প্রজন্ম ডেস্ক:
ভেজাল ও দূষিত খাদ্যের ঝুঁকি মোকাবেলায় দেশের খাদ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিবন্ধন ও লাইসেন্সের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী ১ নভেম্বর থেকে নির্ধারিত শ্রেণির খাদ্য ব্যবসার জন্য নিবন্ধন এবং বিশেষায়িত খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ও বিপণনে লাইসেন্স বাধ্যতামূলক হচ্ছে।
রেস্তোরাঁ, বেকারি, মিষ্টির দোকান থেকে শুরু করে রাস্তার পাশের পিঠা, পুরি ও পিঁয়াজুর দোকানও আসছে নিবন্ধনের আওতায়। তবে খাদ্যে ভেজাল ও দূষণের উদ্বেগজনক চিত্রের মধ্যে নতুন এ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে নিয়মিত নজরদারি ও আইনের যথাযথ প্রয়োগের ওপর।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) এক গবেষণায় সারা দেশ থেকে সংগৃহীত খাদ্য নমুনার ৫২ শতাংশ দূষিত পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। অন্যদিকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আট মাসে খাদ্যে অনিয়মের বিরুদ্ধে ৭৪৪টি মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনা করেছে কর্তৃপক্ষ।
এসব অভিযানে দুই কোটি ৮৩ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা এবং সাতটি কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে এক হাজার ৩০৭টি খাদ্য স্থাপনা মনিটরিং ও এক হাজার ২১০টি খাদ্য নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, খাদ্য ব্যবসায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং ভোক্তার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত ১৬ জুলাই ‘নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬’ সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়। নতুন বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসার নিবন্ধন নিতে হবে।
আর বিশেষায়িত খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নিবন্ধনের আওতায় আসবে রেস্তোরাঁ, বেকারি, ফলের রসের দোকান, পেস্ট্রি শপ, ক্যাটারিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, প্যাকেটজাত খাবার উৎপাদনকারী, মিষ্টির দোকান, দুগ্ধপণ্য প্রস্তুতকারী এবং নির্ধারিত শ্রেণির খাদ্য আমদানিকারক। এ ছাড়া রাস্তার পাশের পিঠা, পুরি ও পিঁয়াজুর দোকান, পাইকারি মুদি খাদ্য ব্যবসা, খাদ্য সংরক্ষণাগার ও কোল্ড স্টোরেজ এবং ভোজ্য তেল ও ভোজ্য লবণ উৎপাদনের মতো ব্যবসাও নিবন্ধনের আওতায় আসবে।
স্বাস্থ্য সহায়ক ও সম্পূরক খাদ্য, বিশেষ পথ্য, চিকিৎসাসংক্রান্ত বিশেষ পথ্য, প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক এবং নিউট্রাসিউটিক্যালজাতীয় পণ্যের উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, আমদানি ও বিপণনে লাইসেন্স নিতে হবে। এ ছাড়া প্রবিধানমালায় নির্ধারিত জৈব খাদ্য, জিনগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত বা সংশোধিত খাদ্য, কিরণ-সম্পাতকৃত খাদ্য, অভিনব খাদ্য এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ বা ফর্টিফায়েড খাদ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বিধান অনুসরণ করতে হবে।
প্রবিধানমালা অনুযায়ী, প্রচলিত ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসার প্রথমবার নিবন্ধন বিনা ফিয়ে করা যাবে। বিশেষায়িত খাদ্য ব্যবসার লাইসেন্স ফি প্রতিষ্ঠানের আয়তন ও শ্রেণিভেদে নির্ধারিত হবে। ১০০ বর্গমিটার বা তার কম আয়তনের প্রতিষ্ঠানের প্রিমিসেস লাইসেন্স ফি ১০ হাজার টাকা। ১০ হাজার বর্গমিটারের বেশি আয়তনের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এ ফি ৬০ হাজার টাকা। নিবন্ধন ও লাইসেন্সের মেয়াদ হবে তিন বছর। মেয়াদ শেষে তা নবায়ন করতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়র সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘খাদ্য উৎপাদকদের লাইসেন্সের আওতায় আনার উদ্যোগটি ভালো। এর ফলে উৎপাদকদের একটি তথ্যভাণ্ডার তৈরি হবে এবং তাঁরা নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুনের মধ্যে থাকবেন। কেউ নিম্নমানের পণ্য উৎপাদন করলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও সহজ হবে।’
শুধু লাইসেন্স দিলেই হবে না উল্লেখ করে এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘উৎপাদকদের নিয়মিত নজরদারির আওতায় রাখতে হবে। লাইসেন্স দেওয়ার পর তাঁরা কী করছেন এবং কী মানের পণ্য উৎপাদন করছেন, তা তদারকি না করলে উদ্যোগ থেকে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে না।’
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট জেলা কার্যালয়ে আবেদন করা যাবে। পরে ধাপে ধাপে অনলাইনে আবেদনপ্রক্রিয়া চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। খাদ্যপণ্যের প্যাকেটে বিএফএসএর নিবন্ধন নম্বর উল্লেখের বিধানও রাখা হয়েছে। নিবন্ধন বা লাইসেন্স বাধ্যতামূলক হওয়া সত্ত্বেও তা ছাড়া ব্যবসা পরিচালনা করা নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, ‘রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আলাদা আলাদা লাইসেন্স নিতে হচ্ছে। ট্রেড লাইসেন্স, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, বিএসটিআই ও ফায়ার লাইসেন্সসহ নানা ধরনের অনুমোদন নিতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এসব লাইসেন্সকে সরকারের রাজস্ব আয়ের খাতের পাশাপাশি আমলাদের হয়রানির হাতিয়ার বানানো হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা আর কতগুলো লাইসেন্স করব? আমরা সরকারের কাছে রেস্তোরাঁ খাতকে একটি কর্তৃপক্ষের অধীনে আনার দাবি জানাচ্ছি। আমরা ওয়ানস্টপ সার্ভিস চাই। সমন্বিত একটি লাইসেন্সিং ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় সব রেস্তোরাঁ বন্ধ করে ধর্মঘটে যাওয়ার মতো কর্মসূচি দিতে আমরা বাধ্য হব।’
রেস্তোরাঁ ব্যবসার বর্তমান সংকট তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘গ্যাস নেই, বিদ্যুতের সংকট রয়েছে। ময়দা, চিনি ও তেলের দাম বেশি। এলপি গ্যাসের দামও বেশি। এত সংকটের মধ্যে আমরা কোথায় যাব? অন্যদিকে ক্রেতা নেই, মানুষের আয়ও কমেছে। সব মিলিয়ে রেস্তোরাঁ ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’
ইমরান হাসান আরো বলেন, ‘ট্রেড লাইসেন্স, পরিবেশের ছাড়পত্র, বিএসটিআই, ফায়ার লাইসেন্স, একের পর এক অনুমোদন নিতে নিতে ব্যবসায়ীদের জীবন শেষ হওয়ার অবস্থা। যাঁরা নিয়ম মেনে এসব লাইসেন্স নিতে যান, তাঁরাই বেশি ভোগান্তিতে পড়েন। অথচ যাঁরা লাইসেন্স নেন না, অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের কিছুই হয় না। এ কারণে আমরা সব অনুমোদন সমন্বয় করে একটি কর্তৃপক্ষের অধীনে একক লাইসেন্স বা ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালুর দাবি জানাচ্ছি।’
বিএফএসএর গবেষণায় বলা হয়েছে, ৮২টি খাদ্যপণ্য পরীক্ষায় গড়ে ৪০ শতাংশ খাদ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহনীয় মাত্রার চেয়ে তিন থেকে ২০ গুণ বেশি নিষিদ্ধ ডিডিটি ও অন্যান্য বিষাক্ত উপাদান পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ৩৫ শতাংশ ফল ও ৫০ শতাংশ শাক-সবজির নমুনায় বিভিন্ন কীটনাশকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। চালের ১৩টি নমুনায় অতিমাত্রায় আর্সেনিক এবং পাঁচটিতে ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি ধরা পড়ে। হলুদের গুঁড়ার ৩০টি নমুনায় সিসা ও অন্যান্য ভারী ধাতু পাওয়া গেছে। লবণে সহনীয় মাত্রার চেয়ে ২০ থেকে ৫০ গুণ বেশি সিসা পাওয়ার তথ্যও রয়েছে।
এদিকে গত ১১ থেকে ১৭ অক্টোবর এক সপ্তাহে ১১টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা এবং মোট সাড়ে ১৪ লাখ টাকা জরিমানা করেছে বিএফএসএ। এ সময়ে ২১৪টি খাদ্য স্থাপনায় মনিটরিং করা হয়। ঢাকায় অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাবার তৈরি, নিবন্ধন ছাড়া প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং খাদ্যকর্মীদের স্বাস্থ্য সনদ ও পেস্ট কন্ট্রোলের প্রমাণক দেখাতে না পারার মতো অনিয়মে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ঢাকার বাইরেও অননুমোদিত রাসায়নিক রং ব্যবহার, লেবেলবিহীন পণ্য সংরক্ষণ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য উৎপাদনের দায়ে জরিমানা ও মামলা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘খাবার শুধু ক্ষুধা মেটানোর উপকরণ নয়, সুস্থভাবে বেঁচে থাকারও প্রধান শর্ত। অথচ বাইরে খাওয়া খাবারের উৎস, প্রস্তুত প্রণালী ও সংরক্ষণব্যবস্থা কতটা নিরাপদ, তা অনেক ক্ষেত্রেই অজানা। দূষিত পানি, জীবাণুযুক্ত খাবার ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে ডায়রিয়া, আমাশয়, কলেরা ও টাইফয়েডের মতো রোগ ছড়াতে পারে। আবার অতিরিক্ত তেল, লবণ ও চিনিযুক্ত খাবার নিয়মিত গ্রহণে স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে।’
বিএফএসএর সদস্য (আইন ও নীতি) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে অভিযান ও মনিটরিং কার্যক্রম আরো জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে। জেলা পর্যায়ে কার্যক্রম বাড়াতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও সহায়তার বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণনের প্রতিটি পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি ক্ষতিকর রং ও অ্যাডিটিভসের ব্যবহার বন্ধে গবেষণা ও কারিগরি কার্যক্রমও চলছে।
৬৪ জেলায় মোবাইল ল্যাব সম্প্রসারণের পরিকল্পনা
খাদ্যের মান যাচাই ও ভেজাল শনাক্তে ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগারের কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। গত ১৪ অক্টোবর সচিবালয়ে একটি ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগার পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কর্মকর্তারা তাঁকে নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষা ও তদারকির কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত করেন। বর্তমানে দেশের আটটি মহানগর এলাকায় এসব পরীক্ষাগারের মাধ্যমে খাদ্যের নমুনা পরীক্ষা ও তদারকি করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে ৬৪ জেলায় এ কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৭২টি ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগারবাহী গাড়ি সংগ্রহের কার্যক্রম চলছে।
বিএফএসএর চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্য নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি, আইনানুগ ব্যবস্থা, ভ্রাম্যমাণ আদালত, নমুনা পরীক্ষা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। খাদ্য উৎপাদন থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে কাজ করছে কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, আগামী ১ নভেম্বর থেকে নিবন্ধন ও লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ খাদ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যভাণ্ডার তৈরি এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হতে পারে। তবে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে নিয়মিত পরিদর্শন, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি, অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা এবং আইনের ধারাবাহিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় নিবন্ধন ও লাইসেন্স চালু হলেও খাদ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ মোহাম্মদ আফছার খান সাদেক
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মিলাদ মোঃ জয়নুল ইসলাম
প্রকাশনালয়ঃ রিপোর্টার লজ, কসবা, বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ উত্তর বাজার কেন্দ্রিয় মসজিদ মার্কেট (২য় তলা), বিয়ানীবাজার, সিলেট ।
মোবাঃ ০১৮১৯-৬৫৬০৭৭, ০১৭৩৮-১১ ৬৫ ১২
ইমেইলঃ agamiprojonma@gmail.com, milad.jaynul@gmail.com