক আলোচনায় আরেকটি বিষয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এখনও দুই দেশের মধ্যে সফরের তারিখ চূড়ান্ত হয়নি। ভারতের ব্যস্ত কূটনৈতিক কর্মসূচি এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন অমীমাংসিত বিষয় সফর নির্ধারণে প্রভাব ফেলছে। ভারত সফরের আমন্ত্রণ থাকলেও তা কবে অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। গুঞ্জন রয়েছে, আগামী ডিসেম্বরেই তারেক রহমানের ভারত সফরের সূচি নিশ্চিত করতে চায় ঢাকা। ওই সময়ে সেখানে গিয়ে রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা গ্রহণের পাশাপাশি শেখ হাসিনার র্পণ ইস্যুতেও কথা বলতে চান প্রধানমন্ত্রী। এর মাধ্যমে শেখ হাসিনার ফেরার ডামাডোল কিছুটা হলেও স্তিমিত হয়ে যাবে।
বলা হচ্ছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে ভারত ও বাংলাদেশের অবস্থানও এই সফরের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে তারেক রহমানের সফরে শেখ হাসিনার বিষয়ে কোনো সমঝোতা হবে, তাকে ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসবে কিংবা তার দেশে ফেরার ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে সফরের তারিখ নির্ধারণ করা হচ্ছেÑ এসব বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো ঘোষণা আসেনি।
গত ১০ জুলাই বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারাও ফিরতে পারেন বলে জানান তিনি। তবে ফেরার নির্দিষ্ট দিন বা কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন, তা জানাননি। নির্বাসনে থাকা অন্য নেতাদের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করে তাদের পরিকল্পনা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
এর আগে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতকে একাধিকবার অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করে ৩ অক্টোবর ঢাকায় বক্তব্য দেন দেশটির হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। বঙ্গোপসাগরীয় সংলাপের এক আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে ভারতীয় বিমানবাহিনী বা সেনাবাহিনী ভারতে নিয়ে যায়নি। বাংলাদেশের তৎকালীন পরিস্থিতিতে তিনি ভারতে পৌঁছেছিলেন এবং প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত বাস্তবতা মেনে নিয়েছিল। প্রত্যর্পণের বিষয়ে ত্রিবেদী বলেন, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। আদালত-সংশ্লিষ্ট বিষয় থাকায় তাকে ফেরত দেওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা বলা সম্ভব নয়।
শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ ছাড়েন। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন। শেখ হাসিনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল হওয়ায় দেশে ফেরার আইনগত প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
১৯৭৫-এর পটপরিবর্তনে পর দীর্ঘ সময় ভারতে অবস্থান করে ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরেছিলেন শেখ হাসিনা। এর প্রায় দুই সপ্তাহ পর ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তবে এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন এমন সময়ে, যখন তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং তার প্রত্যর্পণ নিয়ে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া চলছে। ফলে ডিসেম্বর ঘিরে রাজনৈতিক আলোচনা থাকলেও তার বর্তন, আওয়ামী লীগের নেতাদের অংশগ্রহণ এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক কর্মসূচির চূড়ান্ত চিত্র এখনও অনিশ্চিত।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com